নভেম্বর ২০২৩ থেকে কলকাতার রাতের আকাশে এক নতুন আলো। স্বেচ্ছাসেবী গোষ্ঠী ‘কলকাতা রেস্টোরার্স’ নাগরিকদের ছোট ছোট অনুদানে আলোকিত করেছে ১০০টি ঐতিহাসিক ভবন। রাজ ভবন, সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালসহ বহু স্থাপত্য নিদর্শন নতুন করে প্রাণ পেয়েছে।
এই উদ্যোগের মূল শক্তি নাগরিক অংশগ্রহণ। বড় কর্পোরেট অনুদানের বদলে সাধারণ মানুষের ছোট দানই এখানে পরিবর্তনের হাতিয়ার। এর ফলে নাগরিকদের মধ্যে ঐতিহ্য সংরক্ষণের দায়িত্ববোধ ও গর্ব তৈরি হয়েছে।
২০২৩ সালের নভেম্বরে মানিকতলা বাজারের গম্বুজ আলোকিত করার মাধ্যমে আলোকসজ্জা প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল; এটি সম্পন্ন হওয়ার পর মনোযোগ অন্য একটি কাঠামোর দিকে যায়, তারপর আরেকটি, এবং এভাবেই কাজটি চলতে থাকে।
শহরের ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রদর্শনে আগ্রহী একদল কলকাতাবাসী ঐতিহ্যবাহী ভবন আলোকিত করার পাশাপাশি, বহু বছর আগে অচল হয়ে যাওয়া ভবনের ওপরের ঘড়িগুলো মেরামত করেছেন এবং সমাধিলিপি পরিষ্কার করেছেন। তারা নিজেদের ‘দ্য কলকাতা রেস্টোরার্স’ বলে পরিচয় দেন।
কলকাতার এক বিশিষ্ট স্থপতির কথায়, এই আলোকসজ্জা শহরের সেইসব দৃশ্যমান সম্পদকে তুলে ধরেছে, যা কলকাতার বিশৃঙ্খল ও অপরিকল্পিত নগর পরিকাঠামোর ভিড়ে হারিয়ে গিয়েছিল।
তিনি বলেন, “রাতে, যখন রাস্তার কোলাহল থাকে না, তখন কেবল বাড়িগুলোর আলোই তাদের সৌন্দর্যের দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করে। সেগুলোকে দেখতে চমৎকার লাগে। এই বাড়িগুলো শহরের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশকও বটে, বিশেষ করে যে রাস্তাগুলোতে সেগুলো অবস্থিত।”
আলোকিত হওয়া বেশিরভাগ ভবনই কলকাতা পৌরসংস্থার ঐতিহ্যবাহী ভবনের তালিকায় ছিল।
আলোকিত হওয়া অন্যান্য ভবনগুলোর মধ্যে রয়েছে —
চৌরঙ্গী ম্যানশনস, চৌরঙ্গীর বাইবেল সোসাইটি, অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস, এসপ্ল্যানেডের মেট্রোপলিটন বিল্ডিং, এপিসি রোডের আচার্য ভবন, কলকাতা পৌরসংস্থার সদর দপ্তর, গোলপার্কের রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচার, কালীঘাটের গ্রিক অর্থোডক্স চার্চ এবং পার্ক সার্কাস মোড়ের পার্ক কোর্ট, এবং সর্বোপরি ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল এর পরী।

এই ভবনগুলো আলোকিত করার ক্ষেত্রে ‘দ্য কলকাতা রেস্টোরার্স’-এর সাথে কাজ করা তিনটি সংস্থার মধ্যে একটির মালিক নিকিতা ভাটিয়া, বলেন, “আমরা যখন প্রথম ভবনগুলো পরিদর্শন করি, তখন সেগুলোর অনেকগুলোই জরাজীর্ণ অবস্থায় ছিল, বিশেষত ব্যক্তিগত মালিকানাধীন প্রপার্টি গুলো। আলোকসজ্জার আগে বাড়ির মালিকরা সেগুলো মেরামত ও রঙ করিয়েছেন।”
ভাটিয়া আরও বলেন, এই কাজের জন্য প্ল্যানিং খুব জরুরী ছিল। প্রতিটি বাড়ির আলোকসজ্জার নকশা তৈরি—কোন আলো ব্যবহার করা হবে, কোথায় এবং তার তীব্রতা কেমন হবে—তার পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিকল্পনা করতে হয়েছিল।
মালিকদের সাথে মাসিক বিদ্যুৎ বিলের একটি আনুমানিক হিসাব শেয়ার করা হয়েছিল। ভাটিয়া জানান, “বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিলের পরিমাণ মাসে ২,৫০০ থেকে ৩,৫০০ টাকার মধ্যে থাকে। আলো সারারাত জ্বলে না। সাধারণত সন্ধ্যা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত এগুলো জ্বালিয়ে রাখা হয়।” এই প্রকল্পের প্রধান উদ্যোক্তা মুদার পাথেরিয়া বলেন, সন্ধ্যায় ডালহৌসির রূপান্তর চাক্ষুষ করা ছিল অসাধারণ অভিজ্ঞতা।
পাথেরিয়ার মতে, “যদি আমরা আকাশবাণী ভবন থেকে যাত্রা শুরু করি, তবে সন্ধ্যায় আলোকিত ভবনের একটি সারি দেখতে পাওয়া যায়। আকাশবাণী ভবন, রাজভবন, স্ট্যান্ডার্ড লাইফ অ্যাসিওরেন্স ভবন, ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স ভবন, রয়্যাল ইন্স্যুরেন্স ভবন, জেনারেল পোস্ট অফিস (জিপিও), ডেড লেটার্স অফিস, ইস্টার্ন রেলওয়ের সদর দপ্তর এবং সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চ।”
গোষ্ঠীর একজন সদস্য বলেন, “বিল্ডিং গুলো যখন আলোকিত থাকে, তখন এই পথ ধরে হেঁটে যাওয়া বা গাড়ি চালিয়ে যাওয়াটাও একটি অসাধারণ অভিজ্ঞতা।” ‘কলকাতা রেস্টোরার্স’ শুধু ভবন আলোকিত করার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং বড় বড় ভবনের উপরে থাকা জরাজীর্ণ ও অচল ঘড়িগুলোর দিকেও মনোযোগ দিয়েছে। ক্যানিং স্ট্রিটের মাঘেন ডেভিড সিনাগগ, আমহার্স্ট স্ট্রিটের হলি ট্রিনিটি চার্চ, লেনিন সরণির স্যাক্রেড হার্ট চার্চ এবং শিয়ালদহের ডলোরস চার্চের ঘড়িগুলো আবার সচল করা হয়েছে।
ঘড়িগুলো পুনরুদ্ধারকারী টিআর ক্লক কোম্পানির অন্যতম মালিক সত্যজিৎ দত্ত বলেন,
“এই সব ঘড়িই চাবি দেওয়া ঘড়ি। সেগুলোর কিছুর যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত ছিল, আবার কিছুর কিছু অংশ অনুপস্থিত ছিল। যেখানে যন্ত্রাংশ ছিল না, সেখানে আমাদের সেগুলো মেরামত করতে এবং নতুন করে তৈরি করতে হয়েছে।”
এই কাজের জন্য অর্থ এসেছে শিল্পপতি, কর্পোরেট কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পেশায় থাকা শহরবাসীদের কাছ থেকে। পাথেরিয়া বলেন, “যারা এই কাজে অর্থ প্রদান করেছেন, তাদের কেউই নিজেদের নাম প্রকাশ করতে চাননি।” ‘কলকাতা রেস্টোরার্স’ এর দলটি সাউথ পার্ক স্ট্রিট কবরস্থানের ১,৩১২টি সমাধিফলকও পরিষ্কার করেছে, যেখানে চিন্তাবিদ, কবি ও শিক্ষক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও এবং ভারততত্ত্ববিদ উইলিয়াম জোন্সসহ আরও অনেকে সমাহিত আছেন।
গোষ্ঠীর একজন সদস্য বললেন,
“আমরা এখন এসএস হগ মার্কেটের (নিউ মার্কেট) ঘড়িস্তম্ভটি পুনরুদ্ধারের জন্য কেএমসি-র অনুমতির জন্য অপেক্ষা করছি। আমাদের কাছে তহবিল আছে। কেএমসি-র অনুমোদন পেলেই আমরা এটি পুনরুদ্ধার করব।”
এই আলোকসজ্জা আর ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের কাজ শুধু শহরের সৌন্দর্যই বাড়ায়নি, পর্যটনকেও উৎসাহিত করেছে। রাতের কলকাতা এখন ইতিহাস ও আধুনিকতার এক উজ্জ্বল মেলবন্ধন—যা শহরের আত্মাকে নতুন করে তুলে ধরছে। আর তুলে ধরছে এর আত্মার সাথে নাগরিকদের নাড়ির টানকে।


