Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

প্রকৃতির কোলে এক অনন্য বিদ্যালয় — শোলাই স্কুল হতে পারে পরিবেশবান্ধব শিক্ষার দৃষ্টান্ত

দক্ষিণ ভারতের কোডাইকানালের পালনি পাহাড়ের নির্জন প্রকৃতির মাঝে এক অনন্য বিদ্যালয়— শোলাই স্কুল।
শোলাই স্কুলটি ১৯৮৯ সালে ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ব্রায়ান জেনকিন্স কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

“শোলাই” নামের তামিল অর্থ “ট্রপিকাল রেইন ফরেস্ট”। এই শব্দটির অন্তর্নিহিত অর্থ আর এর সৌন্দর্য এবং স্বাভাবিক মিলের জন্যে এই নামকরণ করেছিলেন জেনকিন্স।

সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সামাজিক নৃবিজ্ঞানী, ব্রায়ান জেনকিন্স (‘বিজে’) যুক্তরাজ্যের ব্রকউড পার্কের জে. কৃষ্ণমূর্তি শিক্ষা কেন্দ্রে ১৪ বছর ধরে শিক্ষকতা করেছেন, বোধগয়ার মঠে মেডিটেশন করেছেন, ভারতের মাটিতে ৭০০০ কিমি ভ্রমণের পরে এই পছন্দের স্হান নির্বাচন করে মাত্র দুটি কাঁচা ঘর থেকে স্কুলটি শুরু করেছিলেন।


প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের মাধ্যমে শিক্ষার দর্শনে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানটি আজ দেশের অন্যতম ও অনন্য শিক্ষাকেন্দ্র। এটি Centre for Learning, Organic Agriculture and Appropriate Technology (CLOAAT) নামেও পরিচিত। জে. কৃষ্ণমূর্তির শিক্ষাদর্শে অনুপ্রাণিত শোলাই স্কুলের মূল উদ্দেশ্য— শিশুদের এমন এক শিক্ষাজগতে প্রবেশ করানো, যেখানে আনন্দ, সচেতনতা ও পরিবেশবান্ধব জীবন একসূত্রে গাঁথা আছে।

৭০ একরের এক পাহাড়, নদী, ঝর্ণা ঘেরা স্বনির্ভর তপোভূমির মত পরিবেশের মধ্যে ৩৫ একর বিস্তৃত শোলাই স্কুল ক্যাম্পাসটি যেন প্রকৃতির কোলে এক জীবন্ত পাঠশালা। পাহাড়, সবুজ বনভূমি ও বয়ে চলা নদীর মধ্যে থাকা এই বিদ্যালয়টি নিজেই এক পরিবেশ-বান্ধব পৃথিবীর প্রতিচ্ছবি। এখানকার শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবই নয়, প্রকৃতি থেকেই প্রতিদিন নতুন পাঠ শেখে।

জে. কৃষ্ণমূর্তির ভাবধারায় প্রভাবিত এই বিদ্যালয়ে শেখার প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতানির্ভর। পরীক্ষার চাপ বা প্রতিযোগিতার পরিবর্তে এখানে জোর দেওয়া হয় শিশুর মানসিক বিকাশ, আত্ম-অনুসন্ধান ও সৃজনশীল চিন্তাশক্তির বিকাশে। শিক্ষার লক্ষ্য এখানে কেবল জ্ঞান অর্জন নয়, বরং মানুষ হয়ে ওঠা।
শোলাই স্কুলে প্রচলিত বিষয়গুলির(ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান) পাশাপাশি পড়ানো হয় হিন্দি, তামিল, পরিবেশ শিক্ষা ও উন্নয়ন অধ্যয়ন। শিক্ষার্থীরা মাঠে, বাগানে ও কর্মশালায় হাতে-কলমে শেখে— কীভাবে বাস্তব জীবন ও
শিক্ষার মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করা যায়।এই বিদ্যালয় নিজেই এক পরিবেশ-বান্ধব জীবনের মডেল।সৌরশক্তি, মাইক্রো-হাইড্রো শক্তি ও বায়োগ্যাস ব্যবস্থার সাহায্যে পুরো ক্যাম্পাস পরিচালিত হয়।
বিদ্যালয়ের খাদ্যও আসে নিজস্ব জৈব খামার থেকে। শিক্ষার্থীরা নিজের হাতে কাজ করে শেখে— প্রাকৃতিক সম্পদ কীভাবে রক্ষা করতে হয় এবং দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে হয়।

রান্না, বাগান পরিচর্যা, নির্মাণ ও মেরামতের কাজ— সবকিছুতেই অংশ নেয় ছাত্রছাত্রীরা।

এতে তারা আত্মনির্ভরতা, দায়িত্ববোধ ও সহযোগিতার মনোভাব অর্জন করে। বিদ্যালয়ের প্রতিটি কাজই এখানে শিক্ষার অংশ, যা তাদের ভবিষ্যত ও বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করে গড়ে তোলে।

শোলাই স্কুলে ভর্তি প্রক্রিয়া প্রচলিত পরীক্ষাভিত্তিক নয়। বিদ্যালয় বিশ্বাস করে প্রতিটি শিশুর আলাদা চাহিদা ও সামর্থ্য রয়েছে। তাই অভিভাবকদের সন্তানের শক্তি, দুর্বলতা ও মানসিক অবস্থা নিয়ে খোলামেলা আলোচনার আহ্বান জানানো হয়। বিদ্যালয় সেই অনুযায়ী শিক্ষার্থীকে সহায়তা করে তার নিজের গতিতে বিকশিত হতে।

ভর্তির আগে শিক্ষার্থীরা ও তাদের অভিভাবকরা এখানে এসে থেকে, সব বুঝেশুনে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
শোলাই স্কুল কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়— এটি এক দর্শন, এক জীবনধারা। এখানে শেখানো হয়, এক ভবিষ্যতমুখী পরিবেশবান্ধব জীবন মানে শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়, বরং প্রত্যেকেটি স্বতন্ত্র মানুষের নিজের ভিতর ও বাইরের ভারসাম্য রক্ষা করা।
প্রকৃতির সঙ্গে সুর মিলিয়ে শোলাই স্কুল আজ এক নীরব বার্তা দিচ্ছে— ভবিষ্যতের শিক্ষার মানে এক সাসটেনেবল জীবনের।