করোনা কেড়ে নিয়েছিল চাকরি, সংসার চালাতে শুরু ‘ফুচকাওয়ালা’; আজ ২৫ রকমের স্টাফড ফুচকা বিক্রি করে ১০টি পরিবারের ভরসা হয়ে উঠেছেন তারা। মহামারির সময় যখন পরিবারের আয়ের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তখনই জীবন বদলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এক দাদা ও তার বোন দেবজ্যোতি সাহা ও জ্যোতির্ময়ী সাহা।
বৃহত্তর কলকাতার একপ্রান্তে তাঁরা শুরু করেন ‘ফুচকাওয়ালা’—একটি বিশেষ ডাইন-ইন রেস্তোরাঁ, যেখানে পরিবেশন করা হয় ২৫-এরও বেশি ধরনের স্টাফড ফুচকা। আজ সেই ব্যবসা শুধু তাঁদেরই নয়, আরও ১০টি পরিবারের মাসিক আয়ের ভরসা হয়ে উঠেছে।
একসময় যেখানে পরের বেলার খাবার কোথা থেকে আসবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা ছিল, আজ সেখানে মাসে লাখ টাকা আয় করছেন তাঁরা। সেই সময়ে ২৮ বছরের দেবজ্যোতি এবং ২২ বছরের জ্যোতির্ময়ীর এই সংগ্রামের কাহিনি সত্যিই অনুপ্রেরণামূলক।
দেবজ্যোতি পেশায় একজন ইঞ্জিনিয়ার। কোভিডের আগে তাঁর একটি স্থায়ী চাকরি ছিল। সেই বেতনের টাকাতেই চলত সংসার, পাশাপাশি চলত ছোট বোনের পড়াশোনার খরচও। কিন্তু লকডাউনে চাকরি হারানোর পর এক মুহূর্তে সবকিছু বদলে যায়।
দেবজ্যোতি বলেন, “চাকরি চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে EMI শোধ করা, সংসার চালানো এবং বোনের কলেজের ফি দেওয়ার দায়িত্ব একসঙ্গে এসে পড়ে।” ২০২০ সালের মার্চের আগের কয়েক মাস সাহা পরিবারের কাছে ছিল উদ্বেগ, অসহায়তা এবং অনিশ্চয়তায় ভরা। ঠিক সেই সময়েই তাঁদের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে কলকাতার অন্যতম প্রিয় স্ট্রিট ফুড—ফুচকা।
২০২০ সালের ১৮ অক্টোবর তাঁরা তাঁদের ডাইন-ইন রেস্তোরাঁ ‘ফুচকাওয়ালা’ শুরু করেন। জ্যোতির্ময়ী বলেন, “রেস্তোরাঁ খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আমাদের হাতে শেষ সম্বল বলতে ছিল সামান্য কিছু সঞ্চয়। মোটামুটি ১৫ হাজার টাকার মতো ছিল।”
ফলে রেস্তোরাঁর প্রতিটি কাজ নিজেরাই করেছেন তাঁরা—জায়গা পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে দেওয়াল রং করা, সাজানো, ফার্নিচার বসানো—সবই। এমনকি দোকানের বাইরের নামফলকটিও নিজেরাই তৈরি করেছিলেন। তিনি বলেন, “এটা পুরোপুরি টিম এফর্ট ছিল।”
রেস্তোরাঁ শুরু করার সময় তাঁদের মনে হয়েছিল, হারানোর আর কিছুই বাকি নেই। দেবজ্যোতি বলেন, “আমাদের নিজের বলার মতো কিছুই ছিল না। বেঁচে থাকার জন্য এটাকে সফল করতেই হত। আমরা জানতাম, এর চেয়ে খারাপ আর হতে পারে না। তাই ঝাঁপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।” তিনি আরও বলেন, “আমি শুধু চেয়েছিলাম জ্যোতির্ময়ী যেন পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে এবং নিজের কোর্স শেষ করতে পারে।”
এই পথচলায় সাহায্য করেছিল তাঁদের বাবার বহু বছর আগে কেনা একটি ছোট দোকানঘর। দেবজ্যোতি জানান, “দোকানটি মূল রাস্তার উপর ছিল না এবং ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ পড়ে ছিল।” তবে দাদা-বোন নিজেদের পরিকল্পনায় নিশ্চিত থাকলেও, প্রথমদিকে তা মোটেই ভালোভাবে নেননি তাঁদের বাবা শ্রীদাম সাহা। তাঁর প্রশ্ন ছিল—দু’জন উচ্চশিক্ষিত সন্তান কেন জীবিকা হিসেবে ফুচকা বিক্রি বেছে নেবে? জ্যোতির্ময়ী হেসে বলেন, “শুরুর দিকে বিষয়টা তিনি একেবারেই পছন্দ করেননি।”
রেস্তোরাঁয় ফুচকা? সেখানেই ছিল সাফল্যের সূত্র
সাধারণত কেউ রেস্তোরাঁয় বসে ফুচকা খেতে কেউ আসে না—এই নেগেটিভ ধারণাকেই সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন দেবজ্যোতি। তিনি বলেন, “এটা আমাদের কাছে একটি নিশে মার্কেট মনে হয়েছিল। রেস্তোরাঁ স্পেসে এই ধারনার প্রতিযোগী ছিল না। ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে এটি সফল হতে পারে বলেই মনে হয়েছিল।” তাঁদের USP ছিল একটি “ইউনিক রেস্তোরাঁ” তৈরি করা। বাজারে যা সহজলভ্য, তা নয়—বরং নতুন কিছু দিতে চেয়েছিলেন তাঁরা।
জ্যোতির্ময়ী বলেন, “আমরা দু’জনেই খেতে খুব ভালোবাসি। তাই অনেক ভেবে দেখেছিলাম কী পরিবেশন করা যায়। আশ্চর্যের বিষয়, আমরা দু’জনেই প্রায় একই সময়ে ফুচকার কথা ভাবি। তবে সেটিকে আলাদা করে তুলতে পুরে নানা নতুনত্ব আনার সিদ্ধান্ত নিই।”
আজ ‘ফুচকাওয়ালা’-তে পাওয়া যায় চিকেন-পুরভরা ফুচকা, কর্ন-চিজ ফুচকা, এমনকি ‘বাংলাদেশি ফুচকা’—যার ভিতরে থাকে ডিমের পুর। ছ’টি ফুচকার একটি প্লেটের দাম ১২০ টাকা। শুরুতে মাত্র ৭ ধরনের স্টাফড ফুচকা দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও, এখন সেখানে ২৫-এরও বেশি ধরনের পুর পাওয়া যায়।
জ্যোতির্ময়ী বলেন, “সব ধরনের স্বাদের কথা মাথায় রেখে ঝাল, টক, মিষ্টি—সব ধরনের ফিলিংস রাখা হয়েছে। চিকেন, কর্ন থেকে শুরু করে চকোলেট ও আইসক্রিম—সবই আছে।” এই অভিনবত্বই গ্রাহকদের বারবার ফিরিয়ে আনছে। নিয়মিত ক্রেতা কুণাল চক্রবর্তী বলেন, “এখানকার প্রায় সব ফিলিংসই আমি খেয়েছি। এখন নতুন কী আসে, সেটার অপেক্ষায় থাকি।”
ছোটবেলার স্বপ্ন পূরণের লড়াই
জ্যোতির্ময়ীর ছোটবেলা থেকেই ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্ন পূরণে পাশে দাঁড়িয়েছেন দাদা দেবজ্যোতি। তিনি বলেন, “আমিও BTech শেষ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি তা হতে দেয়নি। ২০১৫ সালে আমি প্রিন্টিং ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করি। নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে না পারার কষ্ট থেকেই জ্যোতির্ময়ীর স্বপ্ন পূরণকে আরও বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলাম।” তিনি আরও বলেন, “এটা আমাদের কাছে ডু-অর-ডাই পরিস্থিতি ছিল।” জ্যোতির্ময়ীর কলেজের ফি ছিল প্রায় ৩.৫ লক্ষ টাকা। তিনি জানান, রেস্তোরাঁর খাবার বিক্রির আয় থেকেই তাঁর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে।
আর মাত্র এক বছর বাকি। নিজের কোর্স সফলভাবে শেষ করার ব্যাপারে আশাবাদী তিনি। জ্যোতির্ময়ী বলেন, “আমার ডিগ্রি সম্পূর্ণ করার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য পুরো কৃতিত্ব ফুচকাওয়ালার।”
দুর্গাপুজোর বিক্রি বদলে দেয় ভাগ্য
২০২০ সালের অক্টোবর মাসে ব্যবসা শুরু হওয়ার সময় কলকাতায় চলছিল দুর্গাপুজো। সেই সময় বিক্রি ছিল অসাধারণ। জ্যোতির্ময়ী বলেন, “ওই সময়ের ভালো বিক্রি শুধু আত্মবিশ্বাসই বাড়ায়নি, আমাদের আর্থিকভাবে বড় সহায়তাও করেছিল।” তবে দ্বিতীয় লকডাউন ফের বড় ধাক্কা নিয়ে আসে। রেস্তোরাঁ চালানো বন্ধ হয়ে যায়। দেবজ্যোতি বলেন, “রেস্তোরাঁ চালাতে না পারা খুব কঠিন ছিল। কিন্তু আবারও আমাদের গ্রাহকরাই বলেছিলেন হোম ডেলিভারি শুরু করতে। প্রথমে আমরা নিজেরাই খাবার পৌঁছে দিতাম। পরে অনলাইন ফুড অ্যাগ্রিগেটরের সঙ্গে যুক্ত হই।” রেস্তোরাঁর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকায় কলকাতার কাঁকুড়গাছির প্যান্টালুনস ফুড কোর্টেও তাঁরা দ্বিতীয় আউটলেট খুলেছেন।
দেবজ্যোতি বলেন, “ভালো দিন যেমন আছে, খারাপ দিনও আছে। তবে গড়ে মাসে প্রায় ১.৫ লক্ষ টাকার কাছাকাছি আয় হয়। এখন আমাদের ১০ জন পূর্ণকালীন বেতনভুক্ত কর্মীও রয়েছে।” মাত্র দু’বছরের মধ্যেই ‘ফুচকাওয়ালা’ বিপুল ভালোবাসা অর্জন করেছিল। তারপর বাড়তে থাকে আউটলেটের সংখ্যা আর মেনুর ভ্যারাইটি।
সম্প্রতি জ্যোতির্ময়ী দুবাইয়ে AEMPL এবং GEM Enterprises-এর পক্ষ থেকে ‘ইয়ংগেস্ট উইমেন এন্ট্রেপ্রেনিয়র অফ দ্য ইয়ার’ পুরস্কারও পেয়েছেন। আজ ‘ফুচকাওয়ালা’ শুধু একটি ব্যবসা নয়, এটি সাহা পরিবারের সম্মিলিত স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। দেবজ্যোতি ও জ্যোতির্ময়ী শুরু থেকেই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। বাবা শ্রীদাম সামলান হিসাবপত্র, মা সুশীলা দেখেন মেনু পরিকল্পনা, আর দেবজ্যোতির স্ত্রী পৌলমী সোশ্যাল মিডিয়া স্ট্র্যাটেজির দায়িত্বে।


