ভাগলপুর জেলার নওগাছিয়ার কলাবাগানে সুবাসিত মাটির গন্ধে জন্ম এক তরুণ উদ্ভাবকের— গোপাল জি।
স্নেহভরে সবাই তাঁকে ডাকে “Banana Boy” নামে।
২০০০ সালের ২৪ এপ্রিল এক সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া গোপালের জীবনযাত্রা আজ ভারতীয় উদ্ভাবনের এক উজ্জ্বল প্রতীক। নওগাছিয়ার বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের কৃষিক্ষেত থেকে বিশ্বমঞ্চে তাঁর পৌঁছে যাওয়া এক অনুপ্রেরণাদায়ক কাহিনি।
শৈশবেই গোপাল দেখেছিলেন প্রকৃতির রুদ্ররূপ। ২০০৮ সালের ভয়াবহ বর্ষায় তাঁর পিতার কলা চাষ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। এই ধ্বংস লীলাই গোপালের মনে জন্ম দেয় এক সংকল্পের— কলার বর্জ্যকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশবান্ধব শক্তি উৎপাদনের উপায় খুঁজে বের করা। সেই স্বপ্নই তাঁকে করে তোলে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি গবেষণার এক পথিকৃৎ।

অর্থকষ্ট ও প্রাইভেট স্কুলগুলির প্রত্যাখ্যান গোপালকে প্রথাগত শিক্ষার পথে চলতে দেয় নি, কিন্তু দমিয়ে রাখতে পারেনি তার অনুসন্ধিৎসা।
গ্রামেরই শিক্ষক চন্দন কুমার ঠাকুরের প্রচেষ্টায় তিনি গৃহশিক্ষা গ্রহণ করেন। বাবা প্রেম রঞ্জন কুমার ও মা ঊষা দেবীর অনুপ্রেরণায় ঘরোয়া পরিবেশেই তৈরি হয়েছিল এক সৃজনশীল শিক্ষার পরিমণ্ডল, যা গোপালের কৌতূহল ও উদ্ভাবনী শক্তিকে আরও উজ্জীবিত করে।
মাত্র ১৭ বছর বয়সেই গোপাল সম্পন্ন করেন দশটি উদ্ভাবন, যার মধ্যে দু’টি ছিল প্রোভিশনাল পেটেন্টের অধীনে। তাঁর অনন্য সৃষ্টি “Banana Bio Cell” আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করে— প্রমাণ করে দেয়, কৃষিজ বর্জ্য থেকেই সুস্থায়ী শক্তি উৎপাদন সম্ভব।
নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় শার্টে পড়া কলার রসের দাগ গোপালের মনে জাগায় প্রশ্ন— “এ রস কি বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগানো যায়?” কলার রসের অম্লত্ব বুঝে তিনি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেন। দুটি ইলেকট্রোড— একটিতে জিঙ্ক ও অন্যটিতে তামা— কলার কাণ্ডে সংযুক্ত করে তিনি উৎপন্ন করেন ৩ ভোল্ট বিদ্যুৎ, যা একটি LED বাতি তিন ঘণ্টা জ্বালিয়ে রাখতে সক্ষম। বিদ্যুৎবিহীন রাতের অন্ধকারে সেই বাতিই শুধু তাঁর ঘর নয়, তাঁর উদ্ভাবনের স্বপ্নও আলোকিত করেছিল।

স্কুলের প্রধান শিক্ষক তাঁর প্রকল্পটি পাঠান বিহার রাজ্যের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগে (DST)। ৫,০০০ টাকার অনুদানে তৈরি হয় একটি কার্যকর মডেল, যা Inspire Award প্রদর্শনীতে জেলা, রাজ্য ও জাতীয় পর্যায়ে প্রথম স্থান অর্জন করে।
তাঁর নিষ্ঠা ও প্রতিভা নজর কাড়ে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার ও মুখ্যসচিব অঞ্জনি কুমার সিংহের। তাঁরা গোপালকে ভাগলপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে গবেষণাগার স্থাপনের সুযোগ দেন। কিন্তু গোপালের স্বপ্ন ছিল আরও বিস্তৃত— তাই তিনি পৌঁছান ভারতের প্রধানমন্ত্রী দপ্তরে।
২০১৭ সালের আগস্টে গোপাল সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে। তিনি উপস্থাপন করেন নিজের উদ্ভাবন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। মাত্র দশ দিন পরেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগ থেকে আসে চিঠি— আহমেদাবাদের ন্যাশনাল ইনোভেশন ফাউন্ডেশন-এ উন্নত গবেষণাগারে কাজের প্রস্তাব। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি তা গ্রহণ করতে না পারলেও পরবর্তীতে যোগ দেন গ্রাফিক এরা ইউনিভার্সিটি রিসার্চ সেন্টারে, নতুন প্রকল্প নিয়ে গবেষণা করতে।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় তাঁর গবেষণাগার বন্ধ হয়ে যায়। তবুও গোপাল থামেননি। নবীকরণযোগ্য শক্তি বিষয়ক গবেষণায় নভনীত ইন্ডাস্ট্রিজ-এ গবেষণা পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তাঁর কাজ আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত হয়, এবং পরবর্তীতে NASA, JAIN Irrigation, iSmart, IBM, Stanford, ও Oxford-এর মতো প্রখ্যাত সংস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণার প্রস্তাব আসে— যা তাঁর উদ্ভাবনের বিশ্বব্যাপী প্রভাবের সাক্ষ্য বহন করে।
গোপাল জির জীবনগাথা এক জীবন্ত উদাহরণ যে, অধ্যবসায়, উদ্ভাবনী মনোভাব ও জ্ঞানের তৃষ্ণা এক সাধারণ তরুণকেও বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিতে পারে। নওগাছিয়ার বন্যাপ্রবণ মাঠ থেকে আন্তর্জাতিক সম্মান অর্জন— তাঁর এই যাত্রা আজ লক্ষ তরুণের জন্য প্রেরণার উৎস।
গোপাল তাঁর উদ্ভাবনের আলোয় শুধু নিজের ঘর নয়, আলোকিত করছেন সাসটেনেবল ও সবুজ ভারতের ভবিষ্যৎ পথ।
একটি কলা, এক ফোঁটা রস, আর এক দৃঢ় মন— সেখান থেকেই জ্বলে উঠেছে সবুজ ভবিষ্যতের আলোকশিখা।


