Monday, June 29, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

কলকাতার দুই ভাই তৈরি করলেন মেরিন রোবোটিক্স সংস্থা — সমুদ্রের গভীরে এক অনন্য যাত্রা

মানবসভ্যতার শুরু থেকেই সমুদ্র ও নদী ছিল যাতায়াত এবং জীবনযাত্রার অন্যতম ভিত্তি। একসময় মানুষ ভেলায় চেপে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছেছিল। তখন মহাদেশগুলির দূরত্বও ছিল অনেক কম। আজ অবশ্য হুগলি নদী পার হতে ভেলা তৈরির প্রয়োজন নেই, কিন্তু বিশাল জলরাশির নিচে কোনও বস্তু খুঁজে বের করতে আধুনিক মেরিন প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

এই প্রয়োজনীয়তাকে সামনে রেখেই কলকাতার দুই ভাই — স্বর্ণাভ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ঋষভ বন্দ্যোপাধ্যায় — গড়ে তুলেছেন মেরিন রোবোটিক্স নির্মাতা সংস্থা ‘বানার্জি’(Banergy)।

সংস্থার নামকরণের গল্প বলতে গিয়ে স্বর্ণাভ জানান, “আমার ঠাকুরদা প্রায়ই বলতেন, ‘স্বর্ণাভ ব্যানার্জি — ফুল অফ এনার্জি’। সেই কথার থেকেই আমার ছোট ভাই ঋষভ, ‘Banerjee’ আর ‘Energy’ মিলিয়ে ‘Banergy’ নামটি তৈরি করে।”
দুই ভাইয়ের দাবি, বাংলার মধ্যে এই ধরনের মেরিন রোবোটিক্স নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান আর নেই। বাঁকুড়া এবং বালাসোরে তাদের কারখানায় তৈরি হয় বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক রোবট।

স্বর্ণাভ বলেন, “আমরা চাই বাংলায় মেরিন রোবোটিক্সের একটি শক্তিশালী ইকোসিস্টেম তৈরি হোক। তাই অন্য উৎসাহীদেরও আমাদের ব্লুপ্রিন্ট ব্যবহার করতে উৎসাহ দিই। কেউ যদি আমাদের যন্ত্রের হুবহু প্রতিলিপিও তৈরি করে, তাতেও আমাদের কোনও আপত্তি নেই।”
Banergy তৈরি করে রিমোটলি অপারেটেড ভেহিকলস(ROV) এবং আনম্যানড সারফেস ভেসেলস(USV)। এগুলি এমন ধরনের সামুদ্রিক রোবট, যা নদী ও সমুদ্রে নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত হয়।

দুই ভাই-ই উচ্চশিক্ষা এবং ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজের জন্য আমেরিকায় ছিলেন। বড় ভাই স্বর্ণাভ ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ছোট ভাই ঋষভ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেন। তবে বিদেশে স্থায়ী হওয়ার ইচ্ছা কখনওই ছিল না তাদের।

স্বর্ণাভ বলেন, “আমাদের সবসময়ই পরিকল্পনা ছিল দেশে ফিরে আসার। আমি ওর থেকে ১০ বছরের বড়। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় বুঝেছিলাম, ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল টিমওয়ার্ক খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই ঋষভকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে উৎসাহ দিয়েছিলাম।”

শুধু নির্মাতা নন, নিজেরাও প্রশিক্ষিত ডুবুরি

Banergy-র মার্কেটিং প্রধান রাহুল পারেখকে সঙ্গে নিয়ে তিনজনই দক্ষ ডুবুরি। ফলে তাঁরা শুধু প্রযুক্তি নির্মাতা নন, জলের তলায় বাস্তব সমস্যাগুলিও খুব কাছ থেকে বোঝেন। স্বর্ণাভর কথায়, “আমরা আমাদের পণ্য এবং তার কাজের পরিবেশের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। বাস্তব সমস্যাগুলো বন্ধ ঘরে বসে বোঝা যায় না, তার জন্য ডুবুরিদের প্রয়োজন।”

ভারতীয় রেল থেকে কলকাতা পুলিশ — সবার আস্থা Banergy-র প্রযুক্তিতে

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ওশেনোগ্রাফি, ভারতীয় রেল, ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্স (NDRF) এবং কলকাতা পুলিশ ইতিমধ্যেই Banergy-র সাব-মেরিন রোবোটিক্স প্রযুক্তিতে মুগ্ধ। তাদের তৈরি BROV X(Banergy Underwater Remotely Operated Vehicle) এবং BUSV X(Banergy Unmanned Surface Vessel) উদ্ধারকাজ, নদীর তলদেশের ম্যাপিং, নদীর উপর সেতুর ক্ষতিগ্রস্ত অংশ শনাক্তকরণ-সহ নানা কাজে ব্যবহৃত হয়।

একটি উল্লেখযোগ্য অভিযানের কথা বলতে গিয়ে দুই ভাই জানান, একটি পরিবেশ সংস্থা হুগলি নদীতে প্রায় ৪০ লক্ষ টাকার যন্ত্রপাতি হারিয়ে ফেলেছিল। সংস্থার কর্তারা ভেবেছিলেন সেই উদ্ধার অভিযানে ৭২ ঘণ্টা লাগবে।স্বর্ণাভ বলেন, “আমাদের রোবটের প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা মাত্র পাঁচ ঘণ্টার মধ্যেই যন্ত্রপাতির অবস্থান খুঁজে পাই।”
Banergy-র বোট এবং মেরিন ড্রোনে ব্যবহৃত হয় ওয়ান-ডাইমেনশনাল সোনার প্রযুক্তি, যা মূলত আল্ট্রাসোনোগ্রাফির মতো ছবি তৈরি করে। এরপর সেই ছবিতে নদীর তলদেশের অস্বাভাবিক অংশগুলি বিশ্লেষণ করে বস্তুটির অবস্থান নির্ধারণ করা হয়।

তারপর ডুবুরিরা নির্ভুল জায়গায় নেমে সেই বস্তু উদ্ধার করতে পারেন। Banergy-র মেরিন রোবটগুলিতে রয়েছে মেকানিক্যাল আর্মও, যা বিভিন্ন ওজনের বস্তু তুলতে সক্ষম।

সমুদ্র বা নদীর নিচে সবচেয়ে আশ্চর্য কী পেয়েছেন — এই প্রশ্নের উত্তরে স্বর্ণাভ বলেন, “রোবট নিয়ে ডুব দেওয়ার সময় কখনও জানতে পারি না জলের নীচে কী অপেক্ষা করছে। হাওয়াইয়ে ডুব দেওয়ার সময় মাছ, কচ্ছপ আর প্রবাল প্রাচীর ছিল আমার কাছে ধনসম্পদের মতো। আর গঙ্গায় রোবট নামালে ডুবে যাওয়া নৌকা থেকে মূর্তি — নানা জিনিস পাওয়া যায়। সুযোগ পেলে আমি কৃষ্ণনগর থেকে ডায়মন্ড হারবার পর্যন্ত পুরো গঙ্গাপথ স্ক্যান করতে চাই, জানতে চাই নদী তার বুকে কত রহস্য লুকিয়ে রেখেছে।” ঋষভের অভিজ্ঞতাও কম রোমাঞ্চকর নয়।
তিনি বলেন, “আমি যখন লস অ্যাঞ্জেলেসে ছিলাম, তখন স্পেসএক্সের মিশনগুলো দেখতাম। সংস্থার একটি নীতি ছিল — সমুদ্রে পড়ে যাওয়া রকেটের যন্ত্রাংশ কেউ উদ্ধার করতে পারলে তারা ৮,০০০ ডলার দিত। তাই আমি আর আমার দুই বন্ধু আন্দাজ করার চেষ্টা করতাম রকেটের অংশ কোথায় পড়েছে। বন্ধুদের সঙ্গে নৌকাভ্রমণ তখন একপ্রকার ট্রেজার হান্টে পরিণত হয়েছিল।”

শুধু রোবট নয়, Banergy তৈরি করেছে SHARK DPV নামে একটি ডাইভার প্রোপালশন ভেহিকলও, যা মূলত জলের তলায় চলা স্কুটারের মতো। পেশাদার ডুবুরি থেকে শুরু করে সাধারণ সাঁতারুরাও এটি ব্যবহার করতে পারেন। জলের তলার রোবট থেকে আন্ডারওয়াটার স্কুটার — সমুদ্র প্রযুক্তির নানান উদ্ভাবনে এগিয়ে ‘বানার্জি’।