বাঙালির হিন্দু উৎসবে ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহৃত চালের গুঁড়োর এই অস্থায়ী চিত্রকলা আল্পনা এবার স্থান পাচ্ছে ক্রিসমাসের অলংকরণে। পরিকল্পনায় আছেন এক ইসলাম ধর্মাবলম্বী।
ক্রিসমাস ইভে ‘আলপনা’র শৈল্পিক ঔজ্জ্বল্যে সেজে উঠছে দক্ষিণ কলকাতার কালীঘাটের গ্রিক অর্থোডক্স চার্চের পবিত্র পরিসর এবং লেনিন সরণির হলুদ রঙের ঘড়ি-টাওয়ার-সজ্জিত ল্যাটিন ক্যাথলিক—স্যাক্রেড হার্ট চার্চ। এই উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন মুসলিম ব্যবসায়ী ও সমাজকর্মী মুদার পাথেরিয়া এবং তাঁর দুই বন্ধু—অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষিকা রত্নাবলী ঘোষ ও পেশাদার আলপনা শিল্পী প্রশান্ত সাইন।
পাথেরিয়া বলেন, “বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে আলপনা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত এবং এই শিল্পরূপ ধর্মনিরপেক্ষ—এই কারণেই চার্চে আলপনার মোটিফ ব্যবহারের ভাবনাটা আমার মাথায় আসে।”
তিনি জানান, “২০২২ সালেই প্রথম আমরা কলকাতার চার্চে আলপনা আঁকার উদ্যোগ নিই—তখন স্যাক্রেড হার্ট চার্চ ও সেন্ট থমাস চার্চ সাজানো হয়েছিল। চার্চ কর্তৃপক্ষ এতটাই পছন্দ করেছিলেন যে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সেগুলো মুছে ফেলা হয়নি। গতবছর আর এ বছর ওই চার্চগুলোর একটিতে আগের কাজের সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করেছি এবং আরেকটিতে নতুন করে আলপনা এঁকেছি।”
পাথেরিয়া ও তাঁর বন্ধুরা বেশ কিছুদিন ধরেই শহরের নানা প্রান্ত সাজিয়ে তুলছেন—যে উদ্যোগকে তাঁরা বলতে ভালোবাসেন ‘র্যান্ডম অ্যাক্টস অব কাইন্ডনেস’।
প্রায় তিন বছর আগে এই যাত্রা শুরু হয়। দক্ষিণ কলকাতার একটি গেটেড আবাসনের প্রতিবেশী পাথেরিয়া ও ঘোষ নিজেদের আবাসনের নান্দনিকতা বাড়াতে এলোমেলো কিছু বাড়ির বাইরের দেওয়াল ও প্রবেশপথে আলপনা আঁকতে শুরু করেন। এই উদ্যোগে তারা ব্যাপক প্রশংসা পান।
এরপর ৭২ বছর বয়সী রত্নাবলী ও প্রশান্ত দ্রুতই নজর কাড়েন, যখন আশপাশের বহু কলকাতাবাসী এক সকালে ঘুম ভেঙে দেখেন—তাঁদের বাড়ির দোরগোড়ায় আঁকা হয়েছে অনিন্দ্যসুন্দর আলপনা।
পাথেরিয়া বলেন, “ওটাই ছিল আমাদের উদ্যোগের দ্বিতীয় পর্ব। এরপর আমরা ভাবলাম, যেহেতু এই শিল্পরূপ ধর্মের সীমানা ছাড়িয়ে আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে, তাই ধর্মীয় স্থানেই কাজ করা যাক। চার্চ ছিল এই ভাবনা ছড়ানোর জন্য ভালো পরীক্ষাক্ষেত্র, আর আমি খুশি যে তা সফল হয়েছে।”
কালীঘাটের চার্চে আলপনা আঁকার সময় শহরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা কৌতূহলী মানুষের প্রশংসায় অভিভূত ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা ঘোষ। তিনি বলেন, “চার্চটি কালীমন্দিরের রাস্তার ঠিক উল্টো দিকে। মানুষ প্রথমে মন্দিরের দিকে তাকিয়ে মাথা নত করে প্রণাম করছিলেন, তারপর চার্চের দিকে ঘুরে যিশুকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছিলেন। আমি যা করছিলাম, তা তাঁদের খুব ভালো লেগেছে।”
এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শহরের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনাই ফুটে উঠেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ঘোষ জানান, আগেরবার চার্চ কর্তৃপক্ষের তরফে কিছুটা ‘হালকা দ্বিধাবোধ’ থাকলেও, এ বছর তাঁদের সাড়া ছিল অনেক বেশি আন্তরিক ও উষ্ণ।
তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, “যতদিন হাঁটু সায় দেবে, ততদিন আমি শহর সাজাতে আলপনা আঁকতেই থাকব।” মানুষের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় তিনি যে নতুন উদ্যমে ভরপুর, তা তাঁর কথাতেই স্পষ্ট।
গ্রিক অর্থোডক্স চার্চের প্যারিশ প্রিস্ট ফাদার রাফায়েল মাইতি মনে করেন, শতাব্দীপ্রাচীন এই স্থাপত্যের সঙ্গে আলপনা মোটিফ অত্যন্ত সুন্দরভাবে মিশে গেছে। চারটি ডোরিক স্তম্ভে ভর করা বিশাল ত্রিভুজাকার পেডিমেন্টসহ এই চার্চের সম্মুখভাগ দেখতে অনেকটা গ্রীক মন্দিরের মতো।
তিনি বলেন, “ক্রিসমাসের আগের রাতে চার্চে এই আলপনা খুবই সুন্দর লাগছে। বাঙালির ঐতিহ্যবাহী শিল্পরূপ গ্রহণে আমার কোনো আপত্তি নেই।”
তিনি আরও যোগ করেন, “বাহ্যিক সাজসজ্জার থেকেও বড় কথা—খ্রীস্ট আমাদের শেখান ধৈর্য, আনুগত্য ও ভালোবাসায় হৃদয়কে সাজাতে। আমরা যে অশান্ত সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, সেখানে এই আলপনাগুলি সেই শিক্ষারই প্রতিফলন।”


