কেরালার পশ্চিমঘাটের এক ছোট্ট কোনে ২০ জন স্থানীয় ও আদিবাসী নারী, শিকড় থেকে শুরু করে নতুন জীবন দিচ্ছেন এক মৃতপ্রায় রেইনফরেস্টকে। ‘গুরুকুলা বোটানিক্যাল স্যাংচুয়ারি’ নামের এই অভয়ারণ্যে তারা ইতিমধ্যেই লালন করেছেন ২,০০০-রও বেশি দেশীয় উদ্ভিদ প্রজাতি। ফিরিয়ে এনেছেন পাখি, ব্যাঙ, এমনকি বাঘের উপস্থিতির চিহ্নও।
এক ভয়াবহ ঝড়ের পরের এক সকালে , লালি জোসেফ (৫৬) বনের ভেতর দিয়ে হাঁটছিলেন। চারদিকে ভাঙা গাছপালা, হাহাকার। হঠাৎ চোখে পড়ল একটি দেশীয় অর্কিড, ভাঙা ডালের সাথে আঁকড়ে বেঁচে আছে। তিনি সতর্ক হাতে সেটিকে তুলে এনে আরেকটি সুস্থ গাছে বেঁধে দিলেন।

এভাবেই প্রতিদিন ঘটে ছোট ছোট লৌকিক মানবিক কাজ — নেই কোনো প্রচার, নেই কোনো শিরোনাম, শুধু নীরব যত্ন আর নিষ্ঠা।
শুরু হয়েছিল ১৯৮১ সালে, জার্মান সংরক্ষণবিদ উলফগ্যাং থিউয়ারকফ এর হাত ধরে। তিন হেক্টর রেইনফরেস্ট তিনি উপহার পান এক আধ্যাত্মিক গুরুর কাছ থেকে। আশেপাশে তখন বন উজাড় হচ্ছিল বাগান তৈরির জন্য। তিনি বিরল উদ্ভিদ সংগ্রহ করে অভয়ারণ্যে নিয়ে আসতে শুরু করলেন। সেই ছোট উদ্যোগ আজ বিস্তৃত হয়েছে ৩২ হেক্টরে।

থিউয়ারকফ তার বাকি জীবন ভর এই কাজে স্থানীয়দের যুক্ত করেছিলেন। প্রয়াণের আগে স্থানীয় ২০ জন নারীকে বাছাই করে ব্যক্তিগতভাবে প্রশিক্ষণ দেন। আজ তারাই গড়ে তুলেছেন প্রকৃতির এই দুর্গ। এদের কেউ প্রশিক্ষিত উদ্ভিদবিদ নন—তারা শিখেছেন মাটি খুঁড়ে, গাছ ছুঁয়ে, বার বার চেষ্টা করে করে।
লালি জোসেফ বলেন, “আমি এক্স-রে টেকনিশিয়ান হওয়ার প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলাম। কিন্তু গাছপালার প্রতি ভালোবাসা আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে।”
আজ গুরুকুলা বোটানিক্যাল স্যাংচুয়ারি-তে রয়েছে—
১. দক্ষিণ ভারতের ২৮০ ফার্ন প্রজাতির মধ্যে ২৬০টি
২. বিরল ইমপেশেন্স প্রজাতি Impatiens jerdoniae
৩. প্রায় ১০০ দেশীয় বৃক্ষ প্রজাতি
৪. ৫০০ ভেষজ, লতা, ঝোপ ও এপিফাইট
৫. ২০০-রও বেশি শৈবাল ও লিভারওয়ার্ট প্রজাতি
এ কারণেই একে ডাকা হয় — ‘উদ্ভিদের নোয়ার নৌকা’।
কেন এই বন গুরুত্বপূর্ণ
পশ্চিমঘাট ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্বের আটটি জীববৈচিত্র্যের হটস্পটের একটি। এখানে ভারতের উন্নততর উদ্ভিদের ২৭% বিদ্যমান। এর নদী ও ঝরনা জীবনধারণে সহায়তা করে দক্ষিণ ভারতের কোটি কোটি মানুষকে।
কিন্তু বন ধ্বংস, শিল্পায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনে এই বাস্তুতন্ত্র ক্রমেই হুমকির মুখে। সেখানে গুরুকুলা হলো বিরল প্রজাতির শেষ আশ্রয়।

এখানের নারীরা বিশ্বাস করেন— বনকে জোর করে নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং তাকে নিজের মত বাড়তে দিতে হবে।
তারা সঠিক পরিবেশ তৈরি করেন, ক্ষতিকর জিনিস সরান, তারপর অপেক্ষা করেন।
ফলস্বরূপ শুধু উদ্ভিদই ফিরে আসেনি, নয়, ফিরে এসেছে—
১. ২৪০ প্রজাতির পাখি
২. ২৫ প্রজাতির উভচর প্রাণী
৩. ২০ প্রজাতির সাপ
৪. হরিণ, হাতি, গৌর এবং বাঘের চিহ্ন
প্রতিটি প্রত্যাবর্তন তাদের সাফল্যের সাক্ষ্য বহন করছে।
থিউয়ারকফ আজ আর নেই, কিন্তু তার উত্তরাধিকার বেঁচে আছে প্রতিটি প্রতিস্থাপিত ফার্ন ও প্রতিটি ছায়াঘেরা ফুলে। সংরক্ষণে তার অবদানের জন্য এই জঙ্গলের তিনটি উদ্ভিদের নামকরণও করা হয়েছে তার নামে।
কেরালার এই নারীরা প্রমাণ করেছেন, সংরক্ষণ মানে শুধু গাছ লাগানো নয়, বরং পুরো বাস্তুতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনা। তাদের নীরব বিপ্লব আজ পৃথিবীর কাছে এক অনুপ্রেরণা।


