Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

‘টমেটো-লেদার’- ফ্যাশন দুনিয়ার নবতম সাসটেনেবল সংযোজন

২৬ বছরের তরুণ টমেটোর বর্জ্য থেকে তৈরি করছেন পরিবেশবান্ধব চামড়া। ফ্যাশন দুনিয়ায় ব্যবহৃত প্রাণীচামড়ার বিকল্প টমেটো থেকে তৈরি জুতো বা ব্যাগ শুনতে যেমন অভিনব, বাস্তবেও তাই। এই উদ্ভাবনই ২০২১ সালে ‘পেটা ভেগান ফ্যাশন অ্যাওয়ার্ডস’-এ বেস্ট ইনোভেশন ইন টেক্সটাইল পুরস্কার এনে দেয় দ্য বায়ো কোম্পানি (টিবিসি)-কে। প্রতিষ্ঠাতা ২৬ বছরের প্রিতেশ মিস্ত্রি, যিনি টমেটোর বর্জ্যকে রূপান্তরিত করছেন পরিবেশবান্ধব, ভেগান ও বায়োডিগ্রেডেবল চামড়ায়—যার নাম বায়োলেদার।

টমেটো কেন?
ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ টমেটো উৎপাদক, বছরে প্রায় ৪৪ মিলিয়ন টন। এর মধ্যে ৩০–৩৫% নষ্ট হয়। এই অপচয়—বিশেষত খোসা ও বীজ—হয়ে উঠেছে বায়োলেদারের কাঁচামাল। টমেটোতে রয়েছে প্রাকৃতিক পেকটিন, যা নমনীয়তা ও শক্তি বাড়ায়। এর ফাইব্রাস গঠন ও ভিতরে থাকা প্রাকৃতিক তেল চামড়ার মতো টেক্সচার দেয় এবং সময়ের সাথে জৈবভাবেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।

প্রিতেশ বলেন, “টমেটো ব্যবহার করে আমরা খাদ্য অপচয় ও দূষণ দুই সমস্যার সমাধান করছি। মূল্যহীন এক উপপণ্যকে আমরা মূল্যবান ও পরিবেশবান্ধব সম্পদে রূপান্তরিত করছি।”

মুম্বইয়ের থাডোমল শাহানি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে বায়োটেকনোলজিতে স্নাতক প্রিতেশ প্রথমে এটিকে শেষ বর্ষের প্রজেক্ট হিসেবে শুরু করেন। কানপুরের ট্যানারিগুলোতে গিয়ে তিনি চামড়া শিল্পের ভয়াবহ দূষণ দেখেন। একই সময় কৃষিক্ষেত্রে খাদ্য অপচয়ের চিত্রও তার নজরে আসে।

তারপর মাসের পর মাস ধরে তিনি, টমেটোর উপজাত নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালান, বিভিন্ন ফর্মুলেশন তৈরি করেন এবং ধীরে ধীরে এমন এক টেকসই ও বায়োডিগ্রেডেবল উপকরণ তৈরি করেন যা দেখতে ও কাজে চামড়ার মতো। পরে টিবিসি তাদের প্রযুক্তি ও প্রক্রিয়ার পেটেন্টও নেয়।

২০১৯ সালে ‘অরিজিনাল বায়োলেদার’ বাজারে আনার পর টিবিসি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে—ভেগান, কার্বন-নিউট্রাল, বায়োডিগ্রেডেবল এবং প্রাকৃতিক রঙে রঞ্জিত চামড়া তৈরি করতে।

মহারাষ্ট্র, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশের খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট ও খামার থেকে টমেটো বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। সুরাট প্ল্যান্টে এই উপজাত মিশে যায় বায়োপলিমার, উদ্ভিদ-ভিত্তিক বাইন্ডার ও প্রাকৃতিক আঁশের সঙ্গে। অ-বিষাক্ত প্রক্রিয়ায় সেটি শক্ত ও টেকসই চামড়ার মতো রূপ পায়। শেষে উদ্ভিদ-ভিত্তিক কোটিং দেওয়া হয়, যা একে জলপ্রতিরোধক করে এবং দীর্ঘস্থায়ী রাখে। ফলে তৈরি হয় সম্পূর্ণ PU ও PVC-মুক্ত পরিবেশবান্ধব চামড়া।
কারা ব্যবহার করছে টমেটো চামড়া?

বায়োলেদারের প্রাথমিক ব্যবহার হচ্ছে ফ্যাশন, ব্যাগ ও জুতার ক্ষেত্রে। কানাডার টরোন্টো-ভিত্তিক ‘সাতুহাতি’ হ্যান্ডব্যাগ ব্র্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা নাতাশা মাংগওয়ানি বলেন, “বায়োলেদার অনন্য—কারণ এটি ফেলে দেওয়া টমেটো থেকে তৈরি। PU/PVC মুক্ত হওয়ায় সাধারণ ফক্স লেদারের চেয়ে এটি অনেক ভালো।”

২০২৪ সালে প্রথম উৎপাদন শুরু হওয়ার পরই, প্রথম ব্ল্যাক ফ্রাইডে সেলেই চাহিদা উৎপাদনকে ছাড়িয়ে যায়। পাশাপাশি অটোমোবাইল শিল্পও সিট কাভার ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনে এটি ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা করছে।
প্রশ্ন করলে প্রিতেশ জানান, বায়োলেদার ঘ্রাণ নিরপেক্ষ ও মনোরম—কোনও প্লাস্টিক বা রাসায়নিকের গন্ধ নেই। বর্তমানে টিবিসি সুরাট প্ল্যান্টে প্রতি মাসে প্রায় ৫,০০০ মিটার বায়োলেদার উৎপাদন করে, যা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

ভবিষ্যতের লক্ষ্য কী?
প্রিতেশের মতে, “গুণমান ও টেকসই দিক বজায় রেখেই উৎপাদন বাড়ানো এখন আমাদের মূল লক্ষ্য।”
টমেটোর বর্জ্যকে নতুনভাবে কাজে লাগিয়ে বায়োলেদার কেবল ফ্যাশন জগতের বিকল্প নয়, বরং পরিবেশ সুরক্ষা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।