সুন্দরবনের ভঙ্গুর ও বিপন্ন ম্যানগ্রোভ বন রক্ষার জন্য প্রাণপণ প্রচেষ্টা করে চলেছেন উমাশঙ্কর মণ্ডল, যিনি সারা দেশে ‘ম্যাঙ্গ্রোভ ম্যান’ নামেও জনপ্রিয়।
সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, যার ভূমিকা বিশাল গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র–মেঘনা বদ্বীপকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে অপরিসীম। সুন্দরবনে ২৬ প্রজাতির বিভিন্ন ম্যানগ্রোভ গোটা বনকে ঘিরে রেখেছে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরের উপকূলে আছড়ে পড়া ঘূর্ণিঝড়ের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক প্রাচীর হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
জীবনের শুরুতেই ম্যানগ্রোভ জঙ্গল বাঁচাতে এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন উমাশঙ্কর, কারণ তিনি জানতেন সুন্দরবনের জন্য এই ম্যানগ্রোভ কতটা অপরিহার্য এবং এগুলো রক্ষা না করলে গোটা দ্বীপাঞ্চল নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণ নিয়ে সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে তিনি UNESCO সমর্থিত উদ্যোগে অংশ নিয়ে ১০,০০০ গাছ রোপণ করেন। তিনি বলেন— “যারা সুন্দরবনকে ভালোবাসেন, তারা যেন ম্যানগ্রোভ চারা রোপণে এগিয়ে আসেন, যত বেশি তত ভালো। প্রথমে আমি দানের মাধ্যমে ৪,০০০ চারা পাই। পরে সামাজিক ভাবে আরও চারা চেয়ে অনুরোধ জানালে মানুষ এগিয়ে আসেন এবং ৬,০০০ চারা দান করেন। আমি আপ্লুত যে লক্ষ্য পূরণ করতে পেরেছি।”
উমাশঙ্কর মণ্ডল গোসাবার সাতজেলিয়া দ্বীপের চরঘেরির বাসিন্দা। আগে তিনি মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরের এক উচ্চ বিদ্যালয়ে ভূগোলের শিক্ষক ছিলেন। তাঁর স্ত্রীও শিক্ষক। যদিও চাকরির জন্য তিনি সুন্দরবন ছেড়েছিলেন, কিন্তু ভূগোলের জ্ঞান তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। তাঁর নিজের ভাষায়— “আমি জীবনের শুরুতেই বুঝেছিলাম, মানুষ বাঁচবে যদি প্রকৃতিকে বাঁচায়।” ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলার ধ্বংসযজ্ঞ তাঁকে আরও গভীরভাবে এই সত্য উপলব্ধি করায়। তিনি বলেন— “ছয়-সাত ফুট উঁচু ঢেউ নদীর বুকে আছড়ে পড়ছিল। এক বিশাল ঢেউ একটি বাড়ির ওপর আঘাত করে সেটিকে মাটি থেকে তুলে নেয়। আমি পুরো ভয়াবহ দৃশ্যের সাক্ষী। আমি বিধ্বস্ত হয়েছিলাম।” আজও এই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে উমাশঙ্করের গলায় কাঁপুনি ধরে। “সেদিন আমি অঙ্গীকার করেছিলাম, আরও বেশি করে ম্যানগ্রোভ রোপণ করব, যাতে সুন্দরবনের জন্য প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রাচীর তৈরি হয়,” বলেন এই ‘ম্যানগ্রোভ ম্যান’।

আইলার পর তিনি চরঘেরির আশেপাশে বাইন, গরান ইত্যাদি ম্যানগ্রোভ চারা রোপণ শুরু করেন। নদীতে ভেসে আসা ম্যানগ্রোভের বীজ তিনি গ্রামের মহিলাদের মাধ্যমে সংগ্রহ করতেন। তারপর সেগুলো নদীর পাড়ে পুঁতে দিতেন, যা থেকে চারা গজাত। এভাবে গত ১০ বছরে তিনি ছয় লক্ষ পঞ্চাশ হাজার ম্যানগ্রোভ চারা সংগ্রহ করেন। এরপর শুরু হয় ব্যাপক রোপণ অভিযান। তিনি গ্রামের মহিলাদের সঙ্গে নিয়ে সাতজেলিয়া দ্বীপের গরাল নদীর তীরে পরশমণিতে চারা রোপণ শুরু করেন। এখানকার মহিলারা বহুদিন ধরেই ম্যানগ্রোভ রোপণে যুক্ত। উমাশঙ্কর বিভিন্নভাবে সবাইকে ম্যানগ্রোভ রোপণে উৎসাহিত করেন।

তাঁর প্রোথিত ম্যানগ্রোভ চারাগুলি এখন অনেক বড় হয়েছে এবং ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত সামলানোর ক্ষমতা অর্জন করেছে। “কিন্তু আরও প্রয়োজন। আজকাল গ্রামবাসীরা, বিশেষত মহিলারা চারাগাছ লাগাতে এগিয়ে আসছেন। তাদের শ্রমের বিনিময়ে কেউ পাচ্ছেন শাড়ি, কেউ মশারি বা জামাকাপড়, আবার কেউ স্যানিটারি প্যাড। এগুলো সব শুভানুধ্যায়ীদের দানের মাধ্যমে দেওয়া হয়,” যোগ করেন উমাশঙ্কর।
পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন প্রধান বন সংরক্ষক ড. প্রণবেশ সান্যাল বলেন— “আমি উমাশঙ্করের ম্যানগ্রোভ রোপণ অভিযান দেখেছি। এই রোপণ কার্যক্রমে চারার টিকে থাকার হার অত্যন্ত বেশি এবং প্রজাতিগত বৈচিত্র্যও অসাধারণ।” তাঁর মতে, উমাশঙ্করের নেওয়া এই উদ্যোগ প্রশংসনীয় এবং দ্বীপের অন্যান্য অংশেও সহজেই এই মডেল কার্যকর করা সম্ভব। এই প্রচেষ্টায় যারা তাঁকে সহায়তা করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেও ভোলেননি উমাশঙ্কর।

শম্ভুনাথ কলেজ, লাভপুরের ভূগোলের সহকারী অধ্যাপক ড. জয়ন্ত গৌর বলেন— “আমি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে উমাশঙ্কর মণ্ডলের সঙ্গে কাজ করছি। এত নিবেদিতপ্রাণ ও পরিশ্রমী প্রকৃতিপ্রেমী আর দেখিনি, যিনি সুন্দরবনের মানুষের সংকটকালে নিরলসভাবে পাশে থেকেছেন। আমি বিশ্বাস করি সুন্দরবন রক্ষায় তাঁর এই মহৎ অবদান দ্বীপাঞ্চলের ইতিহাসে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে মূল্যায়িত হবে।”
যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয় সুন্দরবনের ‘ম্যানগ্রোভ ম্যান’ বলা হলে তিনি কেমন অনুভব করেন, উমাশঙ্কর বিনীত কণ্ঠে বলেন— “আমি এটিকে আমার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে দেখি। যেমন স্বেচ্ছাসেবকদের বুকে ব্যাজ থাকে, এটিও তেমন। এতে কাজ করতে সুবিধা হয় আর ভালোলাগাও তৈরি হয়।”


