Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

ঘরের খাবার’ অন দ্য গো: কলকাতার গৃহিণীদের ভালোবাসায় তৈরি স্বাস্থ্যকর রেডি-টু-ইট মিল

বিদেশে বা ভ্রমণের সময় নির্ভরযোগ্য নিরামিষ খাবার পাওয়া বহু ভারতীয়ের কাছেই একটি বড় সমস্যা। এই সমস্যার সমাধান নিয়ে এগিয়ে এসেছে কলকাতাভিত্তিক স্টার্টআপ স্পাইস আপ ফুডস (Spice Up Foods)। অমিত মুরারকা ও শালু মুরারকার উদ্যোগে এবং সহ-প্রতিষ্ঠাতা মধু গোয়েলের সঙ্গে গড়ে ওঠা এই ব্র্যান্ড ফ্রিজ-ড্রায়েড, প্রিজারভেটিভ-মুক্ত ঘরোয়া খাবারের মাধ্যমে রেডি-টু-ইট বাজারে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করছে। ইতিমধ্যেই তারা ১৫,০০০-এরও বেশি খাবার পরিবেশন করেছে, ভারত ও বিদেশ—দু’জায়গাতেই।

৩৮ বছর বয়সি গৃহিণী নেহার অভিজ্ঞতাই এই সমস্যার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। তিনি বলেন, “বিদেশে ব্যবসা সংক্রান্ত সফরের সময় আমার স্বামী প্রায়ই নিরামিষ খাবার খুঁজে পেতেন না। অনেক সময় উপযুক্ত কিছু না পেয়ে তিনি খাওয়াই বাদ দিতেন।”

এই অভিজ্ঞতা শুধু নেহার নয়—বিদেশে থাকা ছাত্রছাত্রী, চাকুরিজীবী কিংবা পরিবার থেকে দূরে থাকা মানুষদের কাছেও এটি পরিচিত এক বাস্তবতা।
ভ্রমণের সময় স্বাস্থ্যকর, পুষ্টিকর এবং ঘরের মতো স্বাদের খাবার পাওয়া সহজ নয়। বাজারে থাকা অধিকাংশ রেডি-টু-ইট খাবারেই থাকে অতিরিক্ত প্রিজারভেটিভ, কৃত্রিম ফ্লেভার ও রাসায়নিক উপাদান, যা হজমের সমস্যা থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই অনেকেই এমন খাবারের খোঁজ করেন, যা ঘরের স্বাদ ও পুষ্টি—দুটোই বজায় রাখবে। সেরকম এক বিদেশ সফরেই এই ভাবনার সূত্রপাত।

কলকাতার ভ্রমণপ্রেমী দম্পতি অমিত ও শালু মুরারকা নিজেরাও বিদেশে ভ্রমণের সময় এই সমস্যার মুখোমুখি হন। ২০১৬ সালে সুইজারল্যান্ড সফরের সময় তারা প্রথম ডিহাইড্রেটেড খাবারের সঙ্গে পরিচিত হন। অমিত স্মৃতি থেকে বললেন, “আমরা দেখেছিলাম একজন ভ্রমণকারী শুধু গরম জল যোগ করেই রেডি-টু-ইট স্যুপ খাচ্ছেন। তিনি জানালেন, এটি ডিহাইড্রেটেড খাবার এবং বহু বছর ধরে তিনি এটি ব্যবহার করছেন।”

এই অভিজ্ঞতাই তাদের মাথায় নতুন একটি ভাবনার জন্ম দেয়—এমন খাবার তৈরি করা, যা একদিকে সহজ ও বহনযোগ্য হবে, অন্যদিকে স্বাস্থ্যকর ও ঘরোয়া স্বাদ বজায় রাখবে।
স্পাইস আপ ফুডস-এর জন্ম সেই ধারণা থেকেই….
এই ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে অমিত ও শালু সিদ্ধান্ত নেন একটি ব্র্যান্ড গড়ে তোলার, যার মূল লক্ষ্য হবে প্রিজারভেটিভ-মুক্ত, ঘরে তৈরি খাবার পৌঁছে দেওয়া। অমিতের চার্টার্ড ফিনান্সিয়াল অ্যানালিস্ট হিসেবে অভিজ্ঞতা এবং শালুর কুকারি ওয়ার্কশপ পরিচালনার অভিজ্ঞতা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই তৈরি হয় স্পাইস আপ ফুডস-এর ভিত্তি।

শালু বলেন, “আমরা এমন খাবার দিতে চেয়েছিলাম, যা ঘরের মতো স্বাদ দেবে, আবার স্বাস্থ্য বজায় রেখেই দীর্ঘদিন ভালো থাকবে।”

এই লক্ষ্য পূরণে তারা বেছে নেন ফ্রিজ-ড্রাইং প্রযুক্তি, যা প্রচলিত ডিহাইড্রেশন পদ্ধতির তুলনায় অনেক বেশি উন্নত।

ফ্রিজ-ড্রাইং প্রযুক্তি কেন আলাদা
ফ্রিজ-ড্রাইং এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে খাবারকে অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় জমিয়ে তার আর্দ্রতা সরিয়ে ফেলা হয়, কিন্তু খাবারের গঠন, টেক্সচার ও পুষ্টিগুণ অক্ষুণ্ণ থাকে। অমিত ব্যাখ্যা করেন, “এই প্রযুক্তি মহাকাশচারীদের খাবার সংরক্ষণেও ব্যবহার হয়, যাতে তারা দীর্ঘ সময় পুষ্টিকর খাবার পেতে পারেন।”

প্রক্রিয়াটি শুরু হয় গৃহিণীদের হাতে রান্না করা টাটকা খাবার দিয়ে। সেই খাবার –৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় জমিয়ে ভ্যাকুয়াম চেম্বারে রাখা হয়, যেখানে খাবারের ভেতরের বরফ সরাসরি বাষ্পে পরিণত হয়। ফলে খাবারটি শুকনো হলেও তার স্বাদ ও পুষ্টি বজায় থাকে। শুধু গরম জল যোগ করলেই খাবারটি আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে।
খাবারের ধরন অনুযায়ী তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হয়—চাটনি, ডাল বা রাজমার জন্য আলাদা আলাদা সেটিংস থাকে। প্রচলিত ডিহাইড্রেশনে যেখানে ৯২–৯৬ শতাংশ জল অপসারণ হয়, সেখানে ফ্রিজ-ড্রাইংয়ে ৯৯ শতাংশেরও বেশি জল সরানো সম্ভব।

২০১৮ সাল থেকে প্রায় চার বছর ধরে তারা ফ্রিজ-ড্রাইং প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করেন। এই সময়ে তারা শুধুমাত্র স্থানীয় বাজারেই পরিষেবা দিতেন। পাশাপাশি, নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী একটি কাস্টমাইজড ফ্রিজ-ড্রাইং মেশিন তৈরি করতে কাজ করেন।

অমিত বলেন, “বাজারে বিদ্যমান মেশিনগুলি আমাদের খাবারের জন্য উপযুক্ত ছিল না। তাই আমাদের নির্দিষ্ট মাপ, তাপমাত্রা ও ট্রে সাইজ অনুযায়ী মেশিন কাস্টমাইজ করতে হয়েছে।”

২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে, সমস্ত পরীক্ষানিরীক্ষা শেষে তারা সারা ভারতের জন্য অর্ডার নেওয়ার উদ্দেশ্যে নিজেদের ওয়েবসাইট চালু করেন।

স্পাইস আপ ফুডস-এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো গৃহিণীদের সঙ্গে তাদের কাজ করার পদ্ধতি। শুরুতে পরিবারের সদস্যরাই রান্না করলেও, বড় পরিসরে কাজ করতে গিয়ে তারা হোম কুকদের যুক্ত করেন। রান্নার আগে উপকরণের মান যাচাই করা হয়, রান্নার পর খাবার সিল করা পাত্রে করে ইউনিটে আনা হয়। প্রয়োজনে অ্যাপ বাইকের মাধ্যমে পিক-আপের ব্যবস্থাও করা হয়। বর্তমানে প্রায় ১০ জন গৃহিণী এই স্টার্টআপের সঙ্গে যুক্ত, যারা বাড়ি থেকেই সুবিধাজনক সময়ে কাজ করে ন্যায্য আয় করছেন। ৫০ বছর বয়সি অলকা বলেন, “এই কাজ আমাকে শুধু আর্থিক স্বাধীনতাই দেয়নি, বরং নিজের পরিচয় নতুন করে খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে।”

স্পাইস আপ ফুডস সম্পূর্ণ FSSAI সার্টিফায়েড এবং কঠোর খাদ্য নিরাপত্তা বিধি মেনে চলে। প্রতিটি ব্যাচ পরীক্ষা করা হয় এবং নির্দিষ্ট SOP অনুসরণ করা হয়। খাবারগুলির দাম ১৮০ থেকে ২৩০ টাকার মধ্যে এবং সেগুলি একক পরিবেশনযোগ্য টাবে পাওয়া যায়। প্রতিটি টাবের সঙ্গে মাপার কাপ ও চামচ দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের শুরু থেকে তারা ৩০ লক্ষ টাকারও বেশি রাজস্ব অর্জন করেছে এবং ভারত ও আন্তর্জাতিক বাজার মিলিয়ে ১৫,০০০-এরও বেশি খাবার সরবরাহ করেছে। নেহা বলেন, “এখন আমার স্বামী সবসময় কয়েকটি টাব সঙ্গে রাখেন। গরম জল দিলেই সাত মিনিটে খাবার প্রস্তুত—আর আমার চিন্তা থাকে না।” শেষে শালু বলেন, “ভালো খাবারের প্রাণ থাকে ভালোবাসায় রান্না করা হাতে। আমাদের লক্ষ্য সেই ঘরের অনুভূতিটুকু মানুষকে পৌঁছে দেওয়া।” ভবিষ্যতে রেডি-টু-ইট স্ন্যাকস বিভাগে প্রবেশের পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।