Sunday, May 10, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

কলকাতার ঐতিহ্যমণ্ডিত কুমোরটুলির অন্দরে

প্রথামতে আষাঢ় মাসে রথযাত্রার সময়ে মাটি তুলে শারদীয়া দূর্গাপূজার মূর্তি তৈরির কাজ শুরু হয়। তারপর গোটা শ্রাবণ, ভাদ্র পেরিয়ে আশ্বিন মাসের দেবীপক্ষে শেষ হয় মায়ের মৃন্ময়ী মুর্তি গড়ার সেই কাজ। পুরো তিন-চার মাসের কঠোর পরিশ্রমের ফল বাঙালির প্রাণের দূর্গোৎসব।

“আমি দুর্গা গড়ি। কিন্তু আমি কার দুর্গা?”—প্রশ্ন তুললেন কুমোরটুলির খ্যাতনামা, প্রথম নারী প্রতিমাশিল্পী মালা পাল। ১৯৮৭ সালে পিতার মৃত্যুর পর মাত্র ১৪ বছর বয়স থেকেই প্রতিমা গড়া শুরু করেছিলেন তিনি।

তাঁর বাবা ছিলেন একজন দক্ষ মৃৎশিল্পী, কিন্তু নারীরা এই পেশায় আসুক তা তিনি কখনও মেনে নেননি।
তবু সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ হারানোর পর আর কোনো উপায় ছিল না মালাদেবীর কাছে।
প্রায় তিন দশক পেরিয়ে আজ মালা পাল কুমোরটুলির অল্প কয়েকজন নারী প্রতিমাশিল্পীর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

তবে তাঁর মেয়ের ইচ্ছে নেই মায়ের পথ অনুসরণ করে প্রতিমাশিল্পী হওয়ার। বর্তমানে সে বি.কম পড়ছে, আর এই নিয়েই চিন্তিত মালা পাল।

“আমাদের কোনো সন্তানই আর এই অষ্টম শতাব্দী থেকে চলে আসা প্রতিমা গড়ার ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে চাইছে না। কুমোরটুলি মরছে।”

তাই তিনি আজ নেতৃত্ব দিচ্ছেন কুমোরটুলির পুনর্জাগরণের আন্দোলনে। শুরু করেছেন প্রথম ইন-হাউস পাঠশালা, যেখানে ৩২ জন ছাত্রছাত্রীকে প্রতি রবিবার প্রতিমা গড়ার কৌশল শেখান তিনি। সারা বাংলার নানা প্রান্ত থেকে—বিধাননগর থেকে দমদম, তারকেশ্বর থেকে চন্দননগর, মধ্যমগ্রাম থেকে চুঁচুড়া—এসে শিখছে তরুণরা।

“কম আয়, অচেনা-অপরিচিত জীবন আর শিল্পকে আয়ত্ত করার দীর্ঘ শ্রমসাধ্য পথ নতুন প্রজন্মকে এই পেশা থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। সবাই অফিসের চাকরি খুঁজছে। আমাদের সন্তানরা যদি মাটির প্রতিমা গড়তে না চায়, তাহলে আর ২০ বছর পর এই উত্তরাধিকারে প্রাপ্ত শিল্প একেবারেই হারিয়ে যাবে। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি—সারা বাংলা থেকে আসা ছেলেমেয়েদের নিয়ে নতুন শিল্পী তৈরি করব,” – দৃঢ় কণ্ঠে বলেন মালা পাল।
নারীদের ভূমিকা নিয়ে আজ তাঁর মত কী?

“সময় বদলেছে। এখন নারীরা যেমন বিমান ওড়াচ্ছে, বাস চালাচ্ছে, বড় বড় প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছে—তেমনই শিল্পেও এগিয়ে আসছে। সমাজ আজ অনেক বেশি সম্মান দিচ্ছে নারীদের। যখন আমি শুরু করেছিলাম, তখন নারীদের প্রতিমা গড়তে দেওয়া হতো না। আমরা পুরুষদের আধিপত্য ভেঙে ঢুকে পড়েছি এই জগতে এবং কাজ করছি। ১৯৮৭ সালে আমি ১১টি প্রতিমা গড়েছিলাম, তার মধ্যে মাত্র ২টি বিক্রি হয়েছিল। আর আজ আমি বছরে ২০০-রও বেশি প্রতিমা গড়ি, যেগুলো কয়েক দিনের মধ্যেই সারা পৃথিবীর নানা প্রান্তে পাঠানো হয়।”

“আমাদের শিল্পীজীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক মুহূর্ত হলো প্রতিমার বিসর্জন দেখা। নিজের গড়া দেবীকে ডুবতে দেখা সত্যিই হৃদয়ভাঙা অভিজ্ঞতা”, শেষ করেন তিনি।

যার শুরু আছে তার শেষও আছে, তাই প্রতিবছর চারদিনের উৎসব শেষে মাতৃ প্রতিমার নিরঞ্জন অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু কুমোরটুলির শিল্পের নিরঞ্জন কেউ চায় না।

ঐতিহ্য তো বহতা নদীর মত, বিভিন্ন স্তরে পুরানোকে ছেড়ে, নতুনকে জুড়ে তা তাই এগিয়ে চলে।
কুমোরটুলির ঐতিহ্য বয়ে চলুক তা প্রতিটি বাঙালির আশা, এই আশাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব তাই আমাদেরই নিতে হবে।