স্বামী-স্ত্রী জুটি উমাশঙ্কর মিশ্র ও শ্রুতি মিশ্রের প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়া কুইজিন একটি ফুড ই-কমার্স স্টার্টআপ। তারা তাদের অনলাইন স্টোরের মাধ্যমে যুক্তিসংগত দামে পশ্চিমবঙ্গের আঞ্চলিক খাবার ও খাদ্যপণ্য সারা ভারতে বিক্রি করেন।
বিশ্বজুড়ে ভারতীয় খাবারের জনপ্রিয়তা আজ আকাশছোঁয়া—যুক্তরাজ্যে চিকেন টিক্কা মসালা হোক বা ক্যারিবিয়ানে জনপ্রিয় ভারতীয় সামোসা। ভারতের প্রতিটি রাজ্যেরই নিজস্ব স্বাদ ও পরিচিতি রয়েছে। যেমন দিল্লি বিখ্যাত চাট ও পরোটার জন্য, গুজরাটের পরিচয় ঢোকলা, গাঠিয়া ও পাপড়ি, রাজস্থানের খ্যাতি ডাল বাটি, চুরমা ও গাট্টে কি সবজি—এভাবেই একের পর এক রাজ্যের নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
পশ্চিমবঙ্গও তার খাঁটি আঞ্চলিক রান্নার জন্য সমানভাবে বিখ্যাত। রাজভোগ, মোতিপাক, রসগোল্লা ও সন্দেশের মতো বাঙালি মিষ্টির পাশাপাশি দার্জিলিং চা, নলেন গুড় ও মুড়িও বাংলার বিশেষত্ব। এমনকি তুলনামূলক কম পরিচিত বাঙালি মশলা ও খাওয়ার পরের স্ন্যাকসও রাজ্যের ভেতরে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়ে থাকে।
সমৃদ্ধ বাঙালি খাদ্যসংস্কৃতিই উমাশঙ্কর মিশ্র ও শ্রুতি মিশ্রকে অনুপ্রাণিত করে এই সুস্বাদু খাবার ভারতের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে দিতে। সেই ভাবনা থেকেই ২০২১ সালের জানুয়ারিতে কলকাতায় যাত্রা শুরু করে ইন্ডিয়া কুইজিন।
এই স্টার্টআপের পণ্যের তালিকায় রয়েছে বাঙালি মিষ্টি, খাঁটি বাঙালি গ্রসারি, দেশি ঘি, শুকনো ফল, মিষ্টি ও স্ন্যাকস, পানীয়, ফ্রাইয়াম, ইনস্ট্যান্ট মিক্স, উপবাস ও ফলাহারী খাবার, পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ স্ট্যাপলস ও মশলা।
উমাশঙ্কর জানান, পশ্চিমবঙ্গে মানুষের খাবারের পর মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস রয়েছে। ২০২০ সালে লকডাউনের কিছুদিন পরই তাঁদের বাড়িতে মিষ্টির স্টক ফুরিয়ে যায়। তিনি বলেন, “প্রতিটি খাবারের পর আমার মিষ্টি খাওয়ার তীব্র ইচ্ছে হয়। লকডাউনের সময় কয়েকদিন বাড়িতে তৈরি মিষ্টি থাকলেও, খাঁটি বাঙালি মিষ্টির স্বাদ আমরা খুব মিস করতাম। সেখান থেকেই ইন্ডিয়া কুইজিনের ভাবনা জন্ম নেয়।”
তিনি আরও জানান, “আমি সবসময়ই একটি ই-কমার্স ব্যবসা শুরু করতে চেয়েছিলাম। অতিমারির সময় সেই স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দেওয়ার সুযোগ পাই। খাঁটি স্থানীয় ব্র্যান্ড নিয়ে গবেষণা করে দেখি, বহু ব্র্যান্ড বিশ্বজুড়ে পরিচিতি ও বিশ্বাস অর্জন করলেও এখনও অনেকটাই অগোছালো অবস্থায় রয়েছে। এই ক্ষেত্রের বিশাল সম্ভাবনা আমাকে অনুপ্রাণিত করে। এখন আমার স্বপ্ন—পশ্চিমবঙ্গের খাবার যেন প্রতিটি ভারতীয়ের থালায় পৌঁছে যায়।”
শুরুতে মাত্র ৫১টি পণ্য ও ৫টি ক্যাটেগরি নিয়ে পথচলা শুরু হলেও, বর্তমানে এই স্টার্টআপ ১০টি ক্যাটেগরিতে ৪০০টিরও বেশি পণ্য নিয়ে কাজ করছে। ইন্ডিয়া কুইজিন অ্যান্ড ফুড প্রোডাক্ট প্রাইভেট লিমিটেড ভারত সরকারের শিল্প ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য উন্নয়ন দফতরের (DPIIT)-এর স্বীকৃতিও পেয়েছে।
দুই সদস্যের ছোট্ট দল নিয়ে শুরু হলেও, বর্তমানে ইন্ডিয়া কুইজিনে কাজ করছেন পাঁচজন। এটি শুরুর আগে উমাশঙ্করের একক মালিকানাধীন ব্যবসায় ২০ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতা ছিল, যেখানে তিনি পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জুট মিলে ২,০০০টিরও বেশি ধরনের পণ্য সরবরাহ করতেন।
শ্রুতি মিশ্রের রয়েছে ১১ বছরেরও বেশি পেশাগত অভিজ্ঞতা। তিনি অ্যাকাউন্টস, ফাইন্যান্স, কস্টিং, কোম্পানি আইন ও কমপ্লায়েন্স বিষয়ে শীর্ষস্থানীয় ভারতীয় সংস্থা ও বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে কাজ করেছেন। ইন্ডিয়া কুইজিনে উমাশঙ্কর দেখাশোনা করেন পণ্য সংগ্রহ, ডেসপ্যাচ ও শিপিং-এর দায়িত্ব, আর শ্রুতি সামলান ফাইন্যান্স, কস্টিং, কমপ্লায়েন্স, কোম্পানি আইন, অ্যাকাউন্টস ও প্রোকিউরমেন্ট। এই স্টার্টআপটি একটি B2C মডেলে কাজ করে। গ্রাহকেরা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অর্ডার দেন এবং পণ্য সরাসরি তাঁদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়।
মিষ্টি পাঠানো হয় এয়ার কার্গোর মাধ্যমে এবং অন্যান্য পণ্য পাঠানো হয় বিভিন্ন পরিবহণ ব্যবস্থায়, যাতে নির্ধারিত শেল্ফ লাইফের মধ্যেই সেগুলি খাওয়া যায়। সারা দেশে ২৬,০০০টিরও বেশি পিন কোডে পণ্য পৌঁছে দিতে ইন্ডিয়া কুইজিন ডেলিভারি, ব্লু ডার্ট, এক্সপ্রেসবিজ, কেরি ইন্ডেভ, DTDC, গতি প্রভৃতি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সংস্থার পরিষেবা ব্যবহার করে।
স্টার্টআপটি সরাসরি কোম্পানি, ডিস্ট্রিবিউটর অথবা স্থানীয় বাজার ও দোকান থেকে পণ্য সংগ্রহ করে। যেসব ব্যবসা বা বিক্রেতার কাছ থেকে পণ্য নেওয়া হয়, তাদের কাছ থেকে কোনও কমিশন নেওয়া হয় না। পাইকারি দামে পণ্য কিনে গ্রাহকদের কাছে সেই দামের উপর নির্দিষ্ট মার্জিন যোগ করে বিক্রি করা হয়। লাভজনক বলে দাবি করা এই স্টার্টআপের পণ্যের দাম ৩৮ টাকা থেকে শুরু করে ১,২২০ টাকা পর্যন্ত। এখন পর্যন্ত তারা ২০,০০০ জনেরও বেশি গ্রাহককে পরিষেবা দিয়েছে। শ্রুতি জানান, অতিমারি-জনিত লকডাউনের কারণে শুরুতে এই সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। তবে আগামী দিনে সারা ভারতে ২ কোটিরও বেশি এবং দেশের বাইরে ১ কোটিরও বেশি গ্রাহকের কাছে পৌঁছনোর লক্ষ্য রয়েছে তাঁদের।
২০২২ অর্থবর্ষের শেষে সংস্থার টার্নওভার ছিল ২০ লক্ষ টাকা। মাত্র ২১,০০০ টাকা প্রাথমিক বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠাতারা নিজেরাই এই স্টার্টআপ শুরু করেন। বিক্রি দ্রুত বাড়তে থাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী বিনিয়োগ বাড়ানো হয় এবং এখন পর্যন্ত(স্থায়ী খরচসহ) মোট বিনিয়োগের অঙ্ক প্রায় ১০ লক্ষ টাকা।
আগামী দুই বছরের মধ্যে ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার মিলিয়ে বার্ষিক ২৫ কোটি টাকারও বেশি টার্নওভার অর্জনের লক্ষ্য নিয়েছে ইন্ডিয়া কুইজিন। ইন্ডিয়া কুইজিনের প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থার মধ্যে রয়েছে সুইগি, জোমাটো, বিগবাস্কেট, গ্রোফার্স ও বঙ্গহাট। রিসার্চ অ্যান্ড মার্কেটস-এর একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ভারতের স্ন্যাকস বাজারের মূল্য ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি হবে। সেই দিকে দৃষ্টি রাখলে ইন্ডিয়া কুইজিন এর ভবিষ্যত উজ্জ্বল বলেই ধরা যেতে পারে।


