Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

ভাইরাল রিল থেকে বাস্তব পরিবর্তন: ‘স্টোরিজ বাই আরাধনা’, নতুন করে গড়ে তুলছে জীবনের গল্প

সোশ্যাল মিডিয়া আজ শুধু সময় কাটানোর মাধ্যম নয়—সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি মানুষের জীবন  বদলানোর মত শক্তিশালী হাতিয়ারও হতে পারে। এই কথাই প্রমাণ করে চলেছেন আরাধনা চট্টোপাধ্যায় ও জয়দীপ সেন, তাঁদের উদ্যোগ ‘স্টোরিজ বাই আরাধনা’র মাধ্যমে।

সকাল ৭টা। কলকাতা তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। কিন্তু আরাধনা চট্টোপাধ্যায় তখনই বেরিয়ে পড়েন রাস্তায়—একটি নতুন গল্পের খোঁজে। তবে সেই গল্প গ্ল্যামারাস নয় বা ট্রেন্ডিং নয়; বরং এমন গল্প, যা আলোচনার বাইরে থেকে যায়, যেগুলোর দিকে অনেকেই তাকায় না।
এইভাবেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় ৭০ বছরের দীপালি ঘোষের। হাওড়ার বাসিন্দা দীপালি ঘোষ, স্বামীর মৃত্যুর পর গত ৩০ বছর ধরে একটি ছোট ‘ভাতের হোটেল’ চালাচ্ছেন। আরাধনা তাঁর উপর একটি রিল তৈরি করেন। রিল-এর উপজীব্য, এক বৃদ্ধা মহিলা, যিনি একাই রান্না করা, পরিষ্কার করা, বাজার করা এবং পরিবেশন করা—সবকিছু একাই সামলে ব্যবসা চালান।

তাঁর হোটেলে তখন মাত্র পাঁচজন ক্রেতা ছিল। দেয়াল ধোঁয়ায় কালো, বাসনপত্র জীর্ণ, আর ছাদ ভাঙা। রাতের বেলা তিনি দোকানের ভিতরে একটি দুর্বল প্লাইউডের ওপর একাই ঘুমাতেন। আরাধনা বলেন, “ওনাকে দেখে আমার দাদু-দিদার কথা মনে পড়েছিল। সেদিন বাড়ি ফিরে খুব খারাপ লেগেছিল। এমন অবস্থায় যদি ১০ জন মানুষও খেতে আসেন, তিনি ঠিকমতো রান্না করতে পারবেন না। তার সেই পরিকাঠামোর নেই। তখনই আমরা সিদ্ধান্ত নিই কিছু একটা করতেই হবে।”

এরপর কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি ও তাঁর টিম একসঙ্গে হাত মিলিয়ে শ্রমিক নিয়োগ করে দিপালী দেবীর ব্যবসার জায়গার সংস্কার করান এবং দিপালী দেবীকে একটি সুস্থ পরিবেশ উপহার দেন। ‘স্টোরিজ বাই আরাধনা’ ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটির মুখ আরাধনা হলেও, এর সাফল্যের পিছনে রয়েছেন তাঁর সঙ্গী জয়দীপ সেন।

এই উদ্যোগের মূল ভাবনাটি জয়দীপের, যিনি সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ফিল্মমেকিং পড়ার পর বিভিন্ন মিডিয়া হাউসে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি নিজের ডিজিটাল মার্কেটিং সংস্থা ‘স্পিকিং মিরর’ পরিচালনা করছেন। তবে ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করার স্বপ্ন তাঁর অনেকদিনের।

জয়দীপ বলেন, “কলেজের পরই ইউটিউব চ্যানেল শুরু করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তখন কেউ সঙ্গ দেয়নি। তাই নিরাপদ পথ বেছে নিয়ে চাকরি করি এবং পরে ডিজিটাল মার্কেটিং এজেন্সি শুরু করি। কিন্তু ভিডিও বানানোর স্বপ্ন কখনও মরে যায়নি।”
অন্যদিকে, আরাধনার পথচলাও ছিল ভিন্নধর্মী। কলেজে পড়াকালীন মডেলিং দিয়ে কেরিয়ার শুরু করেন তিনি এবং একটি ভাইরাল প্যান্টালুনস টিভি বিজ্ঞাপনে ‘পুচকি’ চরিত্রে অভিনয়ও করেন। তবে এই ইন্ডাস্ট্রিতে দীর্ঘদিন থেকে যাওয়ার উৎসাহ পাননি তিনি।

তিনি বলেন, “একজন কলেজ পড়ুয়া হিসেবে ভালোই উপার্জন করতাম। কিন্তু কাজের পরিবেশে আমি খুশি ছিলাম না। আমি নন-ফিকশন কাজেই বেশি আগ্রহী। আমি অভিনয় করতে পারি না, আর ফিকশনেও আগ্রহ ছিল না।”

এরপর জয়দীপের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর, এবং দু’জনেই একসঙ্গে একটি ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ব্যবসা শুরু করার পরিকল্পনা করেন। কোভিড-১৯ মহামারির সময় তাঁরা ‘খানা খানা হ্যায়’ নামে একটি ফুড ট্রাক ব্যবসা শুরু করেন, তবে তা সফল হয়নি। দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তাঁরা নতুন করে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ‘স্টোরিজ বাই আরাধনা’।
কোনও বড় বিনিয়োগ বা আধুনিক স্টুডিও ছাড়াই শুরু হয় তাঁদের যাত্রা—শুধু একটি ক্যামেরা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা গবেষণা এবং নিরলস পরিশ্রম। জয়দীপ বলেন, “শুরুর দিকে আরাধনা প্রচণ্ড গরমে ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা ধরে গল্প খুঁজতেন, অনেক সময় কিছুই পেতেন না। আজ আমরা যদি এক শতাংশও কিছু অর্জন করে থাকি, তা আরাধনার কঠোর পরিশ্রমের জন্যই সম্ভব হয়েছে, বলেন জয়দীপ।

শুধু কাগজ-কলম নিয়ে পরিকল্পনা করে কোনও লাভ নেই, কাজটাই আসল।” ধীরে ধীরে তাঁদের ভিডিওগুলির প্রভাব স্পষ্ট হতে শুরু করে। গোলপার্কের শিল্পী সুনীল পালের উপর তৈরি ভিডিওর পর এক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁর সব ছবি বিক্রি হয়ে যায়।

এক প্রতিমা শিল্পী, যিনি সঙ্কটের মধ্যে ছিলেন, তাঁর ভিডিও প্রকাশের পর হাজার হাজার অর্ডার পান। এমনকি, তাঁদের ভিডিও দেখে মানুষ ক্রাউডফান্ডিংয়ের মাধ্যমে বহু মানুষের চিকিৎসার খরচও বহন করেছেন। জয়দীপ জানান, “আমরা কখনও টাকা চাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু করিনি। আমাদের মেন্টর বলেছিলেন, কাজের প্রভাব শুধু ভিউজ-এ থেমে থাকা উচিত নয়। মানুষ যদি আপনাকে বিশ্বাস করে, তারা নিজে থেকেই সাহায্য করবে।”
দীপালি ঘোষের ক্ষেত্রেও সেই বিশ্বাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দর্শকদের অনুদানে তাঁর দোকানটি সংস্কার করা হয়। দুই ছেলের অবহেলায় থাকা এই মহিলার ওষুধের ব্যবস্থাও স্পনসরদের মাধ্যমে করা হয় এবং একটি নিরাপদ রান্নাঘর তৈরি করে দেওয়া হয়।

আরাধনা বলেন, “আমরা সবকিছু দেখাই না। অনেক কাজই আমরা নীরবে করি, আর সেটাই ঠিক।” ভাইরাল রিলের পিছনে রয়েছে একটি বড় দল—গবেষক, এডিটর এবং তরুণ ইন্টার্নদের নিয়ে। জয়দীপ বলেন, “আমরা ইতিমধ্যে দিল্লি ও মুম্বইতে কাজ শুরু করেছি। আমাদের স্বপ্ন, ভারতের প্রতিটি রাজ্যের গল্প তুলে ধরা। প্রথম দিন থেকেই আমরা ঠিক করেছিলাম, এটি এক ব্যক্তির চ্যানেল হবে না—এটি হবে একটি সংস্থা, একটি কমিউনিটি।”
পরিবার ও বন্ধুদের প্রতিক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন করা হলে হাসতে হাসতেই আরাধনা বলেন, “আমাদের পরিবার আমাদের পরিশ্রম দেখে, কিন্তু বন্ধুরা অনেক সময় ভাবে আমরা অনেক টাকা রোজগার করছি। বাস্তবটা আলাদা। কখনও ১০টা ব্র্যান্ড ডিল থাকে, কখনও মাত্র দু’টি। কখনও সপ্তাহের পর সপ্তাহ ভ্রমণ আর ১৪ ঘণ্টার শুটিং করতে হয়।” তবে আরাধনার কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার হল সেই মানুষগুলির কৃতজ্ঞতা, যাদের জীবনে তাঁরা পরিবর্তন আনতে পেরেছেন। তিনি বলেন, “যখন তারা ফোন করে বলে তারা খুশি, সেটাই আমার কাছে যথেষ্ট। আমি ইনফ্লুয়েন্সার হতে চাই না। পার্টি পছন্দ করি না, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে ভালো লাগে না।”