কলেজ স্ট্রিট মানেই বই, কাগজের গন্ধ আর জ্ঞানের অবিরাম স্রোত।
এই বইপাড়ার মাঝেই জন্ম নিচ্ছে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রযুক্তির এক নীরব বিপ্লব।
সেখানে এমন এক প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ঘটছে, যা জ্ঞানের দরজা খুলে দিচ্ছে সেই মানুষদের জন্য, যাঁরা চোখে দেখতে পান না।
AI–চালিত স্মার্ট চশমা এখন দৃষ্টিহীনদের কাছে শুধুমাত্র একটি ডিভাইস নয়—এটি হয়ে উঠছে স্বাধীনভাবে বাঁচার নতুন হাতিয়ার।
কলেজ স্ট্রিটের আশপাশে থাকা কয়েকটি স্টার্টআপ ও রোটারি ক্লাব, ভয়েস অব স্যাপ, সাইট সেভার ইন্ডিয়া এর মত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উদ্যোগে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে এই স্মার্ট চশমার বিতরণ। এই চশমাগুলোতে বসানো রয়েছে ক্যামেরা, ভয়েস–অ্যাসিস্টেড AI সফটওয়্যার এবং রিয়েল–টাইম অবজেক্ট রিকগনিশন প্রযুক্তি। ব্যবহারকারীর সামনে কী আছে—বই, সিঁড়ি, মানুষ, গাড়ি—সবকিছু চশমাটি কানে শোনায়।
দৃষ্টিহীন ছাত্রছাত্রীদের জন্য এটি এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। আগে যেখানে কাউকে সঙ্গে নিয়ে কলেজ স্ট্রিটে আসতে হতো, এখন অনেকে একাই বই কিনতে পারছেন। এক দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থী বললেন, “এই চশমা আমাকে শুধু রাস্তা চিনিয়ে দেয় না, আত্মবিশ্বাসও দেয়।”
এই AI চশমার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর বাংলা ভাষার ব্যবহার। স্থানীয় ভাষায় নির্দেশনা পাওয়ায় ব্যবহার সহজ হচ্ছে। ‘ডানে ঘুরুন’, ‘সামনে সিঁড়ি’, ‘বাম পাশে দোকান’—এই সাধারণ কথাগুলোই একজন দৃষ্টিহীনের কাছে বিশাল নিরাপত্তা।
শুধু চলাফেরা নয়, বই পড়ার ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি কার্যকর। চশমার ক্যামেরা বইয়ের পাতা স্ক্যান করে তাৎক্ষণিকভাবে টেক্সট–টু–স্পিচের মাধ্যমে পড়ে শোনায়। ফলে কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের জগৎ দৃষ্টিহীনদের কাছেও খুলে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি অ্যাসিস্টিভ টেকনোলজির পরবর্তী ধাপ। দৃষ্টিহীনদের শুধু সাহায্য নয়, স্বনির্ভর করাই এই প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য। কলকাতার মতো শহরে যদি এই মডেল সফল হয়, তবে দেশের অন্যান্য শহরেও এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
চ্যালেঞ্জ অবশ্যই আছে—দাম, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ। তবে স্টার্টআপগুলো কম খরচের মডেল তৈরির চেষ্টা করছে। পাশাপাশি সরকারি সহায়তা এলে এটি আরও সহজলভ্য হবে।
কলেজ স্ট্রিট বহু যুগ ধরে জ্ঞানের প্রতীক। আজ সেই বইপাড়াই প্রমাণ করছে—প্রযুক্তি ঠিকভাবে ব্যবহার হলে জ্ঞান সত্যিই সবার জন্য উন্মুক্ত হতে পারে।


