যাদবপুর ৮বি বাসস্ট্যান্ডের কাছে, পোস্ট অফিস পেরিয়ে গাছের ছায়ায় ফুটপাথের ওপর ছোট্ট একটি দোকান। এখানেই চালের বস্তা, কাঁচের বোতলে আচার আর ঘি-এর বোতলের মাঝে বসে ৬৫ বছরের অরূপকুমার দাস শহরের মানুষকে ফিরিয়ে দিতে চাইছেন এমন এক জিনিস, যা বহুদিন আগেই হারিয়ে গেছে—বিশুদ্ধ খাবারের প্রতি আস্থা।
অরূপবাবু কিন্তু শুরু থেকেই চাল বিক্রেতা হতে চাননি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যে পড়াশোনা করা এই মানুষটি দীর্ঘদিন বিভিন্ন এনজিও-র সঙ্গে যুক্ত থেকে শিশু অধিকার, শিক্ষা, স্বনির্ভর গোষ্ঠী এবং গ্রামীণ শিল্প নিয়ে কাজ করেছেন। কিন্তু করোনা লকডাউনের সময় তিনি সিদ্ধান্ত নেন, কৃষক ও ক্রেতাদের মধ্যে দূরত্ব কমাতে খাদ্য ব্যবসায় নামবেন।
অরূপবাবুর কথায়, “এই দোকান আসলে আমার ছিল না। আমার বন্ধু প্রদ্যুৎ নাগের বইয়ের দোকান ছিল এটি। ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে একটি গাছ পড়ে দোকানটি ভেঙে যায়। তারপর আমরা দু’জনে মিলে কিছু বইয়ের পাশাপাশি এই ছোট্ট জায়গা থেকে জৈব পণ্য বিক্রি শুরু করি।”
তার মতে, অতিমারি মানুষের চিন্তাধারা বদলে দিয়েছে। “মানুষ এখন স্বাস্থ্যের বিষয়ে অনেক বেশি সচেতন। আমি বহু বছর গ্রামে কাজ করেছি। লকডাউনের সময় মনে হল, খাবারের ওপর জোর দিলে মানুষের জন্য কিছু অর্থবহ কাজ করা সম্ভব।”
অরূপবাবুর দোকান ‘মেঠো’-তে মেলে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের দেশি ও প্রায় হারিয়ে যাওয়া চালের জাত, যা সরাসরি কৃষক গোষ্ঠী থেকে সংগ্রহ করা হয়। নেই কোনো চাকচিক্যময় প্যাকেজিং বা লেবেল—শুধুই সাধারণ খাদ্যসামগ্রী।
এখানে পাওয়া যায় সুন্দরবনের দুধেশ্বর, কর্পূরকান্তি, লীলাবতী, কনকচুর; বর্ধমানের গোবিন্দভোগ ও রাধাতিলক; বাঁকুড়ার দুধেশ্বর। এই চালের অনেকগুলোই ঢেঁকি-ছাঁটা, অপরিশোধিত এবং রাসায়নিকমুক্ত।
হাসতে হাসতে অরূপবাবু বলেন, “কখনও কখনও আমার নিজেরই মনে থাকে না কত রকম চাল আছে। জায়গা ছোট, আর এই শস্যগুলো খুব যত্ন চায়। সংরক্ষণ ঠিকভাবে না করলে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।”
চালের পাশাপাশি দোকানে রয়েছে মশলা, ডাল, সরষের তেল, নারকেল তেল, মুড়ি, ছাতু এবং হাতে তৈরি সাবান ও পরিষ্কারক।
তবে ‘মেঠো’ কোনোভাবেই সুবিধাজনক বা তৎক্ষণাৎ ডেলিভারির ধারণায় বিশ্বাসী নয়। অ্যাপ-ভিত্তিক কেনাকাটার দ্রুততার বিপরীতে দাঁড়িয়ে এই দোকান ধীরলয়ের জীবনযাপনে, বাস্তব এবং সচেতন উপভোক্তা ব্যবস্থার কথা বলে।
অরূপবাবুর কথায়, “বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চাল নিয়ে আসা খুব কঠিন। কলকাতায় ২ কেজি চাল আনতে যে খরচ হয়, ৫০ কেজির ক্ষেত্রেও প্রায় একই। কিন্তু ৫০ কেজি বহন করা সবসময় সম্ভব হয় না।”
তিনি বড় পরিমাণে বা ঝকঝকে প্যাকেজিংয়ে পণ্য বিক্রি করেন না। তার কাছে বড় বিষয় হল—জৈব খাদ্যকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনা।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আমরা বিষ খাচ্ছি কেন? সিগারেটের প্যাকেটে লেখা থাকে এটি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, কিন্তু প্রতিদিন যে খাবার খাচ্ছি, তা নিয়ে কি কেউ ভাবছে?”
অরূপবাবুর মতে, শহরে জৈব খাদ্যের ধারণা অনেকটাই বিকৃত হয়েছে। “মানুষ ভাবে জৈব মানেই দামি। কারণ বড় বড় কোম্পানিগুলো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। আমার লক্ষ্য বড় মুনাফা নয়। যদি ১০০টি পরিবারও ন্যায্য দামে বিশুদ্ধ চাল, ডাল, তেল পায়, সেটাই বড় সাফল্য।”

‘মেঠো’ শুধু একটি দোকান নয়, এটি জৈব চাষিদের পাশে থাকার এবং খাদ্য সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবনের এক প্রচেষ্টা। অরূপবাবু ছোট কৃষক গোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি কাজ করেন, যাতে তারা ন্যায্য দাম পান এবং একই সঙ্গে ক্রেতার কাছেও দাম থাকে সহনীয়।
তার লক্ষ্য ব্যাপক বিস্তার নয়, বরং একটা সুস্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলা। “স্থানীয় ব্যবহার না বাড়লে এই উদ্যোগ টিকবে না। আমাদের এখানে কৃষকরা কষ্ট পাচ্ছেন, অথচ খাবার হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে আসছে—এটা হওয়া উচিত নয়।”
‘মেঠো’ নামটিই তার দর্শনকে প্রতিফলিত করে—মাটির সঙ্গে সংযোগ, শিকড়ের প্রতি টান। অরূপকুমার দাসের কাছে এটি শুধু একটি দোকান নয়, বরং শিল্পায়িত খাদ্যব্যবস্থা, অতিরিক্ত প্যাকেজিং এবং বাহারি দোকানের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ।


