“ভালোর শিক্ষা যদি সবার জন্য হয়, তবে তা কেন শুধুমাত্র এক ধর্মের বইতেই সীমাবদ্ধ থাকবে?”
মুম্বইয়ের এক ১২ বছরের কিশোরীর মনে নিঃশব্দে বাস করা এই নিরীহ প্রশ্নই পরবর্তীতে তাকে দেশজোড়া আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। সেই কন্যার নাম—মারিয়ম আসিফ সিদ্দিকি।
সাধারণ স্কুলছাত্রী মারিয়মের জীবনে টার্নিং পয়েন্ট আসে যখন একদিন স্কুলে ঘোষণা হয় এক অভিনব প্রতিযোগিতার—‘গীতা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ’, যা সম্পূর্ণভাবে ভগবদগীতার শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। শত শত ছাত্রছাত্রীরা নাম লেখাচ্ছিল। চারপাশে উত্তেজনা থাকলেও মারিয়মের মনে চাপ নয়, জন্ম নিল কৌতূহল।
বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে জানার আগ্রহ তার বরাবরই ছিল। তার বিশ্বাস—প্রতিটি ধর্মগ্রন্থেই থাকে সার্বজনীন সত্যের কোনো না কোনো অংশ।
তাই সে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিল। জেতার জন্য নয়—বোঝার জন্য।
মারিয়মের বাবা-মাও তাকে পুরোপুরি উৎসাহই দিলেন। তারাও তাকে বড় করেছেন এই বিশ্বাসে—জ্ঞান কোনো সীমানা মানে না, আর সম্মান কোনো ধর্মের বাঁধনে আটকে থাকে না।
বাড়িতে বসে মারিয়ম নিয়মিত প্রস্তুতি নিল, অন্যান্য ছাত্রছাত্রীদের দেওয়া গীতার উপাদান যত্ন করে পড়ল। প্রতিটি পঙ্ক্তি, সংলাপ, শিক্ষা, মূল্যবোধ—সাবলীলভাবে আত্মস্থ করল। মুখস্থ করার জন্য নয়—বোঝার জন্য। মাঝেমধ্যে তার মনে প্রশ্ন উঠত—ভালোর তো কোনও পৃথক ধর্ম নেই, তাহলে সব শিশুদের কেন তা শেখানো হয় না?
পরীক্ষার দিন এসে গেল। একশো নম্বরের পরীক্ষা, যা বড়দেরও টেনশনে ফেলেছিল। কিন্তু মারিয়ম শান্ত ছিল।
শান্ত, স্বচ্ছ মনে লিখল; যেন শেখা জ্ঞান নিজে থেকেই তার কলমে ভেসে উঠছিল। পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে সে জয়-পরাজয়ও ভাবেনি—তার মনে তখন সদ্য শেখা পাঠের থেকে আহরিত শান্তির অনুভূতি বিরাজ করছে।
কয়েক দিন পর প্রকাশিত হল ফলাফল।
প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে মারিয়ম। একজন মুসলিম ধর্মাবলম্বী কিশোরী জিতল সম্পূর্ণ ভগবদগীতা-ভিত্তিক প্রতিযোগিতা।
হলভর্তি হাততালি ছাপিয়ে বাইরে শুরু হল আরও বড় প্রতিক্রিয়া। বিস্ময়, আবেগ, আপ্লুত মানুষদের স্রোত।
ধর্মীয় বিভাজন যেখানে প্রায়শই বড় করে দেখা হয়, সেখানে দাঁড়িয়ে এক ছোট্ট মেয়ের আত্মিক বোধ প্রমাণ করল—বিভাজন রোধের ক্ষমতা পারস্পরিক বোঝাপড়া মাঝেই সবচেয়ে বেশি নিহিত থাকে।
এই অভিজ্ঞতা থেকে কী অনুভূতি তার? প্রশ্ন করা হলে মারিয়মের উত্তরে সবাই নিস্তব্ধ হয়ে যায়—
“মানবতাই সবচেয়ে বড় ধর্ম।”
তার এই উত্তর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রশংসায় ভরিয়ে দেন নেতা-মন্ত্রী, শিক্ষাবিদ ও সাধারণ মানুষ। এরপর আসে জীবনের সবচেয়ে অবাক করা আমন্ত্রণ—ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার।
স্মরণীয় সেই দিনে মারিয়ম ছোট ছোট পদক্ষেপে প্রবেশ করল একটি বড় বার্তা নিয়ে। প্রধানমন্ত্রী তাকে সস্নেহে অভিনন্দন জানালেন। তার কৌতূহল, তার সকল ধর্মের প্রতি সম্মান—সবটুকু প্রশংসা করলেন। সে সেখানে প্রতিযোগিতার চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নয়—ঐক্যের প্রতীক হিসেবে গিয়েছিল।
সেই সাক্ষাতে মারিয়ম আরেকটি নীরব কিন্তু শক্তিশালী পদক্ষেপ নেয়—পুরস্কারের টাকাটি জনকল্যাণ ও জাতীয় প্রয়োজনে দান করে দেয়।
তার বয়সে এমন সিদ্ধান্ত যেকোনো বক্তৃতার চেয়েও বড় বার্তা দেয়। বিদায়ের আগে তাকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয় পাঁচটি ধর্মগ্রন্থের বই। এটি উপহার মাত্র নয়, বরং তার পরিচয়ের স্বীকৃতি—এক এমন উত্তরসুরীর প্রতি, যে পৃথিবীকে ধর্মের সঙ্কুচিত চশমা দিয়ে নয়, মানবতার বিস্তৃত চোখ দিয়ে দেখেছে।
বইগুলো বুকে চেপে বাইরে বেরিয়ে আসতেই ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, নেতাদের হাসিমুখ, চারদিকের প্রশংসা। কিন্তু আসল পরিবর্তন ঘটেছিল মানুষের মনে—যারা তার কাহিনি শুনল।
কারণ, মারিয়ম অন্যদের হারিয়ে জেতেনি।
সে জিতেছে ভারতকে মনে করিয়ে দিয়ে—সদাচার, সহমর্মিতা, বোঝাপড়া কোনো একক ধর্মের সম্পত্তি নয়।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে যেন বিশ্বও উপলব্ধি করল—সীমা পেরোয়নি মারিয়ম।
বরং সীমারেখারাই তার সামনে নতজানু হয়েছে।


