Saturday, August 15, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

শিল্প, নৈতিকতা ও মানবজীবনের অন্তর্লোক: কেসিসিতে শিল্পী শিপ্রা ভট্টাচার্যের পাঁচ দশকের শিল্পযাত্রার অনন্য প্রদর্শনী

আবেগ, নারীচেতনা, প্রেম, সম্পর্ক ও সমাজবাস্তবতার বহুমাত্রিক প্রকাশে সাজানো ‘ইন ব্লুম’ প্রদর্শনী চলবে ২৪ জুলাই পর্যন্ত |

আবেগ, সংস্কৃতি ও বাংলার মানসিক ভূদৃশ্যের সূক্ষ্মতম অনুষঙ্গকে এক সুতোয় গেঁথে দর্শকদের সামনে হাজির করেছেন প্রখ্যাত শিল্পী শিপ্রা ভট্টাচার্য। কলকাতা সেন্টার ফর ক্রিয়েটিভিটি (কেসিসি)-তে ১৪ জুলাই থেকে সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে তাঁর একক শিল্পপ্রদর্শনী ‘ইন ব্লুম’। এই প্রদর্শনীতে শিল্পীর গত পাঁচ দশকের সৃষ্টিশীল যাত্রা এবং তাঁর শিল্পভাবনার ধারাবাহিক বিবর্তন তুলে ধরা হয়েছে।

আবেগের বহুস্তরীয় প্রকাশের জন্য সুপরিচিত শিপ্রা ভট্টাচার্য তাঁর শিল্পকর্মে ধারাবাহিকভাবে মানবজীবনের জটিলতাকে অত্যন্ত অন্তরঙ্গ অথচ প্রতীকধর্মী চিত্রভাষার মাধ্যমে অনুসন্ধান করেছেন। বাংলার সাংস্কৃতিক চেতনা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে তিনি পরিচয়, সম্পর্ক, সহনশীলতা এবং রূপান্তরের মতো সর্বজনীন বিষয়গুলিকে নিজের শিল্পে অনন্যভাবে উপস্থাপন করেছেন।

শিপ্রা ভট্টাচার্যের অধিকাংশ শিল্পকর্মেই ফুল ও প্রাণীর মোটিফের প্রাধান্য দেখা যায়। উজ্জ্বল রং, বৈচিত্র্যময় নকশা এবং প্রাণবন্ত বিন্যাস তাঁর শিল্পকে দিয়েছে এক বহির্মুখী অভিব্যক্তি।

“নিজেকে প্রকাশ করার একমাত্র ভাষা ছিল শিল্প”
প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ফাঁকে মিডিয়ার সঙ্গে আলাপচারিতায় শিল্পী জানান।

তিনি আরও বলেন:
“আমি সবসময়ই একজন অন্তর্মুখী মানুষ ছিলাম। সবার সঙ্গে কথা বলতে পারতাম না, সহজে নিজের অনুভূতিও প্রকাশ করতে পারতাম না। শিল্পই ছিল একমাত্র মাধ্যম, যার মাধ্যমে আমি নিজেকে প্রকাশ করতে পেরেছি,” বলেন তিনি।

১৯৫৪ সালে জন্মগ্রহণকারী এই শিল্পী তাঁর দীর্ঘ শিল্পজীবনে নারীর নানা সংকট, অভিজ্ঞতা ও অস্তিত্বের প্রশ্নকে কখনও সরাসরি, কখনও সূক্ষ্ম অথচ দৃঢ় ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন।

নারীর বহিরঙ্গ নয়, অন্তর্জগতই তাঁর শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু :

শিপ্রা ভট্টাচার্যের ছবিতে নারী চরিত্র প্রধান হলেও, তাঁর শিল্প মূলত নারীর অন্তর্চেতনাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। কোমল অথচ সাহসী রঙের ব্যবহার এবং মসৃণ তুলির টানে তিনি প্রতিটি নারী চরিত্রকে রহস্যময় করে তুলেছেন। দর্শকের মনে জাগিয়ে তোলেন দৃশ্যমান বাস্তবতার বাইরেও আরও কিছু খুঁজে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।

কেসিসিতে প্রদর্শিত তাঁর সাম্প্রতিক কাজগুলিতে নারীর শরীর যেন এক মানচিত্র বা বাহনে পরিণত হয়েছে। সেখানে উল্কির মতো ফুটে উঠেছে নানা প্রতীক ও চিত্র, যা একইসঙ্গে পরিপূর্ণতা ও আকাঙ্ক্ষার ভাষা বহন করে।

নারী—বাস্তবতা ও কল্পনার সেতুবন্ধন, শিপ্রা ভট্টাচার্যের শিল্পবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে বরাবরই রয়েছে, এই নারী।

এই প্রদর্শনী জুড়েও নারীরা কখনও আত্মমগ্ন, কখনও দৃঢ়চেতা, কখনও ভঙ্গুর, আবার কখনও বিদ্রোহী চরিত্র হিসেবে উঠে এসেছে। বাস্তবতা ও কল্পনার মধ্যে এক সেতুবন্ধন তৈরি করে তাঁদের মাধ্যমে শিল্পী স্মৃতি, আকাঙ্ক্ষা, আশা এবং প্রতিরোধের নানা কাহিনি নির্মাণ করেছেন।

তাঁর শিল্পে সংবেদনশীলতার এক বিশেষ আবহ রয়েছে। যদিও এগুলি প্রচলিত অর্থে প্রতিকৃতি নয়, তবু প্রতিটি নারী চরিত্রের মধ্যে রয়েছে এক গভীর বাস্তবতা। উজ্জ্বল, সাহসী রঙের সঙ্গে কোমল, বাঁকানো তুলির টানকে অনায়াসে একত্রিত করে তিনি সৃষ্টি করেছেন এক মুগ্ধকর বৈপরীত্য।

কলকাতার কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফ্টস এবং কলেজ অব ভিজ্যুয়াল আর্টস-এ শিক্ষালাভ করা শিপ্রা ভট্টাচার্য ১৯৮১ সাল থেকে নিয়মিত একক প্রদর্শনী করে আসছেন।

নিজের এই প্রদর্শনী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এই প্রদর্শনীতে পাঁচ দশকের শিল্পযাত্রা ধরা পড়েছে, তবে এটি আমার কাজের অল্প কিছু অংশ মাত্র। শহর যেমন বদলেছে, মানুষ যেমন বদলেছে, তেমনই বদলেছে আমার শিল্পও। প্রেম, মানবসম্পর্ক, যৌনতা এবং নৈতিকতা বারবার আমার শিল্পে ফিরে এসেছে।”

দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও শিপ্রা ভট্টাচার্যের শিল্পকর্ম বহু উল্লেখযোগ্য দলগত প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০০৯ সালে নয়াদিল্লির আর্ট অ্যালাইভ-এ ‘থিঙ্ক স্মল’, একই বছরে মুম্বইয়ের পয়েন্ট অব ভিউ-এ ‘মাইলস অ্যাপার্ট’, নিতাঞ্জলি আর্ট গ্যালারি আয়োজিত ‘মন্থন’, যা নয়াদিল্লির গ্যালেরি রোম্যাঁ রোলাঁ-এ অনুষ্ঠিত হয়েছিল, এবং ২০০৭ সালে লন্ডনের কর্ক স্ট্রিট গ্যালারি-তে আর্ট অ্যালাইভ গ্যালারি-র আয়োজনে ‘অ্যান ইন্ডিয়ান সামার’ প্রদর্শনী।

“আমার শিল্পের ব্যাখ্যা দর্শকই দেবেন”
নিজের শিল্পদর্শন সম্পর্কে শিপ্রা ভট্টাচার্য বলেন। “আমার শিল্প উচ্চকণ্ঠ, কারণ এভাবেই আমি আমার বক্তব্য বলতে পারি। আমি কখনও আমার শিল্পের ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করি না। একটি শিল্পকর্মের অর্থ নিয়ে সবাই কখনও একমত হবেন না। তাই তার অর্থ নির্ধারণ সম্পূর্ণ দর্শকের ওপর নির্ভর করে। আমার শিল্প মূলত একটি দৃশ্যভিত্তিক মাধ্যম।”

নিজের অনুপ্রেরণার উৎস সম্পর্কে শিল্পী জানান, মানুষের জীবনই তাঁকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে।

তিনি বলেন, “একদিন একটি সুন্দরী মহিলাকে তাঁর বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম। তিনিই হয়ে উঠেছিলেন আমার অনুপ্রেরণা। আমি সত্তরের দশকে শিল্পচর্চা শুরু করি। সেই সময়টা আজকের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। চারদিকে অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা দেখেছি। সেখান থেকেই অনুপ্রেরণা পেয়েছি। আমার কল্পনায় গৃহজীবন এবং জনজীবন একে অপরের সঙ্গে মিশে যেত। এক নারীর উড়ন্ত চুলই হয়ে উঠত কলকাতার ভূদৃশ্য, যার মধ্যে দিয়ে মানুষ এবং মেট্রো চলাচল করছে।”

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিশিষ্ট শিল্পী শুভাপ্রসন্ন ভট্টাচার্য এবং অভিনেত্রী মুন মুন সেন-সহ বহু খ্যাতনামা শিল্পী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিতে প্রদর্শনীর উদ্বোধন হয়।

কেসিসিতে আয়োজিত ‘ইন ব্লুম’ প্রদর্শনী আগামী ২৪ জুলাই পর্যন্ত দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।