Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

কর্মস্থলে যেতেন সাইকেলে, পুরস্কারের বিপুল অর্থ গবেষণায় দান, কলকাতার বিজ্ঞানীর জীবন যেন এক উদাহরণ

‘দ্বিতীয় সুপারস্ট্রিং বিপ্লব’-এর নেপথ্যের মস্তিষ্ক অশোক সেন—বিশ্বজোড়া খ্যাতি, তবু জীবনযাপন সহজ-সরল; পুরস্কারের বড় অংশ দান করে প্রমাণ দিলেন, প্রকৃত মহত্ত্ব নীরব থেকেও প্রকাশ পায়।

কলকাতায় জন্ম নেওয়া অধ্যাপক অশোক সেন আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের এমন এক উজ্জ্বল নাম, যিনি নিজের অসাধারণ গবেষণা দিয়ে বিশ্ববিজ্ঞানের গতিপথ বদলে দিয়েছেন, অথচ ব্যক্তিজীবনে থেকেছেন বিস্ময়করভাবে বিনয়ী ও সাধারণ। কর্মস্থলে সাইকেলে যাতায়াত করা থেকে শুরু করে ৩০ লক্ষ ডলারের বিশাল পুরস্কারের বড় অংশ ছাত্রছাত্রী ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য দান—সবকিছুতেই তিনি প্রমাণ করেছেন, সত্যিকারের মহত্ত্ব কখনও প্রদর্শনের বিষয় নয়।
১৯৫৬ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন অধ্যাপক অশোক। ছোটবেলা থেকেই জটিল গাণিতিক ধারণার প্রতি তাঁর ছিল স্বাভাবিক আকর্ষণ। শ্যামপুকুর এলাকার শৈলেন্দ্র সরকার বিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় থেকেই সমীকরণ ও তাত্ত্বিক ধাঁধার প্রতি তাঁর আগ্রহ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে স্নাতক স্তরে পড়ার সময়ও গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের জটিল প্রশ্নই তাঁকে বেশি টানত।

এরপর তিনি আইআইটি কানপুর থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। তারপর যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্ক অ্যাট স্টোনি ব্রুক-এ ডক্টরাল গবেষণায় যুক্ত হন। গবেষণার পরবর্তী পর্যায়ে তিনি ফার্মিল্যাব এবং স্ট্যানফোর্ড লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর সেন্টারেও পোস্ট-ডক্টরাল পদে কাজ করেন।
বিদেশে একাধিক আকর্ষণীয় ও উচ্চ বেতনের কাজের প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও অশোক সেন দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৮০-র দশকের শেষ দিকে তিনি মুম্বইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ-এ যোগ দেন। পরে ১৯৯৫ সালে তিনি প্রয়াগরাজের হরিশ-চন্দ্র রিসার্চ ইনস্টিটিউটে চলে যান, যেখানে ব্ল্যাকবোর্ড, চক এবং গভীর চিন্তাভাবনাকেই ভিত্তি করে তিনি গড়ে তোলেন এক অনন্য গবেষণা-জীবন।

বিশেষ করে স্ট্রিং থিয়োরিতে তাঁর অবদান ১৯৯০-এর দশকে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে। স্ট্রং-উইক কাপলিং ডুয়ালিটি এবং বর্তমানে ‘সেন কনজেকচার’ নামে পরিচিত ধারণা দেখিয়েছিল, কীভাবে স্ট্রিং থিয়োরির বিভিন্ন সংস্করণ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। এই কাজই পরবর্তীতে অনেকের মতে ‘দ্বিতীয় সুপারস্ট্রিং বিপ্লব’-এর সূচনা ঘটায়।
২০১২ সালে তাঁর জীবনে আসে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তিনি একটি ফোন পান—তাঁকে প্রদান করা হচ্ছে প্রথম ‘ফান্ডামেন্টাল ফিজিক্স প্রাইজ’। এই পুরস্কারের অর্থমূল্য ছিল নোবেল পুরস্কারের প্রায় তিন গুণ, যা তাঁর দূরদর্শী গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হয়।

অনেকেই ভেবেছিলেন, এই পুরস্কার পাওয়ার পর তাঁর জীবন আমূল বদলে যাবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটল ঠিক উল্টোটা। পুরস্কারের একটি বড় অংশ তিনি ছাত্রছাত্রীদের সহায়তা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার উন্নতির জন্য দান করেন। আর পরের দিনই তিনি আবার সাইকেল চালিয়ে কর্মস্থলে পৌঁছে যান। আজও তিনি বড় আড়ম্বরের পরিবর্তে ছোট, সাধারণ অফিস এবং চক-বোর্ডের সরলতাকেই বেশি পছন্দ করেন।
অশোক সেনের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃত মহত্ত্ব বেশীরভাগ সময় কোনও প্রচার ছাড়াই নীরবে এসে দাঁড়ায়। কখনও তা আসে দু’চাকার একটি সাইকেলে, কখনও বা এক অনমনীয় কৌতূহল আর জ্ঞানের প্রতি অবিচল নিষ্ঠায়।