Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

মহাবিশ্বের একক প্রাণধারী নীলগ্রহের গল্প শোনালেন সুনীতা উইলিয়ামস

মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে দেখে সুনীতা উইলিয়ামস যা বুঝেছিলেন, তা মানচিত্রে ধরা পড়ে না। মহাকাশের কক্ষপথ থেকে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে সুনীতা উইলিয়ামস কোনো মানচিত্রে আঁকা সীমারেখা দেখেননি। তিনি দেখেছিলেন একটিমাত্র নীল গ্রহ—যা সব মানুষের, সব প্রাণীর, সব জীবনের একমাত্র ঘর। প্রায় তিন দশক ধরে সুনীতা উইলিয়ামস মহাকাশে মানুষের সাহস ও সক্ষমতার সম্ভাব্য সীমারেখা পেরিয়েছেন বার বার, ছুঁয়েছেন নতুন সীমানা। কিন্তু মহাকাশ থেকে তিনি যে শিক্ষা নিয়ে ফিরেছেন, তা কোনও রেকর্ড বা কক্ষপথের গল্প নয়—তা হলো দৃষ্টিভঙ্গির শিক্ষা।
কেরল লিটারেচার ফেস্টিভ্যালে(২০২৬), উপস্থিত শ্রোতাদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি ভাগ করে নেন, কীভাবে মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে একক জীবন্ত সত্তা হিসেবে দেখার অভিজ্ঞতা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে—সংঘাত থেকে সহাবস্থান পর্যন্ত সব বিষয়ে।

মহাকাশ থেকে কোনো দেশ দেখা যায় না। দেখা যায় শুধু বাতাস আর জলের সেই কমনীয় আবরণ, যা আমাদের সবাইকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আর এই দৃশ্য দেখলে প্রশ্ন জাগে—আমরা কেনই বা এত তর্ক, বিবাদ করি?
পরে একটি পডকাস্টে সাক্ষাৎকার চলাকালীন সুনীতা উইলিয়ামসকে এমন একটি প্রশ্ন করা হয়, যা বহু মানুষেরই কৌতূহলের বিষয়:

মহাকাশ থেকে ভারতকে কেমন দেখায়?
সুনীতা কোনো নাটকীয় বর্ণনায় যাননি। বরং তিনি শুরু করেছিলেন অকপট স্বীকারোক্তি দিয়ে—মহাকাশ থেকে ভারতের ছবি তোলা সব সময় সহজ নয়।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, আবহাওয়া ও বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থার ওপর নির্ভর করে ভারত অনেক সময় কুয়াশাচ্ছন্ন দেখায়। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে দৃশ্যমানতা প্রতিনিয়ত বদলায়—মেঘ, আর্দ্রতা ও ঋতুচক্রের প্রভাবে। কোনো কোনো সময় দেখা যায় স্পষ্ট ও শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্য, আবার কোনো কোনো সময় নিচের ভূদৃশ্য ঝাপসা হয়ে যায়।

তবে পরিস্থিতি অনুকূল হলে সেই দৃশ্য ভোলার নয়। সুনীতা জানান, রাতে ভারতকে দেখতে লাগে “অসাধারণ”। তাঁর নজর কেড়েছিল শুধু শহরের আলো নয়, বরং আলোগুলোর পারস্পরিক সংযোগ। অন্য অনেক অঞ্চলে শহরের আলো যেখানে অন্ধকারের মাঝে বিচ্ছিন্ন বিন্দুর মতো লাগে, সেখানে ভারতের আলো যেন একটানা।

মহাকাশ থেকে শহর, জনপদ ও পরিবহণ করিডোর মিলেমিশে একটিমাত্র জ্বলজ্বলে বিষয়ে পরিণত হয়। আলোগুলো বিক্ষিপ্ত নয়- উজ্জ্বল সংযুক্ত।
“দেখতে লাগে সংযুক্ত স্নায়ুতন্ত্রের মতো”

সুনীতা উইলিয়ামসের বর্ণনার সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ এটাই , যখন তিনি ভারতের রাতের আলোকে মানুষের শরীরের স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন, জ্বলজ্বলে এই নকশা তাঁকে মানুষের দেহে স্নায়ুতন্ত্রের সংযোগ বোঝাতে ব্যবহৃত ছবিগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়—শাখায়িত, একে অপরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করা এবং ধারাবাহিকভাবে প্রবাহিত।
সুনীতা উইলিয়ামস তিনবার মহাকাশ সফর করেছেন, যা তাঁকে পৃথিবীর পরিবর্তন দেখার এক বিরল সুযোগ দিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, আলোয় এই তীব্র সংযুক্তির অনুভূতিটি বিশেষ করে তাঁর সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন সফরের সময় বেশি চোখে পড়েছে, আগের মিশনগুলিতে এতটা নয়। এই পর্যবেক্ষণ মানব পরিকাঠামোর উন্নয়নের দৃশ্যমান পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়—বিস্তৃত হতে থাকা শহর, বাড়তে থাকা পরিকাঠামো এবং ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতায়ন।

দিনের বেলায় ভারতকে কেমন দেখায়, সে বিষয়েও কথা বলেন সুনীতা। মহাকাশ থেকে স্থলভাগের রংগুলো স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। ভূপ্রকৃতির বৈচিত্র্য চোখে পড়ে, আর ভৌগোলিক গঠন যেন নিজের গল্প নিজেই বলে।
তিনি হিমালয়কে বর্ণনা করেন বিস্ময়কর এক সৃষ্টি হিসেবে। পাঠ্যবইয়ে টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষের প্রক্রিয়া আপাতদৃষ্টিতে বিমূর্ত মনে হতে পারে, কিন্তু মহাকাশ থেকে তাকালে এই পর্বতমালা স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয় প্লেটগুলোর মিলনবিন্দু—এক ধীর অথচ শক্তিশালী প্রক্রিয়া, যা যেন সময়কে স্হবির করে জমিয়ে রেখেছে। তিনি ভারতের উপকূলরেখা নিয়েও বলেন, বিশেষ করে পূর্ব উপকূল, যেখানে নদী ও সাগরের মিথস্ক্রিয়া প্রবল। মহাকাশ থেকে দেখলে নদীর মোহনায় তৈরি হয় রঙিন মিশ্রণ।

নিজের কর্মজীবনে মোট ৬০০ দিনেরও বেশি সময় মহাকাশে কাটানোর পর সুনীতা উইলিয়ামস সম্প্রতি নাসা থেকে অবসর নিয়েছেন—যা মানবজাতির মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
সুনীতা উইলিয়ামস যখন বলেন, ভারতের রাতের আলো “সংযুক্ত স্নায়ুতন্ত্রের” মতো, তখন তিনি কেবল উজ্জ্বলতা বা নান্দনিকতার কথাই বলেন না। এই রূপক আসলে মানব সংযোগের প্রতিফলন—পরিকাঠামো, শক্তির প্রবাহ, স্থিতিস্থাপকতা এবং ভাগ করে নেওয়া ছন্দ, যা মহাকাশ থেকে আলোকিত ভূদৃশ্যের মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়।

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন পর্যন্ত যাওয়া-আসা করে ২৭ বছরের অসাধারণ কর্মজীবন শেষে নাসা থেকে অবসর নেওয়া সুনীতা উইলিয়ামস আজ ভারতে দাঁড়িয়ে আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন—যা আমাদের যুক্ত করে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ; যা আমাদের বিভক্ত করে, তা নয়।