Saturday, August 15, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

পরিচালক ইমতিয়াজ আলিকে কলকাতার শিল্পীর উপহার, নতুন করে আলোচনায় বিষ্ণুপুরের টেপাপুতুল ও হিঙ্গুল পুতুলের শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য

‘জব উই মেট’-এর পোস্টারকে নতুনভাবে কল্পনা করে তৈরি শিল্পকর্মে বিষ্ণুপুরের হিঙ্গুল পুতুলের ব্যবহার। সেই উপহারই ফের আলোচনায় এনেছে অবিভক্ত বাংলার শতাব্দীপ্রাচীন টেপাপুতুল শিল্পকে।

বাংলা বহু শতাব্দী ধরে বিকশিত হওয়া অসংখ্য লোকশিল্পের ভাণ্ডার।

সময়ের স্রোতে অনেক শিল্পধারা হারিয়ে গেলেও কিছু এখনও টিকে রয়েছে। তারই অন্যতম ঐতিহ্যবাহী পুতুলশিল্প। মাটি, পাট, এমনকি ফেলে দেওয়া কাপড় দিয়েও একসময় তৈরি হতো এই পুতুল, যা অনেক পরিবারে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া মূল্যবান সম্পদের মতোই যত্নে সংরক্ষিত থাকত। সেই ঐতিহ্যের মধ্যেই বিষ্ণুপুরের বিখ্যাত হিঙ্গুল বা হিমপুতুল— টেপাপুতুলের (হাতে চাপ দিয়ে তৈরি ঐতিহ্যবাহী মাটির পুতুল) একটি বিশেষ ধরন— এবার নজর কেড়েছে বলিউডের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র নির্মাতা ইমতিয়াজ আলি-র।

সম্প্রতি স্বশিক্ষিত শিল্পী ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর শুভাঙ্গী মজুমদার দক্ষিণ কলকাতার একটি প্রেক্ষাগৃহে ‘ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা’ ছবির বিশেষ প্রদর্শনীতে অংশ নেন। সেখানেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয় ইমতিয়াজ আলির।

তিনি আলিকে উপহার দেন একটি ছোট্ট চিত্রকর্ম, যেখানে ২০০৭ সালে পরিচালকের জনপ্রিয় ছবি জব উই মেট-এর পোস্টারকে নতুনভাবে কল্পনা করা হয়েছে। পোস্টারের মূল চরিত্রদের মুখের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে বিষ্ণুপুরের হিঙ্গুল পুতুলের অবয়ব।

শিল্পকর্মটি দেখে স্পষ্টতই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ইমতিয়াজ আলি। তিনি ছবিটির উপর নিজের স্বাক্ষর করেন এবং সেটি আবার শিল্পীর হাতে ফিরিয়ে দেন।

সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে শুভাঙ্গী বলেন, “প্রথমে তিনি কিছুটা অবাক হয়েছিলেন, কারণ সাধারণত ভক্তরা তাঁকে এ ধরনের শিল্পকর্ম উপহার দেন না। চারপাশে প্রচুর ভিড় থাকা সত্ত্বেও তিনি ধৈর্য সহকারে টেপাপুতুলের ইতিহাস ও গুরুত্বের কথা শুনেছিলেন। শিল্পকর্মটির আন্তরিক প্রশংসা করেন, আমাকে ধন্যবাদ জানান, ছবির উপর ‘Love’ লিখে স্বাক্ষর করেন। ইমতিয়াজ আলির মতো একজন নির্মাতার কাছ থেকে এমন স্বীকৃতি পাওয়া আমার কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।”

কলকাতার শিল্প-ইতিহাসবিদ সৌজিত দাস জানান, টেপাপুতুল কোনও একক পুতুলের নাম নয়। এটি বাংলার হাতে চাপ দিয়ে ভেজা মাটি দিয়ে তৈরি পুতুলের একটি বিস্তৃত ঐতিহ্যবাহী ধারার নাম।

এই বৃহত্তর ধারার মধ্যেই বিষ্ণুপুরের হিঙ্গুল বা হিমপুতুল একটি স্বতন্ত্র বিভাগ। ছোট আকারের এই মাটির পুতুল রোদে শুকিয়ে তৈরি করা হয় এবং রঙ করা হয় হিঙ্গুল (স্থানীয়ভাবে পাওয়া সিঁদুর লাল রঞ্জক) ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক উদ্ভিজ্জ রঙ দিয়ে।

বুড়ো আঙুলের সমান ছোট আকার, সরল গঠন এবং উজ্জ্বল রঙের জন্য এই পুতুল বাংলার অন্যান্য টেপাপুতুল— যেমন জৌ, ষষ্ঠী, আহ্লাদ-আহ্লাদি, গৌরাঙ্গ, কাঠালিয়া ও দেওয়ালি পুতুল— থেকে আলাদা পরিচিতি পেয়েছে।

টেপাপুতুলের উৎপত্তি সম্পর্কে সৌজিত দাস বলেন, এই শিল্পধারাকে নির্দিষ্ট কোনও সময়ের সঙ্গে যুক্ত করা যায় না।

তাঁর কথায়, “ঐতিহাসিকভাবে সিন্ধু সভ্যতার বিভিন্ন প্রত্নস্থল এবং পশ্চিমবঙ্গের চন্দ্রকেতুগড় থেকেও হাতে চাপ দিয়ে তৈরি মূর্তি উদ্ধার হয়েছে। ফলে এই শিল্পের ধারাবাহিকতা কতটা প্রাচীন, তা নির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। রাজদরবার বা কর্মশালাভিত্তিক শিল্পের মতো নয়, এটি ছিল সমাজভিত্তিক ঐতিহ্য, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব প্রায় ছাড়াই টিকে থেকেছে।”

তিনি আরও জানান, হিঙ্গুল পুতুল বিশেষভাবে তৈরি করতেন (এবং এখনও করেন) ফৌজদার পরিবারের মহিলারা। ‘ফৌজদার’ একটি ইন্দো-পার্সিয়ান উপাধি এবং এই পরিবার বিষ্ণুপুরের রাজপরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল।

কিন্তু কেন ইমতিয়াজ আলিকে এই বিশেষ শিল্পকর্মই উপহার দিলেন শুভাঙ্গী?

ইমতিয়াজ আলির একনিষ্ঠ অনুরাগী শুভাঙ্গী জানান, তিনি ১৯৪৭ সালের বাংলা ও পাঞ্জাবের দেশভাগের অভিন্ন ইতিহাসের মধ্যে একটি যোগসূত্র তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। ‘ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা’ ছবিতেও এই বিষয়টি উঠে এসেছে।

দেশভাগে বাস্তুচ্যুত মানুষের যন্ত্রণা ও অদম্য মানসিক শক্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি ইমতিয়াজ আলির ছবির পোস্টারকে নতুনভাবে কল্পনা করেন। সেখানে ব্যবহার করেন টেপাপুতুলের সেই বিশেষ ধরন, যা একসময় অবিভক্ত বাংলার বন্যাপ্রবণ অঞ্চল— ঢাকা, রাজশাহী, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া জুড়ে সমান জনপ্রিয় ছিল।

শুভাঙ্গীর কথায়, “তাঁর ছবি যেমন পাঞ্জাবের দেশভাগের বেদনা ও স্মৃতিকে অসাধারণভাবে তুলে ধরে, তেমনই আমি তাঁকে এমন একটি শিল্পকর্ম উপহার দিতে চেয়েছিলাম যা অবিভক্ত বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে। টেপাপুতুল শুধু একটি লোকশিল্প নয়, এটি বাংলার অভিন্ন ইতিহাস, পরিচয় ও সংস্কৃতির প্রতীক। দেশভাগ শুধু ভূখণ্ডকে ভাগ করেনি, সাংস্কৃতিক সম্প্রীতিকেও ভেঙে দিয়েছিল। ফলে টেপাপুতুলের মতো বহু ঐতিহ্যবাহী শিল্পধারা ধীরে ধীরে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে শুরু করে।”

শুভাঙ্গীর এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত সৌজিত দাসও। তাঁর মতে, হিঙ্গুল পুতুল-সহ টেপাপুতুলের বিভিন্ন রূপ শহুরে মানদণ্ডে যথেষ্ট ‘পরিশীলিত’ বলে বিবেচিত হয় না। তাই সমাজ এখনও এই শিল্পের প্রকৃত নান্দনিক মূল্যকে যথাযথভাবে স্বীকৃতি দেয়নি।

তিনি বলেন, “অন্যান্য অনেক দেশজ শিল্প নতুন বাণিজ্যিক বাজারের কারণে টিকে থাকলেও সেগুলিকে মূল প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে শহুরে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী বদলে ফেলা হয়েছে। আমার কাছে সেটা খুব আকর্ষণীয় নয়। যেমন নতুন গ্রামের কাঠের লক্ষ্মীপেঁচাকে এখন অনেক সময় চেয়ারের স্ট্যান্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আবার আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত পুতুলও শহুরে বাড়িতে অ্যাশট্রে হয়ে যায়।”

তবুও ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী শুভাঙ্গী।
তিনি বলেন, “আমার কাজের মাধ্যমে মানুষ যেন টেপাপুতুলের পাশাপাশি এমন আরও বহু গ্রামীণ শিল্পকে নতুন করে চিনতে ও ভালোবাসতে শেখে, যেগুলি প্রায় জনস্মৃতি থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। যদি আমার শিল্পকর্ম কয়েকজন মানুষকেও এই ঐতিহ্যের ইতিহাস জানতে, ঐতিহ্যবাহী শিল্পীদের পাশে দাঁড়াতে বা আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার রক্ষায় অনুপ্রাণিত করে, তাহলেই আমি নিজেকে ধন্য মনে করব।”