Sunday, May 10, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

বড়দিনে আজও অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান, ইহুদি ও গোয়ান ট্রাডিশনের মেল্টিং-পট কলকাতার ঐতিহ্যবাহী বেকারিগুলি

প্লাম, আখরোট, বাদাম আর রামের সুবাসে ক্যারামেলাইজ হয়ে ওঠা ক্রিসমাস কেক যেন কোলকাতার অতীতের দিকে ফিরে যাওয়ার গোপন পথের এক অলিখিত মানচিত্র—
যার প্রতিটি সমন্বয় বিন্দুতে লুকিয়ে আছে শহরের কয়েকশ’ বছরের স্মৃতি।
রফি আহমেদ কিদওয়াই রোড থেকে একটু ভেতরে, উনিশ নম্বর আবদুর রহমান স্ট্রিট—সরু, সাদামাটা, চোখে পড়ার মতো নয়। তবু ফি বছর ডিসেম্বর মাসে সেখানে বেড়ে যায় মানুষের আনাগোনা।
দেখা যায় হাতে বড় বড় সাদা-নীল ব্যাগ নিয়ে একের পর এক মানুষের বেরিয়ে আসার দৃশ্য।
ব্যাগগুলো—চৌকো, ভারী কিন্তু অত্যন্ত যত্ন করে ধরা, যেন ভেতরে আছে কিছু ভঙ্গুর, কিন্তু খুব প্রিয় জিনিস।
আরও কাছে এগোলে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। প্রথমে ভ্যানিলার গন্ধ, তারপর রাম, আর তার পর শুকনো ফলের গাঢ়, গভীর মিষ্টি গন্ধে —যে ফল হয়তো মাসের পর মাস, কিংবা তারও বেশি সময় ধরে ভেজানো আছে।
চোখে পড়ে একটি সবুজ গেট—নম্র অথচ স্পষ্ট। দেওয়ালে আঁকা রোমান আখরের একটি মাত্র শব্দ, “সালদানহা”, আর বাঁ দিকে নির্দেশ করা একটি তিরচিহ্ন।

এটাই ৯৫ বছর ধরে চলে আসা বেকিংয়ের ঐতিহ্য । পরীক্ষা আর পুনরাবৃত্তির মধ্য দিয়ে নিখুঁত হয়ে ওঠা এক সুবাস—যে রেসিপি টিকে আছে যুদ্ধ, দেশত্যাগ, রেশনিং, সংস্কার আর নতুন শহরের বদলাতে থাকা রুচির মধ্যে দিয়ে।
এই সুবাসের পরিসর জুড়ে রয়েছে চার প্রজন্মের একনিষ্ঠ ক্রেতা—যাঁরা প্রতি ক্রিসমাসে সেই গন্ধ অনুসরণ করেই ফিরে ফিরে আসেন ফেলে আসা দেশের স্মৃতির ঘরে।
কেকের মতোই, বেকারিটিও বহরে নয়, বরং উচ্চতায় বেড়ে উঠেছে।
একটি বাঁকানো সিঁড়ি পাক খেয়ে উঠে গেছে, যার ধাপে ধাপে সাজানো বড় বড় ব্লু ডার্ট ডিসপ্যাচ বাক্স—প্রতিটি সিলমোহর দেওয়া, সিল করা, আর সারা ভারতে পাঠানোর অপেক্ষায়। এখানে ক্রেতারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দূরপাল্লার কুরিয়ার এজেন্টদের সঙ্গে—একটাই উদ্দেশ্য, ক্রিসমাস কেক আর স্যাভরি।
এখানে কেউ ঘোরাঘুরি করেন না, কারও দ্বিধা নেই। সবাই জানেন, তাঁরা ঠিক কী নিতে এসেছেন।
অর্ডারের চাপে ব্যস্ততার মাঝেই বেরিয়ে আসেন ডেব্রা আলেকজান্ডার— গোয়ান বেকারির তৃতীয় প্রজন্মের অভিভাবক—মাথায় বেকার এর নরম বেরেট। তাঁর সঙ্গে আছেন কন্যা আলিশা আলেকজান্ডার, আইকনিক এই বেকারির চতুর্থ প্রজন্মের মালিক।
ডেব্রা বলেন, “ক্রিসমাস এমন একটি সময়, যখন ঐতিহ্যের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। আর সেই ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দু হল ক্রিসমাস কেক। চার প্রজন্ম ধরে আমরা ঐতিহ্যবাহী রিচ ফ্রুট ক্রিসমাস কেককে আয়ত্তে এনেছি ও নিখুঁত করে চলেছি। এটা একটি বার্ষিক আচার অনুষ্ঠান, একটি পরম্পরা, আর এটাই আমাদের সিগনেচার। চার প্রজন্ম ধরে নিখুঁত থাকার চেষ্টার কারণেই মানুষ বারবার ফিরে আসেন।”
ডেব্রা আরও যোগ করেন, “এটা শুরু করেছিলেন আমার দিদিমা, পথ চলতে কিছুটা বদল এসেছে, কিন্তু মূল রেসিপি একই রয়ে গেছে। এটা গোয়ার ৯০ বছরের পুরোনো একটি রেসিপি। আমরা গোয়ান।”
একনিষ্ঠ ক্রেতাবাহিনী গড়ে ওঠার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আলিশা বলেন, “আমার মনে হয়, আমরা যা করি তার প্রতিটি ধাপে আমাদের ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানই আসল। প্রক্রিয়া শুরু থেকে শেষ হওয়া পর্যন্ত আমরা নিজেরা থাকি। আমরা সেরা মানের উপকরণ ব্যবহার করি। আমি দেখেছি আমার দিদিমাকে এভাবে কাজ করতে, যিনি আবার তাঁর দিদিমাকে এভাবেই করতে দেখেছিলেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এটাই চলে আসছে। বেকারির প্রতি আমাদের ভালোবাসা কেকের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়।”
ডেব্রা যোগ করেন, “আমাদের বেকারি সবসময়ই গড়ে উঠেছে সদিচ্ছা আর বিশ্বাসের উপর। শুরুতে কোনও মার্কেটিং ছিল না—শুধু মুখে মুখেই খবর ছড়াত।”

সানা মাসুদ ইব্রাহিম , এই অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পাড়ায় বড় হয়ে ওঠা মহিলা গত নয় বছর ধরে তাঁর ক্লাউড কিচেন ড্রুলিশিয়াস চালাচ্ছেন। ক্রিসমাস এলেই তাঁর সিগনেচার লিনজার কুকি, গন্ধরাজ শিফন কেক, রোস্ট চিকেন আর মিন্স মিট পাইয়ের অর্ডারে ভরে যায় খাতা। তিনি বলেন, “অনেক সময় ক্রেতারা সালদানহা বেকারি থেকে তাঁদের পছন্দের কেক পান না , বা অনলাইনে অর্ডার দিতে পারেন না। তাই সালদানহার আখরোট কেক থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে আমি আমার নিজস্ব সংস্করণ বানিয়েছি, যেটা আমাদের সবচেয়ে বেশি বার বার অর্ডার হওয়া আইটেমগুলোর একটি। কলকাতাবাসীর দৃষ্টিভঙ্গি এখনও অনেকটাই ব্রিটিশ। অন্তত কেক এর ক্ষেত্রে ব্রিটিশ আমলের স্মৃতিজনিত নস্টালজিয়া প্রবল। তাঁরা চান, প্রতি ক্রিসমাসে খাবার আর কেকের স্বাদ যেন একই থাকে। সেই বিশেষ স্বাদের নস্টালজিয়ার টানেই তাঁরা বারবার ফিরে আসেন।”
সানা থাকেন বো ব্যারাক্স এর কাছেই —লাল ইটের ক্যান্টনমেন্ট ভবনে গড়ে ওঠা এক ঐতিহাসিক অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বসতি—যেখান থেকে ঢিল ছোড়ার দূরত্বে রয়েছে আইকনিক ‘হোল ইন দ্য ওয়াল’ জে এন বড়ুয়া বেকারি। জে এন বড়ুয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ক্রিসমাসের সময়ের অনেক আগে থেকেই মানুষ লাইনে দাঁড়াতে শুরু করেন। ছোট থেকে দেখছি, ৩০০ থেকে ৪০০ মিটার লম্বা লাইন গিয়ে পৌঁছয় বউ বাজার থানার কাছ পর্যন্ত।”
১৯২০ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে আসা শরণার্থী যতীন্দ্র নাথ বারুয়ার হাতে প্রতিষ্ঠিত এই বেকারি আজ পরিচালিত হচ্ছে তৃতীয় প্রজন্মের বেকারদের দ্বারা—যাঁদের মধ্যে একজন সৌরভ বড়ুয়া। জে এন বড়ুয়ার শক্তি তার সহজলভ্যতায় আর তাদের অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বেকিংএ যার মধ্যে মিশেছে বাঙালির উদ্ভাবন।
জে এন বড়ুয়াই কোলকাতাকে দিয়েছে টিফিন কেক, ছানার কেক, বাড়িতে তৈরী ফ্রুট ওয়াইন এর স্বাদে ভরপুর, ৯ থেকে ১০ ধরনের কেক
ফ্রুট, ওয়াইন, রাম আর আখরোট— এর সুবাসে জারিত অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান নস্টালজিয়া।

গোয়ান স্বাদের সালদানহা হোক বা শতাব্দী পেরোনো অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান জে এন বড়ুয়া। দুশো বছর পার করা আজমিরি বেকারী থেকে ইহুদী ঐতিহ্যের নাহুমস এন্ড সনস্ এই সমস্ত নস্টালজিয়ার ছায়াপথকে একত্রে বেঁধে রেখেছে এদের কাঠের জ্বালের উনুন গুলো।
শতাব্দী পেরিয়ে যা আজও কলকাতার রসনাকে তৃপ্ত করে চলেছে বংশানুক্রমিক স্মৃতি মেদুরতায়।
যার তাড়নায় আজও বড়দিন-এ ঘন্টার পর ঘন্টা নাহুমস এর বাইরে লাইন দেন সত্তরোর্ধ জয়দেব সাহা নিজের শৈশবের সাথে নাতি-নাতনিদের শৈশবের পরিচয় করাতে।
আর ভীড় পেরিয়ে একমুখ তৃপ্তি নিয়ে বড়ুয়া বেকারির থেকে ছানার কেক আর স্যাভরির প্যাকেট হাতে বেরিয়ে আসেন সান্দ্রা বিশ্বাস।
তিনি বলেন, “আমি জে এন বড়ুয়ায় এসেছি, কারণ আমার ঠাকুমা খুব নির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়ে আমাকে পাঠিয়েছিলেন—দুটি প্যাটিস, দুটি ছানার কেক আর একটি ওয়াইন কেক।
আমার ঠাকুমা গত বছর প্রয়াত হয়েছেন, কিন্তু সেই নির্দেশ আজও রয়ে গেছে।”
এভাবেই রয়ে যায় কলকাতা আর তার বড়দিন এর ঐতিহ্য।