Saturday, May 9, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

জুবিন গর্গ- সমসাময়িক এক ‘সূর্যে’র নাম

অসমের সাংস্কৃতিক হৃদস্পন্দন, ‘ইয়া আলি’ এবং ‘পিয়া রে পিয়া রে’-এর মতো গান দিয়ে হৃদয় জয় করা প্রিয় গায়ক জুবিন গর্গ আর আমাদের মধ্যে নেই। মাত্র ৫২ বছর বয়সে এক দুর্ঘটনা আকস্মিক ভাবে থামিয়ে দিল এক কর্মময় জীবন।

এই খবর মর্মান্তিক তবু যাওয়ার সময়ও তিনি গড়ে গেলেন এক বিশ্ব রেকর্ড…..পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম জনসমাবেশ হওয়া শবযাত্রার মিছিলের রেকর্ড।
এই রেকর্ডের মালিক বাকি তিনজন কারা?
প্রথম, পপ সঙ্গীতের বাদশা, মাইকেল জ্যাকসন, দ্বিতীয়, ভাটিকান সিটি সহ ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের সর্বেসর্বা পোপ দ্বিতীয় ফ্রান্সিস আর তৃতীয়, ইংল্যান্ড এর প্রয়াত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ।
এদের পাশে চতুর্থ স্থানাধীকারী ভারতের মত তৃতীয়বিশ্বের দেশের এক ছোট রাজ্য অসমের আঞ্চলিক গায়ক, জুবিন গর্গ।


এই খবর রাষ্ট্র হওয়ার পরপরই হইচই পড়ে গেছে দেশে.. কে এই জুবিন?? সবধরনের মিডিয়া ভেসে যাচ্ছে অনেক অনেক তথ্যে…..
আসুন তাহলে জানার চেষ্টা করি আসলে কে এই জুবিন গর্গ??
১৯৭২ সালে ম্যাজিস্ট্রট ও কবি পিতা কপিল বরঠাকুর আর সাহিত্যপ্রেমী, সঙ্গীত শিল্পী মা ইলি বরঠাকুর এর ঘরে মেঘালয়ের ছোট্ট শহর তুরা-তে জন্মগ্রহণ করেন জুবিন। ইস্কুল থেকে কলেজজীবন কেটেছে অসমের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে। সঙ্গীত শিক্ষার শুরু মায়ের কাছে, সাথে তবলা ও লোকসঙ্গীত এর শিক্ষা নিয়েছেন বিভিন্ন গুরুর সান্নিধ্যে।
অবশেষে সঙ্গীতের টানে কলেজজীবন মাঝপথে ছেড়ে শুরু করেন কেরিয়ার। সেটা ১৯৯২ সাল। তৈরী করেন নিজের মিউজিক অ্যালবাম “অনামিকা”, যা মুক্তি পায় ১৯৯৩ সালে। ঘটনাক্রমে কলেজ ছাড়ার ঠিক একবছর পরেই নিজের কলেজের অনুষ্ঠানেই জনপ্রিয় শিল্পী হিসেবে প্রধান অতিথির আমন্ত্রণ পান।
আর পিছন ফিরে তাকাতে হয় নি। ২০০২ সালে অনুষ্ঠান করে ফেরার সময় এক পথ দূর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছিল ছোটবোন জংকি বরঠাকুর-এর জীবন। অল্পের জন্য বেঁচে যান জুবিন। এই ঘটনা অনেকটাই বদলে দিয়েছিল তার জীবনের পথ।

সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে ৩৩ বছরের কর্মজীবনে তাঁর রেকর্ড করা প্রকাশিত গানের সংখ্যা ৩৮ হাজারের বেশী। অপ্রকাশিত, প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা সংখ্যা ধরলে এই সংখ্যা ৪০ হাজার এর কাছাকাছি।
গান গেয়েছেন অহমিয়া,বাংলা,হিন্দী,নেপালি,ইংরাজী সহ চল্লিশটি ভাষায়।
একজন বাদ্যযন্ত্রী হিসেবে তিনি রপ্ত করেছেন বারো ধরনের বাদ্যযন্ত্র যার প্রতিটিতেই তাঁর ছিল অনায়াস যাতায়াত।

২০০৯ সালে মিউজিক ডিরেক্টর হিসেবে ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পান ,”ইকোস অব সাইলেন্স” এর জন্য।
লিরিসিস্ট হিসেবে লেখা ও প্রকাশিত গানের সংখ্যা ৫০০০ টি, প্রকাশের অপেক্ষায় আছে আরও বেশ কিছু।
“কিং অব হামিং” এর আখ্যা পাওয়া জুবিন গর্গ একাধারে সিঙ্গার, কম্পোজার, লিরিসিস্ট, অ্যাক্টর, স্ক্রিপ্ট লেখক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও প্রযোজক।

অহমিয়া সঙ্গীত ও চলচ্চিত্র জগতের “ওয়ান ম্যান আর্মি” জুবিন গর্গ, অসমীয়া ইন্ডাস্ট্রির হাল ধরেছিলেন তখন, যখন তা দুর্দশা গ্রস্হ।

উপার্জনের তোয়াক্কা না করেই, অসমীয়া জাতির শিল্প, সংস্কৃতি সঙ্গীতকে দেশে বিদেশে প্রচারের জন্য কাজ করে গেছেন নিরন্তর।

বাংলার চলচ্চিত্র জগতেও একসময় অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল তাঁর কন্ঠ। বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য শেষ গাওয়া তাঁর গান এখন প্রকাশের অপেক্ষায়।
অসমের “আলফা” অধ্যুষিত সময়ে, তাদের ফতোয়াকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যেমন প্রকাশ্য মঞ্চে হিন্দি ভাষার গান গাইতে দ্বিধাবোধ করেননি, ঠিক তেমনই বারো বছর মুম্বই চলচ্চিত্র জগতে কাজ করে বিপুল জনপ্রিয়তা পাওয়ার পরও এক লহমায় সব ছেড়ে নিজের মাটিতে শিকড়ের কাছে থাকা মানুষদের সাথে কাজ করার জন্য ফিরে এসেছেন অসম এ।


সমকালীন সময়ের একমাত্র শিল্পী যিনি মঞ্চে উঠে নিজেকে সোস্যালিষ্ট লেফ্টিষ্ট বলে নির্দ্বিধায় ঘোষণা করেছেন বারবার। সোজা সাপ্টা সমালোচনা করতে দ্বিধাবোধ করেননি কোনও রাজনৈতিক দলের, তা সরকারের হোক বা বিপক্ষের। মানুষদের ওপর হওয়া প্রতিটি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন। সে গাছ কেটে ফ্লাইওভার বানানো হোক অথবা “ক্যা (CAA)” আন্দোলন। হয়ে উঠেছিলেন অসমের “ভয়হীন জনকন্ঠ” ।
প্রতিদিন ঘুম থেকে ওঠার আগেই তার বসার ঘরে ভিড় করে আসত মানুষ, অগনিত রোগীর চিকিৎসা, গরীব ছাত্র ছাত্রীদের পড়াশোনার অনুদান থেকে শুরু করে আর্তদের যাবতীয় সাহায্যের জন্য তার দূয়ার আর পকেট সর্বদাই উন্মুক্ত ছিল।

দানের জন্য তৈরি করেছেন কলাগুরু বিষ্ণুরাভা ট্রাস্ট আর তার অর্থ জোগাড় করার জন্য ফুটবল টিম বানিয়ে প্রদর্শনী ম্যাচ খেলতে যেতেন বিভিন্ন স্হানে। উদ্দেশ্য অর্থ জোগাড়ের পাশাপাশি অসমের যুব সমাজকে ফুটবল-এ উৎসাহিত করা। জীবনকালে ভারতীয় ফুটবল টিমের একটা বিশ্বকাপ ম্যাচ দেখতে চেয়েছিলেন তিনি।
তাঁর সেই আশা অপূর্ণ থেকেছে সত্য কিন্তু সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের আশা পূর্ণ করার কাজ থেমে থাকেনি তাঁর।

জুবিন এবং তার স্ত্রী গরিমা সাইকিয়া গর্গের নিজস্ব কোন সন্তান ছিল নেই, কিন্তু জুবিন ১৫ জন বঞ্চিত শিশুকে দত্তক নিয়েছিলেন এবং তাদের জীবন বদলে দিয়েছিলেন।

তাদের মধ্যে কাজলি তার হৃদয়ে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করেছিল।
কাজলি — সেই ছোট্ট মেয়ে যে জুবিনের পিতৃত্বের স্বপ্নকে নতুন অর্থ দিয়েছিল। একদিন, কাজ থেকে ফেরার সময়, জুবিন রাস্তায় কাজলিকে দেখতে পান। সে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করত এবং ক্রমাগত নির্যাতনের শিকার হচ্ছিল।

জুবিন কেবল তাকে উদ্ধার করেননি, বরং তার জন্য আইনি লড়াইও লড়েছিলেন, জয়ী হয়েছিলেন এবং তাকে দত্তক নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তার শিক্ষা এবং প্রতিটি প্রয়োজনের দায়িত্ব নিয়েছেন।
আরেকটি চা-জনজাতির দুস্হ শিশু অরুণ সাচনি কে শিবসাগর থেকে নিয়ে এসে নিজের বাড়িতে রাখেন আর নিজের পদবী দিয়ে প্রতিপালন করেন। তার মৃত্যুর পর মুখাগ্নির অধিকারও পান অরুণ গর্গ।
জুবিনের স্ত্রী গরিমাও প্রতিটি পদক্ষেপে তাকে সমর্থন করেছেন, হয়ে উঠেছেন তাঁর শক্তি, হয়ে ওঠেছেন ১৫ জন দত্তক নেওয়া সন্তানের মা।

শুধু মানুষ নয়, অসমের পাহাড়, নদী, বন-জঙ্গল, পশু পাখিদের প্রতিও ছিল জুবিনের অপার ভালোবাসা। গানের শো করতে যাতায়াতের পথে অসুস্থ পশু পাখিদের বাড়িতে তুলে নিয়ে এসে চিকিৎসা করানোর স্বভাবের জন্যও পরিচিত ছিলেন তিনি। তাঁকে প্রায়শই রাস্তায় পশুদের খাওয়ানো এবং তাদের যত্ন নিতে দেখা যেত।
জুবিন পশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে অনেক সাহসী পদক্ষেপও নিয়েছিলেন। কাজ করেছেন কাজিরাঙায় “পোচিং” আটকানোর জন্য।

তাঁর কাজ এবং সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গির স্বীকৃতিস্বরূপ, PETA ইন্ডিয়া তাঁকে ‘Hero to Animals Award’ দিয়ে সম্মানিত করেছে। এই সম্মান তাঁর প্রেম, দয়া এবং প্রাণীদের প্রতি ন্যায়বিচারের অনুভূতিকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
জুবিনের মৃত্যুর পর, PETA ইন্ডিয়া জানিয়েছে যে, তারা তাঁকে সর্বদা প্রাণীদের একজন বন্ধু, এবং অনুপ্রেরণা হিসেবে স্মরণ করবে।

জুবিন এবং গরিমা একসাথে সর্বদা মানবতা এবং ভালোবাসাকে সবকিছুর উপরে স্থান দিয়েছেন – বন্যার্তদের সাহায্য করা, কোভিডের সময় তাদের বাড়িকে একটি “কেয়ার সেন্টার” এ পরিণত করা এবং সব পরিত্যক্ত মানব শিশু ও পশুদের জন্য একটি পরিবার প্রদান করার কাজ করে গেছেন।
এসব কিছুর পরেও তিনি ছিলেন প্রত্যেক অসমবাসীর আত্মীয়। রাজ্যের মন্ত্রী আমলাদের থেকে তাঁর কাছে পাড়ার মোড়ের পানের দোকানি ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রাস্তার ধারের পাইস হোটেলের টলমলে টুল-এ বসে রুটি সবজি বা মাছের ঝোলভাত খেতে কোনও আন্তর্জাতিক খ্যাতি তাঁর বাধা হয়ে ওঠেনি।
আবার স্টেজে উঠে, জামা তুলে দেখিয়ে, “বামুনের ছেলে হয়েও আমার পৈতে নেই, আমার কোনও জাত নেই, ধর্ম নেই, ভগবান নেই, আমি মুক্ত ” ঘোষণা করতেও দুবার ভাবেননি কখনও।
বিখ্যাত ছিল তাঁর সেন্স অব হিউমার। “আমি মরলে অসম সাতদিন বন্ধ থাকবে”, নিশ্চিত ছিলেন তিনি। বলেছিলেন মারা যাওয়ার পর “মায়াবিনী” গাইতে।

কথা রেখেছে অসমবাসী, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে উজানি অসম, নামনি অসম, বরাক উপত্যকার প্রতিটি অসমবাসী গত চারদিনে রোমান্টিক “মায়াবিনী”কে প্রার্থনা সঙ্গীতে পরিণত করেছে।
তিন দিনে তাঁকে শেষবারের মত দেখতে আসা জনসংখ্যার পরিমাণ এক কোটি ছাড়িয়েছে (মনে রাখতে হবে অসমের জনসংখ্যা তিন কোটির কিছু বেশি)।

তাঁর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে আপামর অসমবাসী স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বন্ধ করেছেন সমস্ত সরকারি,বেসরকারি, ব্যবসায়িক, অব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান।
অতিক্রম করেছেন শ পাঁচেক কিলোমিটার পথ।

প্রিয় শিল্পীকে একবার নিজেদের মাঝে পাওয়ার দাবিতে যোরহাটের ন্যাশনাল হাইওয়ে প্রত্যক্ষ করেছে ৩০ ঘন্টার পথঅবরোধ।
জুবিন গর্গ চেয়েছিলেন “নিজের মাটিতে রাজার মত মৃত্যু” । দুর্ভাগ্য তাঁর মৃত্যু ডেকে এনেছিল বিদেশের মাটিতে। তবু দেশের মানুষ রাজার মতই শেষবিদায় জানালো তাঁদের “প্রাণের আমঠু জুবিন দা” কে।
জুবিন গর্গ আর এই পৃথিবীতে নেই। আর তৈরী হবেনা নতুন গান। কিন্তু শেষ হয়নি জুবিন গর্গের সঙ্গীত, তার মানবতাও শেষ হয়নি – উভয়ই চিরকাল হৃদয়কে আলোকিত করে চলবে।
মাত্র বাহান্ন বছরের জীবন কালে জুবিন গর্গ নিজেকে নিজের কর্মের মাধ্যমে কিংবদন্তীতে উত্তীর্ণ করতে পেরেছেন যা অমরত্ব লাভ করবে অসমীয়া মানুষের জীবনযাত্রায় মিশে।

তাহলে আসলে এই জুবিন গর্গ কে??
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে অসম তথা ভারতের হৃদয়জয়ে সর্বাপেক্ষা ধনী ব্যক্তি – জুবিন গর্গ, একথা বলাই যায়।