মহাপ্রভুর রথের চাকা থামালেন ইঞ্জিনিয়ার
হিন্দু ও বৈষ্ণব ধর্মের অতি উল্লেখযোগ্য উৎসব এই রথ যাত্রা।
প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্ল পক্ষের দ্বিতীয়ায় পুরীর জগন্নাথ ধাম উপচে পড়ে লাখ লাখ ভক্তের ভীড়ে।
১৪ দিন ধরে চলে এই উৎসব, তাই এর প্রস্তুতি শুরু হয় আরও আগে থেকে, রথ নির্মাণ মন্দিরের সাজসজ্জা, মুর্তি সাজানো, প্রভুর মহা প্রসাদ তৈরীর শোরগোল এর মাঝে বেশীরভাগ মানুষেরই অজানা যে এই বৃহৎ আধ্যাত্মিক কর্মকান্ডের একটা দিক অনেকদিন পর্যন্ত খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।
এই বৃহদাকায় গতিশীল রাজসিক রথ তিনটি, যাদের একেকটির ওজন প্রায় ৪০ টনের উপর, তা থামানোর কোনও প্রযুক্তি জানা ছিল না কর্তৃপক্ষের। একবার গতি পেলে থাকতো না এই রথ। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়েও প্রচুর মানুষের একত্রিত প্রচেষ্টাতেও আট থেকে দশ ফুট না এগিয়ে থামতো না রথ। বছর বছর তাই কিছু মানুষের পা থেঁতলানো, হাত ভাঙা এমনকি প্রাণহানির ঝুঁকি রথযাত্রার আনন্দকে ম্লান করে দিত।
অশ্বিনীকুমার মিশ্র নামের এক অবসরপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার বছরের পর বছর এই ঘটনা দেখে নিজেই এর প্রতিকারের চেষ্টা শুরু করেন।
কোনও রকম শোরগোল ছাড়া, অর্থানুকুল্য ছাড়া এমনকি কোনও রকম আনুষ্ঠানিক অর্ডার ছাড়াই আলোকবৃত্ত থেকে দুরে বসে হাতের কাছে যা উপকরণ ছিল তাই দিয়ে একটি ব্রেক সিস্টেম তৈরির কাজে লেগে পড়লেন তিনি।
অবশেষে অনেক পরীক্ষানিরীক্ষার পর শাল কাঠ, রাবার আর চেন পুলির সাহায্যে এমন এক প্রযুক্তির উদ্ভাবন করলেন যা প্রয়োজন বুঝে রথের চাকাকে থামিয়ে দিতে সক্ষম হবে।
সেই দিন থেকে আজ অবধি প্রতি বছর অশ্বিনীকুমার আর তার টিম রথের চাকায় ব্রেক সিস্টেম লাগাতে পুরী আসেন। তিনটি ৪০ টনের অধিক ভারী রথ প্রতিবছর নতুন করে তৈরী হয় আর প্রতিবছর অশ্বিনীর দলবল, কোনও শোরগোল ছাড়া, সঠিক ভাবে ব্রেক সিস্টেম ইন্সটল করেন প্রিসিসনের সাথে। আর এই পুরো কাজটাই ওনারা করেন বিনামূল্যে।
“এই সবার সুরক্ষার কাজ করা একটা সেবা, আর এটাই আমার কাছে ভক্তি” বলেন অশ্বিনী।
কোনও পুরষ্কার, কাজের স্বীকৃতির কথা শোনা যায় না তাঁর মুখে, তাঁকে নিয়ে লেখা কোনও খবরের কাগজের ক্লিপিং নেই ওঁর ঘরে। দরকারে রথের চাকা সময়মত থামানো যাবে, এটুকু নিশ্চিত করাই ওঁর শান্তির জন্য যথেষ্ট।
আজকের ইঁদুর দৌড়ের যুগে সবাই যখন নতুন আর চকচকে বিষয়গুলোর দিকে নিত্য ধাবমান, সেই সময় দাঁড়িয়ে অশ্বিনী কুমার মিশ্র রা মনে করিয়ে দেন জীবনকে প্রভাবিত করার জন্য প্রয়োজনীয় কাজ গুলো অনেক সময় নিরীহ নম্র পদচারনায় যত্নশীল হাত আর মননশীল হৃদয় বেয়ে উপস্থিত হয়।


