Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

কলকাতার ইঞ্জিনিয়ারের বাঁশ বিপ্লব: প্লাস্টিকের বিকল্পে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ, আয় কোটির ঘরে

উদ্ভাবনের বীজ যে কবে, কোথা থেকে জন্ম নেয়, বলা কঠিন। এর সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ কলকাতার তরুণ ইঞ্জিনিয়ার অগ্নি মিত্র।

মেডিক্যাল ফোটোনিক্সে মাস্টার্স করতে জার্মানিতে গিয়ে পড়াশোনার ফাঁকে অগ্নির মাথায় আসে এক নতুন ভাবনা। সেই ভাবনাই আজ তাঁর গড়ে তোলা সংস্থা Amwoodo Eco Products Pvt. Ltd.-এর ভিত্তি। লক্ষ্য একটাই—দেশকে প্লাস্টিক বর্জ্যের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করা।

২০২২ সালে দেশবাসীকে স্তম্ভিত করেছিল প্লাস্টিক বর্জ্যের সরকারি পরিসংখ্যান। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী অশ্বিনী কুমার চৌবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের রিপোর্টে জানানো হয়—২০১৯-২০ সালে ভারতে এক বছরে প্রায় ৩৪.৭ লক্ষ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়েছে। অন্যদিকে ন্যাশনাল সেন্টার ফর কোস্টাল রিসার্চের এক সমীক্ষায় উঠে আসে, দেশের সমুদ্রসৈকত থেকে সংগ্রহ করা ময়লার মধ্যে ৪০ থেকে ৯৬ শতাংশই প্লাস্টিক।

অগ্নির কাছে বিষয়টি নতুন ছিল না। তবে ইউরোপে গিয়ে তিনি দেখেছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। ২০১৭ সালে জার্মানিতে মাস্টার্স করতে গিয়ে অগ্নির চোখ খুলে যায়। “সেখানে মানুষ পরিবেশবান্ধব জীবন যাপনের প্রকৃত অর্থ বোঝে এবং প্রতিদিনের জীবনে সেটি মেনে চলে। বাঁশের টুথব্রাশ থেকে রেজর—সবকিছুতেই তারা সচেতন,” বলেন তিনি।

সুইডেনে এক বন্ধুর কাছে বেড়াতে গিয়ে তিনি আরও বিস্মিত হন। তাঁর কথায় “একটি ফার্মেসি ক্লিনিকে দেখলাম, সারাদিনের ব্যবহার্য সব পণ্যই প্লাস্টিকবিহীন সংস্করণে পাওয়া যায়। ইউরোপে থাকাকালীন বুঝলাম, ওরা এত কম প্লাস্টিক ব্যবহার করে যে বহু বছরের বর্জ্য মিলে হয়তো একটি ছোট বাক্সই ভর্তি হবে।”
পিএইচডি শুরু করার আগে, ২০১৯ এ স্বল্প ছুটিতে ভারতে এসেছিলেন অগ্নি। হঠাৎ পশ্চিম বিশ্বে লকডাউন শুরু হয়। “ফিরে যেতে পারিনি। বুঝলাম কয়েক মাস এভাবেই কাটাতে হবে। তখন ভাবলাম—যা শিখেছি, সেটা কাজে লাগিয়ে দেশে কিছু করা যাক,” জানান তিনি।

গবেষণা করতে গিয়ে তিনি বুঝলেন, ভারতের পরিবেশবান্ধব জিনিসের বাজার মূলত আমদানি-নির্ভর। ‘দেশীয়’ নামে বিক্রি হলেও অধিকাংশ পণ্য আসছে চিনসহ বিদেশ থেকে। দামও এত বেশি যে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। উদাহরণস্বরূপ, একটি বাঁশের টুথব্রাশের দাম প্রায় ১০০ টাকা!
সেখানেই অগ্নি ঠিক করলেন—টেকসই অথচ সাশ্রয়ী পণ্যই হবে তাঁর সংস্থার বিশেষত্ব।

২০১৯ সালেই তিন বন্ধু অগ্নি মিত্র, সৌরভ দে এবং অভিজিৎ রজক এর হাত ধরে জন্ম নেয় Amwoodo।২০২০ থেকে পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন শুরু করে Amwoodo। তবে প্রথমদিকে বাজার খুব একটা সাড়া দেয়নি। একে একে যুক্ত হয় First Cry, Himalaya, Godrej-এর মতো বৃহৎ সংস্থা।

এই কাছাকাছি সময়েই দেশে একক ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ হয়। ফলে Amwoodo-র অর্ডার কয়েকগুন বেড়ে যায়।

আজ ভারতের পরিবেশবান্ধব পণ্যের বাজারের ৮৫ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে Amwoodo-র সঙ্গে যুক্ত। শুধু কর্পোরেট নয়, হোটেল শিল্পেও তারা এক বিপ্লব এনেছে। হোটেলের প্লাস্টিক টুথব্রাশ, চিরুনি ইত্যাদি একে একে জায়গা নিচ্ছে বাঁশের তৈরি বিকল্পে।

আজ ভারতে ১০০টিরও বেশি কর্পোরেট ও হোটেল চেইন Amwoodo-র ক্লায়েন্ট। কলকাতার কাছেই ৬,০০০ বর্গফুটের কারখানায় ৪০ জনের টিম প্রতিদিন তৈরি করছে হাজারো অর্ডার। শুধু দেশেই নয়, দুবাই, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, জার্মানি, স্লোভাকিয়া—সব জায়গায় রফতানি হচ্ছে পণ্য।
গত অর্থবছরে সংস্থার টার্নওভার ছিল ২.৬৫ কোটি টাকা। চলতি বছরে সেই অঙ্ক ১০ কোটিতে পৌঁছাবে বলে আশা করছে Amwoodo। ব্যবসা বড় করতে জিরোধা, রেনেট ম্যাটার-এর মতো সংস্থার ফান্ডিং পেয়েছেন তারা। তবে শুধুমাত্র সংস্থার জন্য অর্থোপার্জনই নয়, তাদের সংস্থার মাধ্যমে কাজের সুযোগ পাচ্ছেন বংশ পরম্পরায় এই কাজের সাথে যুক্ত পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর পূর্বের কৃষক আর শিল্পীরা। এই কয়েকবছরে এক মিলিয়ন এর বেশি বাঁশ গাছ লাগিয়েছেন তারা। কয়েকশো মেট্রিক টন প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশে যাওয়া প্রতিরোধ করেছেন বাঁচিয়েছেন উল্লেখযোগ্য পরিমাণের কার্বন নির্গমন।

অগ্নি হাসতে হাসতে বলেন, “আমি মূলত গবেষণা ক্ষেত্রের মানুষ। ব্যবসা করার ইচ্ছা ছিল না। তবুও Amwoodo শুরু করলাম। প্রথমদিকে কঠিন ছিল, কিন্তু সবচেয়ে ভালো লেগেছে যখন প্লাস্টিক বিক্রেতাদের মনোভাব বদলাতে পেরেছি এবং তাদের সাসটেনেবল পথে হাঁটতে অনুপ্রাণিত করেছি।”