Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

‘তেপান্তর’ আদিবাসী নাট্য গ্রাম –ভূমিজ শিল্পচর্চার অনন্য ধারায় পর্যটনের স্বাদ

পশ্চিমবঙ্গের ছোট্ট গ্রাম সাতকাহনিয়ায় অবস্থিত আদিবাসী থিয়েটার ক্যাম্পাস ‘তেপান্তর’ যেন সত্যিই বিশ্বমঞ্চকে গ্রামের বুকে নিয়ে এসেছে। কিন্তু শুধু তাদের অনবদ্য গ্রামীণ ঐতিহ্য ও লোকশিল্পের প্রদর্শনীই নয়—তাদের কাছ থেকে শেখার আছে আরও অনেক কিছু।
অজয় নদীর তীরে, বর্ধমান জেলার এক শান্ত-নির্জন প্রান্তরে গত দুই দশক ধরে গড়ে উঠেছে ভারতের বিকল্প থিয়েটার চর্চার এক অপূর্ব কেন্দ্র—‘তেপান্তর’। সাতকাহনিয়া গ্রামের এই নির্মল ক্যাম্পাসটি আজ এক পূর্ণাঙ্গ গ্রামীণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, যেখানে থিয়েটার ও পারফর্মিং আর্টই জীবিকার প্রধান মাধ্যম। গ্রামটির অদ্ভুত প্রাকৃতিক পরিবেশ, নিসর্গের নৈঃশব্দ্য ও অনবদ্য লোকজ আবহ তৈরি করেছে এমন এক মঞ্চ, যেখানে দর্শক উপভোগ করেন বাংলা গ্রামীণ সভ্যতার সম্পূর্ণ ভিন্নতর স্বাদ।
শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় নগরী দেখতে প্রতিবছর অসংখ্য দেশি-বিদেশি পর্যটক আসেন। কিন্তু খুব কম জনই জানেন এই সাতকাহনিয়ার গ্রাম বা এখানে গড়ে ওঠা ‘এবং আমরা’ নামের অভিনব রেপার্টরি সংস্থার কথা—যা গঠিত হয়েছে স্থানীয় আদিবাসী মানুষের হাত ধরে। এই দলটি তাঁদের নিজস্ব রীতি-রেওয়াজ, নৃত্য-সঙ্গীত, আচার-অনুষ্ঠানকে দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত করে এমন এক অভিনয়শৈলী তৈরি করেছে, যা বিশ্বজোড়া শিল্পরসিকদের সহজেই নজর কাড়ে।
মুরগি–মাছ–ফলচাষে জীবনযাপন
‘তেপান্তর’—যার অর্থ বিস্তীর্ণ খোলা প্রান্তর—মোট চার একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। এখানে রয়েছে খোলা মঞ্চ, মহড়া ও কর্মশালার ক্ষেত্র, শিল্পীদের প্রশিক্ষণস্থল, এবং পর্যটকদের থাকার জন্য মনোরম কটেজ ও ডরমিটরি। ঘন গড় জঙ্গলের মাঝে, আঁকাবাঁকা অজয় নদীর ধারের এই গ্রাম পর্যটক ও শিল্পপ্রেমীদের চোখে এক অপূর্ব চিত্রকল্প। এখানকার বাসিন্দারা একসময় ছিলেন দিন-মজুর। সারাদিনের মজুরীর কাজ সেরে নাট্যচর্চায় যোগ দিতেন। কিন্তু সেই ব্যবস্থায় যথাযথ ভাবে নাট্য চর্চায় লিপ্ত হওয়া সম্ভব ছিল না।
তাই গ্রামে বসবাস করেই এরা মুরগিপালন, মাছচাষ, ফলচাষ ইত্যাদি কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে এখন জীবিকা নির্বাহ করেন। থিয়েটার গ্রাম সাতকাহনিয়ার ‘এবং আমরা’ দলের প্রতিষ্ঠাতা কল্লোল ভট্টাচার্য জানান,
“কেন্দ্রটি চালাতে আমাদের নিজস্ব আয়ের প্রয়োজন ছিল। তাই আমরা ধীরে ধীরে পোল্ট্রি, মাছচাষ, আম–পেয়ারা বাগান শুরু করি—স্থানীয় ব্যাঙ্কের সহায়তায়। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল একটি গ্রামীণ থিয়েটার ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র তৈরি করা, কারণ গ্রাম বাংলায় বিকল্প শিল্পচর্চার জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণ ও ব্যবস্থার অভাব রয়েছে।”
এই অঞ্চলের আদিবাসীরা—মূলত সাঁওতালরা, যারা পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা জুড়ে বিস্তৃত—ভাদু, টুসু, বাউলসহ নানা লোকসঙ্গীত ও নৃত্যের মাধ্যমে সারা বছরের উৎসব উদযাপন করেন। অভিনয়, সঙ্গীত, নৃত্য, মার্শাল আর্ট, প্রপ সহযোগী—থিয়েটারের প্রতিটি শাখায় তাঁদের দক্ষতা অনন্য। সবচেয়ে বড় কথা, এরা অসম্ভব অতিথি পরায়ন, অতিথিদের মাঝে এরা আন্তরিক ও উষ্ণ আতিথেয়তা পরিবেশন করেন।
কল্লোল আরও বলেন, “প্রতিটি সাপ্তাহিক ছুটিতে আমরা তেপান্তর ক্যাম্পাসে এক পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক পরিবেশনের আয়োজন করি। শুধু নাটক নয়, স্থানীয় আদিবাসীদের নৃত্য, লোকসঙ্গীত কনসার্ট—বিভিন্ন রকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও থাকে। আমরা এখানে শিল্প–সংস্কৃতি কেন্দ্রিক এক পর্যটন পরিকাঠামো গড়ে তুলতে চাই।”
ইউরোপীয় ভ্রমণার্থীদের জন্য এক নতুন আবিষ্কার
বহু বাংলার লোককথায় ‘তেপান্তর’ মানেই সভ্যতার সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকা এক রহস্যময়, সীমাহীন প্রান্তর।
গত চৌদ্দ বছরে ‘এবং আমরা’ সত্যিই এমন এক সীমাহীন মঞ্চ গড়ে তুলেছে, যেখানে কল্পনা ও বাস্তবতার সুন্দর সহাবস্থান ঘটে। থিয়েটার দলের আদিবাসী সদস্যদের শ্রম ও সৃজনশীলতায় গড়ে ওঠা এই ক্যাম্পাস ইউরোপীয় যে কোনও ভ্রমণার্থীর কাছে ভারতের সাসটেনেবল থিয়েটারচর্চার এক বিরল উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
লাল মাটির পথ, গভীর জঙ্গলের ভেতর পাকানো রাস্তা, নির্মল বাতাস—সব মিলিয়ে তেপান্তর আলাদা হয়ে দাঁড়ায় বিশ্বের কোলাহল থেকে। শিল্পচর্চার পাশাপাশি সংগ্রাম, আর বিশ্বদর্শকের কাছে পৌঁছানোর এক অনমনীয় আকাঙ্ক্ষা—এই সব মিলিয়ে এখানকার শিল্পীরা আজ অসাধারণ মঞ্চনৈপুণ্যের অধিকারী।