Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

এমজি রোডে ট্রাফিক সামলান পদ্মশ্রীপ্রাপ্ত, ৬৯ বছরের ‘বিপিন দা’- পাওনা কেবল মানুষের আশীর্বাদ

খাটের কোণে ধুলো-মাখা সার্টিফিকেট, বিছানায় ছারপোকার উপদ্রব, রান্নাঘরে বহু বছরের অত্যাচার সহ্য করা পুরোনো স্টিলের গ্লাসে পরিবেশিত চা… আর তার পাশেই রাখা পদ্মশ্রী পদক। প্রায় ৭০ বছরের বিপিন গনাত্রার জীবনে মোটেও সেই আরামদায়ক বার্ধক্যের ছবি নেই, যা সাধারণত এই বয়সে এসে যে কোন মানুষ কল্পনা করেন।

তবে দেবেন্দ্র মল্লিক স্ট্রিটের ভেতরে তাঁর ছোট্ট ঘর থেকে কয়েক পা বাইরে বেরোলেই বদলে যায় দৃশ্যপট।
মধ্য কলকাতার এমজি রোডের মোড়ে তিনি এক স্থানীয় নায়ক—সম্মাননীয়, শ্রদ্ধেয় এবং সবার প্রিয় ‘বিপিন দা’।
সীমিত আয়ে দিন গুজরান করা সাধারণ এক বৃদ্ধ বলেই তাঁকে মনে হতে পারে প্রথম দর্শনে। কিন্তু চোখে যা ধরা পড়ে, তাঁর গল্প তার চেয়ে অনেকটাই বড়। ২০১৭ সালে স্বেচ্ছাসেবী অগ্নিনির্বাপণ কর্মকাণ্ডের জন্য তিনি পান ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান পদ্মশ্রী। দেশজুড়ে শিরোনাম, করতালি ও স্বীকৃতি এসেছিল তাঁর ঝুলিতে। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে ইন্টারনেট বা সংবাদমাধ্যম আর খুব একটা তাঁর কথা বলে না। তবু তিনি থেমে যাননি। এখনও নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সমাজসেবাতেই নিবেদিত রয়েছেন।
“দমকলকর্মী হিসেবে অন্তত ১০০ জনের প্রাণ বাঁচিয়েছি। এখন কলকাতা পুলিশের হয়ে ট্রাফিক সামলাই। ২০১০ সাল থেকেই অগ্নিনির্বাপণের পাশাপাশি এই কাজ করছি,” গুজরাটি টান মেশানো বাংলায় বললেন গণাত্রা। কলকাতা ট্রাফিক পুলিশের আস্থাভাজন হয়ে ওঠার পেছনেও রয়েছে তাঁর নিঃস্বার্থ সেবার মানসিকতা।

“দুর্গাপুজোর সময় মহম্মদ আলি পার্কে ট্রাফিক সামলানো শুরু করি। লক্ষ লক্ষ মানুষ ওই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতেন। তখন আইপিএস দময়ন্তী সেন, আইজি জুলফিকার আহমেদ-সহ প্রশাসনের অনেকে দেখেন আমি কীভাবে ট্রাফিক সামলাচ্ছি,” স্মৃতিচারণ করেন বিপিনদা।

“ওরা এতটাই মুগ্ধ হন যে পরে পুলিশকর্মীদের সঙ্গে আমাকেও ভিড় সামলানোর দায়িত্ব দেন।” দুর্গাপুজোর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা দেখালেও অনিয়মিত আয়ের সমস্যা তাঁকে সবসময় তাড়া করেছে। সাহায্যের প্রস্তাব এসেছিল, কিন্তু দান হিসেবে কিছু নিতে চাননি তিনি।

“একদিন দময়ন্তী সেন আমাকে অফিসে ডাকেন। নিজের এটিএম কার্ড এগিয়ে দিয়ে বলেন, ‘এখানে চাকরি করতে না চাইলে অন্তত এটা রাখুন, প্রতি মাসে ১,০০০ টাকা করে সম্মানী তুলে নেবেন।’ আমি না করে দিই,” বললেন গণাত্রা। “আমি কখনও টাকার জন্য কাজ করিনি। সমাজকর্মী হতে চেয়েছি। টাকা নিলে হয়তো শহরের সেবা করার দিক থেকে মন সরে যেত।”

বিপিনদার কথায়, সেই সময়ই দময়ন্তী সেন তাঁর নথিপত্র কেন্দ্রের কাছে পাঠিয়ে পদ্মশ্রীর জন্য সুপারিশ করেন।
৬৯ বছর বয়সেও অবসরের কথা ভাবেন না তিনি। “আমি পেশাদার কর্মী নই, তাই অবসরের প্রশ্নই ওঠে না। আমার ইচ্ছাশক্তি আর মানসিক জোরই আমাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। ভালো কাজ করলে মানুষের যে আশীর্বাদ পাওয়া যায়, সেটাই আমাকে প্রতিদিন চালিয়ে নিয়ে যায়,” বললেন তিনি।

মানুষের আশীর্বাদ তাঁর শক্তি হলেও পরিবারের প্রসঙ্গ উঠতেই স্পষ্ট অস্বস্তি ধরা পড়ে মুখে। অসুস্থতা হোক বা দৈনন্দিন জীবন—সবই একা সামলান নিজের ছোট্ট ঘরে। “আমার পরিবার নেই। গুজরাতে অনেক আত্মীয় আছেন, কিন্তু খুব কম কথা হয়। তাদের সঙ্গে মানসিক সংযোগ খুঁজে পাই না। কলকাতার মানুষের মাঝে যে আন্তরিকতা দেখি, সেটা অন্য কোথাও খুব একটা খুঁজে পাইনি,” বললেন তিনি।
ধার করা বাঁশি থেকে শুরু করে ফায়ারফাইটারের পোশাক—প্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছুই উপহার পেয়েছেন বিপিনদা। একদিকে ডিজিটালাইজেশন, অপর দিকে বার্ধক্যের ফলে তাঁর নিজস্ব পেশা ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ কমে যাওয়ায় তাঁর উপার্জনও প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে, জানালেন তিনি।

তবে তাঁর আসল সম্পদ মানুষের ভালোবাসা। এমজি রোড মোড়ে দাঁড়ালে প্রায় প্রতি মিনিটেই কেউ না কেউ এসে খোঁজ নেন, চা এনে দেন, জল ধরিয়ে দেন। “অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস উপেন বিশ্বাস আমাকে ইউনিফর্ম দিয়েছেন। অনেক স্নেহও দিয়েছেন। বন্ধুরা সেফটি হেলমেট আর বাঁশি কিনে দিয়েছে,” গর্বের সঙ্গে বললেন গণাত্রা।

“বন্ধুরা আমাকে মাসে সাত হাজার টাকা দেয়। এটাই এখন আমার একমাত্র আয়। লালবাজারের একটি গুজরাটি হোটেল আমাকে বিনামূল্যে দুপুর আর রাতের খাবারের পাস দিয়েছে। সেখানেই খাই,” যোগ করলেন তিনি।
যিনি একদিন পদ্মশ্রী পদক পেয়েছেন, আজ তিনি যেন দুটি জীবন একসঙ্গে বাঁচেন—একদিকে উৎসাহী সমাজসেবক, অন্যদিকে বার্ধক্য, ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য, অর্থকষ্ট আর বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করা এক প্রবীণ মানুষ।
“শরীর যতদিন সায় দেবে, ততদিন কাজ করে যাব। ভালো খাবার খাওয়ার চেষ্টা করি, কোনওরকম নেশা করি না,” ট্রাফিক সামলাতে সামলাতে বাঁশি ফুঁকে ফুঁকে কর্কশ হয়ে যাওয়া গলায় বললেন বিপিনদা।