Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

নাগরিক উদ্যোগের অর্জন, মানুষের আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামীর স্নেহধন্য তেঁতুলগাছ

দক্ষিণ কলকাতার বিদ্যাসাগর কলোনিতে বাঘাযতীন পাড়া-সহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের ব্যাপক সমর্থনে, একটি তেঁতুলগাছ বাঁচানোর আন্দোলন পেল জোরালো সাড়া। কী সেই কারণ, যা ব্যস্ত নাগরিক রোজনামচাকে প্রভাবিত করল?? জানা যাক সেই গল্প।
কলকাতার তুলনামূলক শান্ত আবাসিক অঞ্চল বিদ্যাসাগর কলোনির এক নির্জন গলিতে দাঁড়িয়ে আছে একটি তেঁতুলগাছ। এই গাছটি লালন-পালন করেছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী পারুল মুখোপাধ্যায়।

১৯৩৫ সালে, মাত্র ২০ বছর বয়সে, টিটাগড় ষড়যন্ত্র মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে চার বছর কারাবাস করেছিলেন তিনি। স্বাধীনতার পর, দেশভাগ-উত্তর সময়ে সামন্ততান্ত্রিক ভূমিদখলকারীদের হাত থেকে নিজের এলাকা রক্ষা করার পাশাপাশি পারুল স্থানীয় মানুষদের মধ্যে পরিবেশ-সচেতনতার পাঠও ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। একা হাতে পিস্তল চালাতে পারা এই দৃঢ়চেতা নারী নিশ্চিত করেছিলেন তাঁর চারপাশের প্রকৃতি—গাছ, পুকুর ও পাখিদের নিরাপত্তাও।

চলচ্চিত্র নির্মাতা ও আলোকচিত্রী দেবলীনা মজুমদার(দেবলীনা মৌ) টানা ১২ বছর ধরে এই তেঁতুলগাছকে নথিবদ্ধ করেছেন। কোনও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে নয়, বরং নিজের জানলার ঠিক বাইরে গড়ে ওঠা এই বাস্তুতন্ত্রের প্রতি এক গভীর টান থেকেই।

এই তেঁতুলগাছ বহু পাখির আশ্রয়স্থল—টিয়া, শালিক, মাছরাঙা, কাঠঠোকরা-সহ আরও নানা প্রজাতির পাখির নিরাপদ নিবাস এটি।
২০২৪ সালে পারুল মুখোপাধ্যায়ের জমি এক স্থানীয় নির্মাতার কাছে বিক্রি হওয়ার পর গাছটি কাটা পড়ার আশঙ্কা প্রবল হয়ে ওঠে। প্রথমে কাটা পড়ে আমগাছ, তারপর আরও কয়েকটি গাছ। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্কতা ও প্রতিরোধের ফলে তেঁতুলগাছের গায়ে কুঠারের আঘাত নামেনি।

দেবলীনা এবং তাঁর বন্ধু—সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সমতা বিশ্বাস, চলচ্চিত্র নির্মাতা শুভম রায় চৌধুরী, গণিত শিক্ষিকা বর্ণালী দাস, মধুছন্দা ভট্টাচার্য, মৃণাল কান্তি দাস, রাফিনা খাতুন, নাসিমা সেলিম প্রমুখ মিলে গাছ ও তার বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় গড়ে তোলেন এক আন্দোলন।
দেবলীনা জানান, “আমি প্রধান বনসংরক্ষকের কাছে একটি ই-মেল পাঠাই। পরদিনই তিনি একজন রেঞ্জারকে গাছটি পরিদর্শনের জন্য পাঠান। রেঞ্জার প্রমোটারের সঙ্গে কথা বলেন এবং আশ্বাস পান যে ঐতিহাসিক এই গাছটি কাটা হবে না। পাশাপাশি, গাছটিকে ঘিরে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মরণে একটি বেদি নির্মাণ করা হবে।”
দেবলীনা নির্মাণ করেছেন ৩০ মিনিটের প্রামাণ্যচিত্র— জিলিপিবালার বন্ধুরা, (‘ফ্রেন্ডস অফ জিলিপিবালা’)।
গাছটির যাত্রাপথ এবং ধ্বংসের সম্ভাবনার গল্প নিয়ে তৈরি এই তথ্যচিত্র ২০২৫ সালে কলকাতা ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল-এ প্রদর্শিত হয়। তথ্যচিত্র ও সমান্তরাল জন-আন্দোলনের জোরে গাছটি রক্ষার দাবিতে ৪,০০০-এরও বেশি স্বাক্ষর সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
আন্দোলনের অন্যতম কণ্ঠস্বর মধুছন্দা ভট্টাচার্য বলেন, “আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। গাছটি সুস্থভাবে বেঁচে থাকবে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নই। বনদফতর ও সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আশ্বাস মিলেছে ঠিকই, কিন্তু একটি গাছকে নষ্ট করার বহু উপায় থাকে। আমরা সত্যিই চাই, গাছটি রক্ষা পাক। তথ্যচিত্রটি বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রদর্শনের আমন্ত্রণ পাচ্ছে। আমাদের আশা, নতুন প্রজন্ম আরও দৃঢ়ভাবে আমাদের পরিবেশকে সুরক্ষিত করবে।”
সমতা বিশ্বাস বলেন, “যখন জানতে পারলাম জমিটি বিক্রি হয়ে গেছে এবং জামরুল ও আমগাছ কেটে ফেলা হয়েছে, তখনই দেবলীনা আমাদের বিষয়টি জানান। আমরা গাছের তলায় গান গাইতে শুরু করি। সিদ্ধান্ত নিই, গাছটিকে কেন্দ্র করে আরও মানুষকে যুক্ত করতে হবে এবং বিষয়টিকে আরও জোরালোভাবে সামনে আনতে হবে।”
এই আন্দোলনের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর ও ২০২৫ সালের মার্চ মাসে গাছটির নিচে দুটি সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। উভয় ক্ষেত্রেই ব্যাপক দর্শকসমাগম হয়, আর সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল তেঁতুলগাছটি। শিল্পী দেবদীপ মুখার্জী, অর্ক মুখার্জী, মৌসুমী ভৌমিক প্রমুখ এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

সম্প্রতি আমাদের প্রতিনিধিরা যখন প্রায় ৭০ বছরের পুরোনো গাছটির কাছে যান, তখন তার পাশেই ইটের স্তূপ পড়ে থাকতে দেখা যায় এবং পেছনে প্রমোটিং-এর ভারী যন্ত্রপাতি চলছিল। তবু এক ছোট সাংস্কৃতিক আন্দোলন আপাতত গাছটিকে নিশ্চিহ্ন হওয়া থেকে রক্ষা করেছে। তেঁতুলগাছটি এখনও জীবিত—আর তার সজীব বাস্তুতন্ত্রও তেমনই স্পন্দনরত।