শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের চাকা কি এবার থামবে?
কলকাতার রাজপথে ট্রামের সুমধুর ঘণ্টা আজ ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। শহরের ১৫২ বছরের পুরনো এই ‘লিভিং হেরিটেজ’ যখন অস্তিত্ব সংকটে, ঠিক তখনই তাকে বাঁচাতে এগিয়ে এল মেলবোর্ন ও কলকাতার ট্রামপ্রেমীদের সংগঠন ‘ট্রামযাত্রা’। তাদের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত হলো ২০২৬ সালের বিশেষ ক্যালেন্ডার—’দ্য ট্রাম কন্ডাক্টরস ক্যামেরা’। লেন্সের ফ্রেমে নোনাপুকুরের গল্প।
এশিয়ার প্রাচীনতম ট্রাম নেটওয়ার্ককে বাঁচিয়ে রাখার আকুতি নিয়ে তৈরি এই ক্যালেন্ডারে উঠে এসেছে নোনাপুকুর ওয়ার্কশপের অন্দরমহল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে দক্ষ কারিগররা ট্রাম তৈরি ও মেরামতির কাজ করে আসছেন, এই ক্যালেন্ডার তাঁদের প্রতিই এক শ্রদ্ধার্ঘ্য।
মেলবোর্নের প্রাক্তন ট্রাম কন্ডাক্টর এবং ‘ট্রামযাত্রা’-র সহ-প্রতিষ্ঠাতা রবার্তো ডি’আন্দ্রিয়া দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে কলকাতার ট্রামকে ক্যামেরাবন্দি করেছেন। তাঁর তোলা উজ্জ্বল সব ছবি দিয়েই সাজানো হয়েছে দেয়াল ও টেবিল—উভয় ফরম্যাটের এই ক্যালেন্ডার।
রবার্তোর কথায়, “নোনাপুকুর ছাড়া ট্রামের অস্তিত্ব অসম্ভব। সেখানকার দক্ষ কর্মী এবং রঙিন ট্রামগাড়িগুলো কলকাতার ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একে হারিয়ে যেতে দেওয়া মানে শহরের আত্মার একটা অংশকে হারিয়ে ফেলা।”
পরিবেশ দূষণের প্রকোপে শহরের বাতাসের গুণমান সূচক (AQI) যখন প্রায়শই ৩০০ ছাড়িয়ে যায়, তখন জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে ট্রামের গুরুত্ব অপরিসীম। ক্যালকাটা ট্রাম ইউজার্স অ্যাসোসিয়েশনের (CTUA) সদস্য ও রেলওয়ের এক বৈদ্যুতিক ইঞ্জিনিয়ারের মতে, ব্যাটারি চালিত যানের চেয়ে ওভারহেড তারের বিদ্যুৎ চালিত ট্রাম অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব ও সাসটেনেবল। এই ক্যালেন্ডার কেবল স্মৃতিকাতরতা নয়, বরং একুশ শতকের দূষণমুক্ত শহরের জন্য ট্রামের প্রয়োজনীয়তাকেও তুলে ধরে।
সাহিত্য ও প্রতিবাদের মেলবন্ধন
ক্যালেন্ডারটির নকশা করেছেন ডেটা সায়েন্স প্রফেশনাল ও ট্রামকর্মী অনুরাগ মিত্র। প্রতিটি মাসের ছবির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে বিখ্যাত সাহিত্যিকদের উদ্ধৃতি, যা ট্রামের সঙ্গে কলকাতার গভীর আত্মিক যোগসূত্রকে মনে করিয়ে দেয়। অনুরাগ বলেন, “মেলবোর্ন থেকে সান ফ্রান্সিসকো—বিশ্বের বহু শহরের মতো কলকাতাও তার ট্রামের জন্য গর্বিত হতে পারে। এই ক্যালেন্ডার সেই আন্তর্জাতিক সংযোগেরই প্রতীক।”
সামনেই নির্বাচন। আর এই সময়টাকেই ট্রাম বাঁচানোর আন্দোলনের উপযুক্ত সময় বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা। মহাদেব শী, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সিটিইউএ-এর সাধারণ সম্পাদক, এই উদ্যোগকে সরকারের বর্তমান ট্রাম নীতির বিরুদ্ধে এক ‘নীরব ও সৃজনশীল প্রতিবাদ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। নির্বাচনের আগে জনমত গঠন এবং রাজনৈতিক নেতা থেকে সাধারণ নাগরিক—সবার কাছে ট্রাম বাঁচানোর বার্তা পৌঁছে দেওয়াই এই ক্যালেন্ডারের লক্ষ্য। রবার্তো ডি’আন্দ্রিয়ার স্লোগান তাই স্পষ্ট—”ওয়ান ভোট ফর ট্রামস”।
কারণ, ট্রাম বাঁচলে বাঁচবে শহরের সংস্কৃতি, বাঁচবে কলকাতার ফুসফুস।


