চলছে বিয়ের মরশুম, আর ভারতীয় সমাজে বিয়ের অনুষ্ঠান এক বড়সড় কর্মযজ্ঞ। এই কাজে যেরকম অনেক পরিশ্রম থাকে সাথে থাকে অনেকটা অযথা অর্থব্যয় এবং অপচয়ের আশঙ্কা।
বড় বিয়ে মানেই যেন বড় বর্জ্য—প্লাস্টিক প্লেটের স্তূপ, ফেলে দেওয়া খাবার এবং সাজসজ্জার পাহাড় যা শেষে আবর্জনার ডিব্বাতেই যায়। অথচ কয়েকটি সহজ পরিবর্তনই আপনার জীবনের অন্যতম বড় দিনটিকে করে তুলতে পারে ভালোবাসা ও পরিবেশসচেতনতার উৎসব।
তাই যুগের সাথেসাথে মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ছে আর আর আজকের প্রজন্ম সবদিক থেকেই অপচয় কমানোর চেষ্টায় আছেন।

কীভাবে এই প্রজন্মের ভারতীয় দম্পতিরা মাত্র ৬ ধাপে আয়োজন করছেন মনোরম ‘জিরো-ওয়েস্ট’ বিয়ে?
কম্পোস্ট করা ফুল থেকে সিড-পেপারে লেখা নিমন্ত্রণ পত্র— এই সবের মাধ্যমে জীবন বান্ধব নির্বাচন ও পরিবেশবান্ধব থাকাকে একসঙ্গে বুনছেন নতুন প্রজন্মের এই নবদম্পতিরা।
চলুন দেখে নেওয়া যাক ‘জিরো-ওয়েস্ট’ বিয়ের উপায়গুলি।
১. পরিবেশবান্ধব ভেন্যু নির্বাচন করুন
এমন একটি স্থান বেছে নিন যেখানে স্বাভাবিকভাবেই বর্জ্য কম উৎপন্ন হবে—খোলা বাগান, পারিবারিক ফার্মহাউস বা কমিউনিটি হল। খোলা জায়গার প্রাকৃতিক আলো বিদ্যুৎ খরচ কমায়, আর স্থানীয় ভেন্যু হলে যাতায়াতজনিত কার্বন নির্গমনও কমে।
২. প্লাস্টিক-মুক্ত আয়োজন
স্ট্র, বোতল থেকে কাঁটা-চামচ—যতটা সম্ভব একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিককে না বলুন। পরিবর্তে ব্যবহার করুন স্টিল বা বাঁশের বিকল্প, কিংবা স্থানীয় ক্যাটারারদের থেকে ভাড়ায় নিন পুনর্ব্যবহারযোগ্য বাসন। অনুষ্ঠানে বর্জ্য আলাদা করার জন্য লেবেলযুক্ত ডাস্টবিন রাখুন।
চেন্নাইয়ের ব্লগার উমা রাম তাঁর বিবাহ-আয়োজনে পরিবেশন চামচ থেকে শুরু করে ডেকর-প্যাকেজিং—প্রতিটি জিনিসই পুনর্ব্যবহার বা কম্পোস্টের উপযোগী করেছিলেন।
ফুল, বাকি থাকা ফল ও অন্যান্য জৈব বর্জ্য বিয়ের পর রূপান্তরিত হয়েছিল পুষ্টিকর সার হিসেবে। অতিথিদের খাওয়ানোর পাশাপাশি মাটিকেও পুষ্ট করা যায় সেই বার্তা পৌঁছেছিল পরিবেশে।

৩. মিনিমাল ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য সাজসজ্জা
থার্মোকল বা গ্লিটার এড়িয়ে চলুন। বদলে ব্যবহার করুন কাপড়ের ঝালর, টবে থাকা গাছ, বা আপসাইকেল করা উপকরণ। বন্ধুদের যুক্ত করে বানিয়ে তুলুন সৃজনশীল, মজার এক ডেকর।
মহারাষ্ট্রের দম্পতি প্রাশিন জাগার ও দীপা কামাথ ঠিক এমনটাই করেছিলেন। পুরনো কার্ডবোর্ড বাক্স ব্যবহার করে তারা বানিয়েছিলেন অথিতিদের স্বাগত জানানোর প্লাকার্ড, আর বন্ধুদের হাতে তৈরি পোস্টার জানিয়েছিল ‘লো-ওয়েস্ট’ বার্তা।
“আমাদের নাম লেখা মূল স্বাগত-বোর্ডটি বানানো হয়েছিল এক বন্ধুর এলইডি টিভির কার্ডবোর্ড বাক্স দিয়ে। কিছু পেন আর রঙেই ওটা দুর্দান্ত হয়ে উঠেছিল,” বললেন দীপা। সংবাদপত্র, পুরনো কাঁচের বোতল এবং রঙিন কাপড় ব্যবহার করেও সাজাতে পারেন। শুধু নিশ্চিত করুন—প্লাস্টিক কম এবং ফুল স্থানীয় ও মরশুমি।
৪. স্থানীয় ও সচেতনভাবে পরিবেশিত খাবার
এমন ক্যাটারার বেছে নিন যারা স্থানীয়, মরশুমি উপাদান ব্যবহার করেন। অপচয় কমাতে বুফে এড়িয়ে প্লেটেড মিল বা ছোট ব্যাচে পরিবেশন করুন।
উমা নিশ্চিত করেছিলেন—অতিরিক্ত খাবার যেন ডাস্টবিনে না যায়। ক্যাটাগরি অনুযায়ী সেগুলো হয় সরাসরি কম্পোস্ট পিটে পাঠানো হয়েছিল, নয়তো দান করা হয়েছিল আশেপাশের শেল্টারে। স্বেচ্ছাসেবকদের একটি দল প্রতিটি ধাপেই নিশ্চিত করেছিল দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা।
৫.টেকসই পোশাক নির্বাচন
জৈব কাপড়ের তৈরি পোশাক বেছে নিন বা এমন ডিজাইনারকে বাছাই করুন যারা প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করেন। ভাড়া করা, পুনরায় পরা, অথবা পারিবারিক উত্তরাধিকার হিসেবে থাকা কোনও পোশাক আপসাইকেল করাও অর্থবহ ও পরিবেশবান্ধব।
এখন বহু দম্পতি হাতের তাঁতের শাড়ি, অর্গানিক কটন বা টেকসই ব্র্যান্ডের পোশাকেরঞদিকেই ঝুঁকছেন—দেখিয়ে দিচ্ছেন স্টাইল ও স্থায়িত্ব একসঙ্গেই সম্ভব।
চেন্নাইয়ের ভীনা বালাকৃষ্ণন তাঁর বিয়েতে পরেছিলেন তাঁর দিদার প্রায় ৫০ বছর আগের বিয়ের -শাড়ি। সঙ্গে ছিল পারিবারিক অলঙ্কার—নতুন কিছু কেনার প্রয়োজনও পড়েনি।
৬. পরিবেশবান্ধব উপহার ও নিমন্ত্রণপত্র
কাগজের নিমন্ত্রণপত্র ছেড়ে দিন। ডিজিটাল ইনভাইট কিংবা পুনর্ব্যবহারযোগ্য বা সিড-পেপার নিমন্ত্রণপত্র বেছে নিন—যা পরে রোপণও করা যায়।
উমার অতিথিরা পেয়েছিলেন সুন্দর সিড-পেপার ইনভাইট—যা বিয়ের পরও তাঁদের স্মৃতিতে নবদম্পতির প্রতি এক উষ্ণ বার্তা রেখে গেছে। তিনি নিজেই সিনেমা-তারকাদের অনুপ্রাণিত করে মজাদার পোস্টারও বানিয়েছিলেন, যাতে ‘লো-ওয়েস্ট ইভেন্ট’-এর ধারণা ছড়ায়।
একটা পারিবারিক উৎসব এমন হয়ে উঠুক যা প্রতিদানে ফিরিয়ে দেয় অনেকটাই। উমার কথায়, “সম্পূর্ণ জিরো-ওয়েস্ট বিয়ে করা সম্ভব ছিল না—কিন্তু পরিবর্তন আনা সম্ভব ছিল।” জিরো-ওয়েস্ট বিয়ে মানে খরচ কমানো নয়; সচেতনভাবে উদ্যাপন করা। ফুল কম্পোস্ট করা থেকে কার্ডবোর্ড পুনর্ব্যবহার—প্রতিটি ছোট পদক্ষেপই গুরুত্বপূর্ণ। ভালোবাসা ও স্থায়িত্ব যখন একসাথে আসে, তখন আপনার বিশেষ দিন শুধু স্মরণীয় নয়—গভীরভাবে অর্থবহ হয়ে ওঠে।


