Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

সমাজমাধ্যমের জাদুকে কাজে লাগিয়েই উন্নিসা এখন ‘বিয়িং গরজাস’

বাঁকুড়ার প্রত্যন্ত এক গ্রাম তিলুরির এক সাধারণ মধ্যবিত্ত একান্নবর্তী পরিবারের মেয়ে উন্নিসা কবিরাজ। ছোটবেলা কেটেছে সত্তর-আশির দশকে জন্মানো সব বাচ্চাদের শৈশবের মতই পড়াশোনা, খেলাধুলা আর পাড়াতুতো সাংস্কৃতিক কার্যকলাপে মেতে থেকে। দ্বাদশ শ্রেণি উত্তীর্ণ হয়ে স্নাতক স্তরের পড়াশোনা আসানসোলে তারপর পাড়ি দেন পশ্চিমে। নাগপুর থেকে মাস্টার্স করার পর চাকরি আর বিবাহ সূত্রে ঘুরে বেড়ান মুম্বই, বেঙ্গালুরুর মত শহর গুলোতে। তারপর প্রেগন্যান্সি তাকে ফিরিয়ে আনে কলকাতায়, পরিবারের সান্নিধ্যে। ছাড়তে হয় চাকরি।

এই পর্যন্ত এক সাধারণ মেয়ের গল্পই ছিল, হয়তো এভাবেই জীবনধারা চলত এক সাধারণ গতিপথে, কিন্তু বাধ সাধল মনের গভীরে থাকা এক ইচ্ছে, কিছু একটা অন্যরকম করার।

সালটা ২০১৭, সবে সবে ইন্টারনেট এক সহজলভ্য জিনিসে পরিণত হচ্ছে। ফেসবুকে একটি মেয়েদের গ্রুপ খোলেন উন্নিসা, being gorgeous নামে। উদ্দেশ্য, সমমনস্ক মহিলাদের নিয়ে একটি গোষ্ঠী গড়ে তোলা যেখানে মেয়েরা নিজেদের গণ্ডিতে আদান প্রদানের মাধ্যমে একে অপরের সাপোর্ট সিস্টেম হতে পারে। অবিলম্বেই সদস্য সংখ্যা বাড়তে থাকে, স্বতঃপ্রণোদিত ভাবেই শুরু হয় ব্যবসায়ী মেয়েদের লাইভ সেলিং।

এই সদস্যদের উৎসাহ থেকেই ২০১৯ সালের আগস্ট-এ গ্রুপের দু’বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে প্রথমবার তারা অফলাইন প্রদর্শনী করেন গিরিশ পার্কের ওয়াইএমসিএ-তে। তা এতটাই সফল হয় যে সেপ্টেম্বর মাসেই একই জায়গায় আবার প্রদর্শনী করতে হয় তাদের। এরপরের প্রদর্শনী ২০২০-র মার্চ। তারপর তো অতিমারি ও লকডাউনের জন্য সবার মতোই থমকে যায় জীবন।

কিন্তু এই নতুন পরিস্থিতি এক নতুন পথের সন্ধান দেয়। ফেসবুক গ্রুপ-এ বাড়তে থাকে অনলাইন লাইভের সংখ্যা।

এই অনলাইন সদস্যদের চাহিদা মেটানোর কথা ভাবতে গিয়েই একটি বিরাট সম্ভাবনার দিক দেখতে পান উন্নিসা। শুরু করেন পেইড লাইভ প্রোগ্রাম, পাশাপাশি তাকে এই কাজে সাহায্য করার জন্য বেতনভোগী সহায়ক নিযুক্ত করেন তিনি। সঙ্গে চলতে থাকে অনলাইন সেলারদের দের গ্রুমিং-এর কাজটিও, যাতে তার এই প্ল্যাটফর্ম একটি সুস্থ ও জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে। কার্যত হয়ও তাই। অতি কম সময়ের মধ্যেই ১.২৪ লক্ষ সদস্য নিয়ে being gorgeous কলকাতা শহরের অন্যতম মহিলা প্রধান বিকিকিনি গ্রুপ-এ পরিণত হয়।
এরপর অতিমারির শেষে ২০২২-এর পুজোর আগে Rong নাম দিয়ে কামব্যাক এক্সিবিশন করেন তারা, সাফল্য ছিল অভূতপূর্ব। এরপর সে বছর এর শীতে Rainbow নামে মেলার মতো outdoor exhibition করেন, পাশে পান bong m s সংস্থাকে। এই সময় বাজারের পরিস্থিতি বুঝে মহিলাদের পাশাপাশি পুরুষ ব্যবসায়ীদের জন্যও খুলে দেওয়া হয় সদস্যপদ।
এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি।

কলকাতা শহরের বিভিন্ন স্থানে তো বটেই কলকাতার বাইরে শিলিগুড়ি, দিল্লি, বেঙ্গালুরুর মত শহরেও গত দু’বছর ধরে এক্সিবিশন করছেন তিনি তার গ্রুপের সদস্যদের নিয়ে। এবছর থেকে নজর দিচ্ছেন কলকাতার আশেপাশের জেলাগুলোতেও।

দুলাখের কাছাকাছি সদস্য নিয়ে being gorgeous এখন এমন একটি সংস্থায় পরিণত হয়েছে যে সব ধরনের ছোটো ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা এখানে যুক্ত হতে চাইছেন।

কিন্তু গ্রুপ-এর ভাবমূর্তি বজায় রাখতে আর ক্রেতাদের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা মাথায় রেখে বিক্রেতা নির্বাচনের দিকটি নিয়ে খুবই সাবধানে পা ফেলেন উন্নিসা আর তার এডমিন টিম। ওঁর মতে এই যে গ্রুপ টি সাফল্য পেয়েছে তার কারণ হল এই বিশেষ নিয়ম কানুন মেনে চলা।

যদিও এর জন্য অনেক রকম সমালোচনা শুনতে হয় তাকে তবে উনি মনে করেন কাজের ক্ষেত্রকে এগিয়ে নিয়ে যেতে গেলে দক্ষ প্রশাসককে কিছু কিছু নিন্দার সম্মুখীন হতেই হয়। তবু দিনের শেষে এই মানুষগুলোই যখন ভাল রোজগার করে সফল হন তখন সেই সাফল্য উন্নিসাকেও খুশি করে।

ওঁর মতে চাকরি জীবনে যে পরিমাণ সময় আর শ্রম লাগে তার থেকে অনেকটা কম সময় আর শ্রমে তিনি ও তার দলের বিক্রেতারা আজকের সাফল্য পেয়েছেন। সাথে আছে নিজস্ব ব্যবসায় থাকার স্বাধীনতা যা মহিলাদের সংসার আর কাজের সময় ব্যালান্স করতে অনেকটাই সুবিধা করে দেয়।

আর এই সব সুবিধার তুলনায় অসুবিধার সংখ্যা নিতান্তই কম, তবু কাজ বাদ দিয়ে, ব্যাক্তিগত জীবন নিয়ে, চরিত্র নিয়ে যখন মানুষের নিন্দা, কটূ কথা কানে আসে সেগুলোই খানিকটা দুঃখ দেয় উন্নিসাকে। ওঁর মতে মেয়ে হওয়ার এই দিকটা ছাড়া অন্য কোনো সমস্যা ওকে ফেস করতে হয়নি।

বরং ২০২৪-এ যান্ত্রিক গোলযোগে যখন দু’লক্ষ সদস্যের গ্রুপটি হঠাৎ উবে যায় তখন যেভাবে সবাই পাশে দাঁড়িয়ে মাস খানেকের মধ্যেই আবার গ্রুপটিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে, সেটাই এই গ্রুপের প্রতি সবার ভালোবাসার পরিচয় হয়ে ওঠে। আর এর মধ্যে শুধুমাত্র বিক্রেতারা নন ক্রেতারাও সমান অংশীদার। তাই এটা একটা সফল কম্যুনিটি। বর্তমানে গ্রুপের অ্যাডমিন টিমে ৮-১০ জন কর্মরত আর ৭৫০-৮০০ বিক্রেতা এখান থেকে আয় করেন।
https://vorai.in/wp-content/uploads/2025/08/WhatsApp-Image-2025-08-12-at-11.00.14.jpeg
এত সদস্য, অনলাইন অফ লাইন বিকি-কিনি, ভরা exhibition ক্যালেন্ডার নিয়ে Being Gorgeous আজ এক সফল গ্রুপ, ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী? জানতে চাইলে উন্নিসা বলেন যে অনলাইন আর অফলাইন-এর একটি ব্যালান্স-এ পৌঁছনো তার প্রথম কাজ আর তার সাথে তিনি যেটা করতে চান সেটা হলো হোম আঁন্তেপ্রেনিওরদের একটি ট্রেনিং এর ব্যবস্থা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এখানকার সেলাররা business literate না হয়েই ব্যবসা শুরু করেছেন। তাই কিছুদূর চলার পর তারা বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হন আর ব্যবসায় অগ্রগতি যতটা হওয়া উচিৎ ততটা হয় না। তাই পরবর্তী পর্যায়ে ইচ্ছুক বিক্রেতাদের নিয়ে ট্রেনিং ওয়ার্কশপ সংগঠিত করতে চান তিনি। পাশাপাশি কাস্টমার সার্ভিসের দিকটাও ত্রুটিহীন করার প্রতি মনোযোগী হতে চান তারা।

বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে এসে এক অত্যাধুনিক প্ল্যাটফর্ম-এ সফল উদ্যোগ গড়ে তুলেছেন উন্নিসা কবিরাজ, পাশে পেয়েছেন মা বাবা আর নিজের একরত্তি মেয়ের সহায়তা।

শহরের বড় বড় TV চ্যানেল থেকে অন্যান্য এক্সিবিশন গ্রুপ, এখন তার গ্রুপের মহিলাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগদানের আমন্ত্রণ জানান। শহরে আয়োজিত এক বাৎসরিক পুরস্কারের মঞ্চে সফল উদ্যোগীর পুরস্কারও নিয়মিত পান তার গ্রুপ-এর ব্যবসায়ীরা।

একজন মহিলা উদ্যোক্তা হয়ে অনেক অনেক মহিলাদের জীবনকে সাফল্যের দিক নির্দেশনা দেওয়া উন্নিসা আর তার Being Gorgeous গ্রুপ আজ বাস্তবের জমিতে দাঁড়ানো এক রূপকথা।

রিপোর্টার মৈত্রী মজুমদার