Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

এই শীতে জে. এন. বড়ুয়ার আইকনিক ‘ছানার কেক’-এর জাদুতে মেতে উঠুন

বো ব্যারাক এর এই ঐতিহ্যবাহী বেকারির সুস্বাদু সৃষ্টি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কলকাতাবাসীর হৃদয়ে উষ্ণতা ছড়িয়ে আসছে। কলকাতায় থাকলে একবার হলেও চেখে দেখতেই হবে।
ছানা আর কেক—দুটির জুটি প্রথমে খুব স্বাভাবিক মনে নাও হতে পারে। কিন্তু বড়দিন এলেই কলকাতার বো ব্যারাক-এ জে. এন. বারুয়ার ছোট্ট ‘হোল-ইন-দ্য-ওয়াল’ বেকারি নিয়ে আসে এক অনন্য শীতকালীন স্বাদ—‘ছানার কেক’। এই ব্যতিক্রমী কুলিনারি ডিলাইটের সূচনা করেছিলেন যতীন্দ্রনাথ বড়ুয়া (জে. এন. বড়ুয়া), যার শিকড় ব্রিটিশ আমলের শেষ পর্বের ইতিহাসে প্রোথিত। চট্টগ্রামের (বর্তমান বাংলাদেশ) বাসিন্দা বড়ুয়া ভাগ্যান্বেষণে কলকাতায় আসেন।
জে এন বড়ুয়ার শক্তি তার সহজলভ্যতায়। এটি অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান স্টাইল বেকিং, যার মধ্যে মিশেছে বাঙালি উদ্ভাবন।
যখন আমদানি করা প্লাম আর ব্র্যান্ডির দাম বেড়ে গেছিল সেই সময় নিজেদের বেকারির দ্রব্য মূল্য ক্রেতাদের নাগালে রাখতে এরা বানাতে শুরু করে ছানার কেক।
তাঁর ছানার কেক অচিরেই বো ব্যারাক এর অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের মন জয় করে নেয়, আর সেখান থেকেই শুরু হয় এক দীর্ঘ যাত্রা।
তিন-চতুর্থাংশ শতাব্দীরও বেশি সময় কেটে গেছে। জে. এন. বড়ুয়া পাড়ি দিয়েছেন স্বর্গলোকে, বহু অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানও শহর ছেড়েছেন। কিন্তু আজও জে. এন. বড়ুয়া বেকারি ক্ষুধার্ত অসংখ্য মানুষের জন্য নানান ধরনের বেকারি আইটেম বিক্রি করে চলেছে।
জে. এন. বড়ুয়ার মৃত্যুর পর তাঁর দুই ছেলে মন্টু ও রতন দোকানের দায়িত্ব নেন। তবে কয়েক বছর আগে মন্টুর মৃত্যু হলে পুরো দায়িত্ব বর্তায় ছোট ভাই রতনের ওপর।
ছানার কেক বিভিন্ন মাপের অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল বাক্সে পাওয়া যায়, যার দাম ৪০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। আগে ছানার কেকসহ জে. এন. বড়ুয়ার অন্যান্য কেক কাগজে মোড়া থাকত। কিন্তু সেই বিশেষ কাগজ বাজারে না থাকায় এখন অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল বোওলে প্যাক করা হচ্ছে।
দোকানের আরেকটি আকর্ষণ তাদের ওয়াইন কেক—আপেল, আঙুর, আদা ইত্যাদি দিয়ে ঘরোয়া ভাবে ফারমেন্ট করা ওয়াইন ব্যবহার করে তৈরি। এছাড়াও রয়েছে রাম কেক, ফ্রুট কেক ও ওয়ালনাট কেক।
তার সঙ্গে গ্রাহকদের হট ফেভারিট নানা ধরনের প্যাটিস—ভেজ, চিকেন, মাটন, পনির এমনকি নারকেলের পুরেও পাওয়া যায়।
শীত এলেই সোশ্যাল মিডিয়া এই ছোট্ট বেকারির জন্য বড় ভূমিকা পালন করে। নতুন প্রজন্মের ক্রেতাদের আকর্ষণ করে প্রতি বছরই ‘হোল-ইন-দ্য-ওয়াল’ বেকারিতে ভিড় বাড়ে।
১৯২০ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে কোনও একসময় চালু হওয়া এই বেকারি আজ পরিচালিত হচ্ছে তৃতীয় প্রজন্মের বেকারদের দ্বারা—যাঁদের মধ্যে সৌরভ বড়ুয়াও রয়েছেন।
জে এন বড়ুয়াই কোলকাতাকে একসময় দিয়েছিল টিফিন কেক— ছোট, স্বাদে ভরপুর, টিফিন বক্সে রাখার উপযোগী একটি বাটার কেক। ক্রিসমাসে এখানে থাকে ৯ থেকে ১০ ধরনের কেক—ফ্রুট, ওয়াইন, রাম আর আখরোট—যেগুলো বেশ ঘন আর ওয়াইনে জারিত। এই সব কেক সেই অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান রুচির উপযোগী, যাদের কাছে ডেজার্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এখানকার রান্নাঘর এখনও পুরোনো ধারার—শুধু কাঠ জ্বালানো ওভেন। উৎপাদন আজও পুরোপুরি হাতে করা হয়, নিখুঁত ও অপচয়হীন।
ক্রিসমাস ইভ-এ সারা রাত কাজ চলে। ওভেন থেকে বেরোনো কেক সরাসরি পৌঁছে যায় ক্রেতার হাতে—ম্লান লাল রঙের সাইকেল ভ্যানে করে। এই লজিস্টিক ব্যবস্থাও একই রকমের যতটা নস্টালজিক, ততটাই কার্যকর।
এইসব নস্টালজিয়ার হাত ধরেই কলকাতায় বড়দিন আসে আর শীতের আমেজ গায়ে মেখে কলকাতাবাসী উৎসবে মাতে।