গরিবদের সাহায্য করার আশা ও নেশায় অনেক কাল কেটেছে। বহুজাতিক সংস্থার চাকরি ছেড়ে নামজাদা এনজিও-র বড়ো বড়ো প্রোজেক্ট থেকে মাইক্রো ফাইনান্স। ক্ষুদ্র সঞ্চয় প্রকল্পের আঁতুরঘর মহম্মদ ইউনূসের বাংলাদেশ থেকেও ঘুরে আসা হয়েছে। মোহভঙ্গ হয়েছে সবেতেই।
কেউ করছে গরিবদের সাহায্য করার ব্যবসা। কেউ বা ক্রেডিট কার্ডের তিনগুন সুদ নিচ্ছে। আর ঋণ শোধ না করতে পারলে তুলে নিয়ে যাচ্ছে ঘরের ঘটিবাটিও।

এইসব দেখেশুনে ২০০৮-০৯ নাগাদ সব ছেড়ে নিজের দাদার ওয়েব ডিজাইনিং সংস্থায় যোগ দেন জয়তি দত্ত রায়। টালিগঞ্জ এলাকায়। সেখান থেকেই বরাবরের ডানপিটে জয়তির নতুন করে পথচলা শুরু।
সংস্থার অফিস ছিল পৈতৃক বাড়ির একতলায়। নিজের আর সংস্থার লোকেদের রোজকার খাওয়া দাওয়া, অফিসে আসা ক্লায়েন্টদের চা কফির বন্দোবস্ত করার বিষয়ে ভাবতে ভাবতেই মাথায় আসে নিজের বাড়ির পিছনের উঠোনে ক্যাফে বানানোর কথা। যেখানে নিজের শখ পুরণের সাথে সাথে চেনা শোনা লোকেরাও যাতে যুক্তিসংগত দামে চা কফি সহযোগে আড্ডা মারতে পারে। সেটা ২০১৪ সাল। এক ডিজাইনার বন্ধুর পরামর্শে অতি অল্প খরচে মাথার ওপর ত্রিপল আর দেওয়াল হিসেবে বাঁশের বেড়াকে ব্যবহার করে, কিছু চেয়ার টেবিল, আলো আর গাছের টব সাজিয়ে যাত্রা শুরু করে টলি ক্যাফে। ধীরে ধীরে বোঝেন, যদিও উনি বিক্রি করতে চাইছেন কফি আর স্যান্ডউইচ, কিন্তু কাস্টমার চায় পরোটা আলুর দম, আর ডাল ভাত মাছের ঝোল। বাজারকে স্বীকৃতি জানিয়ে টলি ক্যাফে শুরু করে হোম ডেলিভারির কাজ। সেই কাজই অতিমারির সময়কালে চলার সাথি হয়ে দাঁড়ায় বেশ কিছু মানুষের। বাড়িতে থাকা এবং হাসপাতালে ভর্তি প্রচুর রোগী ও তাদের পরিজনকে খাবার পৌঁছে দিয়েছেন ওঁরা। তার সাথে সাথে ঘর বন্দি মানুষের কাছে যেকোনো জিনিস পৌঁছে দিতে , নিজেদের ওয়েব ব্যবসাকে কাজে লাগিয়ে শুরু করেন online A-Z service। এখনও সেটা চলছে।

অতিমারির শেষে ২০২২-এ নতুন করে শুরু করেন টলি ক্যাফে।
নতুন আকর্ষণ হিসেবে যোগ হয় সপ্তাহান্তের মিউজিক্যাল সেশন। যেখানে নিজেদের প্রতিভা দেখানোর সুযোগ পান যে কোনো নতুন শিল্পী। আর কিছুটা সুন্দর সময় কাটাতে পারেন ক্যাফেতে আসা মানুষজন।
এখন টলি ক্যাফে এলাকায় জনপ্রিয়। গুগুল দেখেও দেশি-বিদেশি লোকজন আসেন ক্যাফেতে। সম্প্রতি ক্যাফেতেই কিছু প্রদর্শনীর মাধ্যমে কাস্টমারদের চাহিদার ব্যাপারে সচেতন হন জয়তি। শুরু করেন একটি দোকান। যেটাকে ক্যাফেরই এক্সটেনশন বলা চলে। যেখান থেকে ক্যাফেতে আসা মানুষজন কিনে নিতে পারবেন দেশজ শিল্পীদের হাতের কাজ।
তার কথায়, কোনো গরিবের, গ্রামের মানুষের সাহায্যের দরকার নেই। প্রতিটি মানুষের মধ্যেই নানা দক্ষতা ও ক্ষমতা লুকিয়ে আছে। শুধু চাই একটু সম্মান আর সহযোগিতা।

নিজের ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ওঁর উদ্দেশ্য কিছু মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি করা। টলি ক্যাফে হোক বা হস্তশিল্পের দোকান। এসব জায়গায় যোগ্য মানুষ এসে নিজেদের উপার্জনের ব্যবস্থা নিজেরাই করতে পারেন। এক্ষেত্রে বিশেষ ভাবে সক্ষম মানুষদের জন্যও ওঁর দরজা খোলা।
জয়তির মতে ব্যবসা করার জন্য দরকার লেগে থাকার ক্ষমতা আর সব থেকে খারাপ অবস্থা সামলানোর মত সাহস ও শক্তি সঞ্চয় করা।
একদিনে কিছু হয় না। ১৬-১৭ বছরের লম্বা পথ অতিক্রম করে প্রচুর ওঠা পড়ার মধ্যে দিয়ে গিয়ে এখন চার-পাঁচটি ব্যবসা সফল ভাবে চালাচ্ছেন তিনি। কিছুই মাঝপথে ছেড়ে দেননি। সব কিছুকেই বাঁচিয়ে রেখেছেন কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে।
অতিমারি কেড়ে নিয়েছে তার দাদাকে। তবে পাশে পেয়েছেন স্বামী, মা, বৌদি এদের সাহায্য। নিজের যাত্রা পথে এই সাপোর্ট সিস্টেমের অসামান্য অবদান সবসময় স্বীকার করেন জয়তি। সেই সিস্টেমের নবতম সংযোজন জয়তির পুত্র যশ। জয়তির স্বপ্ন এখন দিগন্ত পেরিয়েছে।
মৈত্রী মজুমদার


