ড. রুক্মিণী কৃষ্ণমূর্তি— নামটি আজ ভারতের ফরেনসিক বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। দেশের প্রথম বিশিষ্ট নারী ফরেনসিক বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি শুধু প্রতিবন্ধকতা ভেঙে সাফল্যের শিখরে পৌঁছাননি, বরং বিজ্ঞানকে করেছেন ন্যায়ের হাতিয়ার। বর্তমানে তিনি মুম্বইয়ের হেলিক অ্যাডভাইসরি লিমিটেড-এর চেয়ারপারসন ও সিইও।
১৯৭৪ সালে, যখন ফরেনসিক বিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা অনেকেই জানতেন না, তখনই রুক্মিণী কৃষ্ণমূর্তি প্রবেশ করেন এই চ্যালেঞ্জিং পেশায়। সহকর্মীদের বিদ্রূপ ও প্রশ্ন— “একজন নারী ফরেনসিকসে কী করতে পারে?”— সেই সংশয়ের মাঝেই শুরু হয় তাঁর সংগ্রামের পথ।

প্রথমেই তাঁকে অপরাধস্থলে পাঠানো হয়নি কেবলমাত্র তিনি নারী বলে। কিন্তু তিনি প্রতিবাদ করেন দৃঢ় কণ্ঠে— “নিয়োগপত্র অনুযায়ী অপরাধস্থল পরিদর্শন আমার দায়িত্ব।” সেই প্রতিবাদই হয় তাঁর প্রথম জয়।
১৯৭৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মাতুঙ্গা ট্রেন অগ্নিকাণ্ডে ২৪ জন যাত্রী নিহত হন। চলন্ত ট্রেনে আগুন কীভাবে ছড়িয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়ে তদন্ত দল। রুক্মিণী কৃষ্ণমূর্তি দগ্ধ ধ্বংসাবশেষে কেরোসিনের চিহ্ন ও অর্ধপোড়া প্লাস্টিকের পাত্র উদ্ধার করে প্রমাণ করেন যে যাত্রী কেরোসিন বহন করছিলেন, যা সিগারেটের ছাই থেকে আগুন ধরে যায়। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালিয়ে তিনি প্রমাণিত সত্যের ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষকে জনপরিবহনে দাহ্য পদার্থ বহন নিষিদ্ধ করার পরামর্শ দেন— এবং সেই নিয়ম তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করা হয়।
১৯৯৩ সালে মুম্বই কেঁপে উঠেছিল ১২টি ভয়াবহ বোমা বিস্ফোরণে— ইতিহাসে যা “ব্ল্যাক ফ্রাইডে” নামে পরিচিত। সেই সময় রুক্মিণী কৃষ্ণমূর্তি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিস্ফোরক বিভাগকে। টানা তিন মাস তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করেছিলেন। তাঁর দলের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন শুধু ভারতেই নয়, আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোলসহ বিশ্বজুড়ে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল।
তিনি ভারতের বহু আলোচিত মামলার রহস্য উন্মোচন করেছেন— ৭/১১ ট্রেন বিস্ফোরণ, টেলগি স্ট্যাম্প জালিয়াতি, ড. মহাজন হত্যা, এবং নাগপুর নকশাল মামলা— প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানের সূক্ষ্ম প্রয়োগে অপরাধের অন্ধকারে এনেছেন আলোর রেখা।
২০০২ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত মহারাষ্ট্র সরকারের ডিরেক্টর, ডিরেক্টরেট অব ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরিজ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি মুম্বই, নাগপুর, পুনে, ঔরঙ্গাবাদ, নাসিক ও আমরাবতীতে ছয়টি আধুনিক ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন করেন।
তাঁর নেতৃত্বে ভারতের ফরেনসিক বিশ্লেষণে যুক্ত হয় আধুনিক প্রযুক্তি— ডিএনএ প্রোফাইলিং, সাইবার ফরেনসিক, স্পিকার আইডেন্টিফিকেশন, টেপ অথেন্টিকেশন, লাই ডিটেকশন, নারকো অ্যানালাইসিস ও ব্রেন সিগনেচার প্রোফাইলিং।
ড. কৃষ্ণমূর্তি সাতটি দেশে আন্তর্জাতিক ফরেনসিক সম্মেলনে অতিথি বক্তা হিসেবে যোগ দিয়েছেন এবং বহু কনফারেন্সে সভাপতিত্ব করেছেন। তাঁর প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা ১১০টি, আর পুরস্কারের ঝুলিতে রয়েছে ১২টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা— যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভারতের সেরা ফরেনসিক ডিরেক্টর অ্যাওয়ার্ড এবং আজীবন সম্মাননা পুরস্কার (ভারত সরকারের পক্ষ থেকে)।

তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন দেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ তদন্তে— ১৯৯৩ সালের মুম্বই বিস্ফোরণ মামলা, টেলগি স্ট্যাম্প জালিয়াতি, ঘাটকোপার, মুলুন্ড, গেটওয়ে অব ইন্ডিয়া ও ঝাভেরি বাজার বিস্ফোরণ, এবং ১১/৭ ট্রেন বিস্ফোরণ সহ একাধিক মামলায়।
ফ্রান্সের লিয়ঁ-এ ইন্টারপোলের আমন্ত্রণে তিনি আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন ভারতের ফরেনসিক দক্ষতা প্রদর্শনের জন্য।
দেশের ফরেনসিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচন হয়েছে তাঁর নেতৃত্বে।
২০০৯ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে মহারাষ্ট্র সরকারের অধীনে টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার হিসেবে তিনি মুম্বই, ঔরঙ্গাবাদ ও নাগপুরে ইনস্টিটিউট অব ফরেনসিক সায়েন্স প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ফরেনসিক বিজ্ঞানের ওপর দুটি গ্রন্থ ও বহু প্রবন্ধ রচনা করেছেন এবং জাতীয় পর্যায়ে ছাত্রছাত্রী, বিচারক ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের জন্য সম্মেলন আয়োজন করেছেন।
“হাজার মাইলের যাত্রা শুরু হয় একটি পদক্ষেপ দিয়ে”
এই বিশ্বাসেই ২০১১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন হেলিক অ্যাডভাইসরি লিমিটেড, ভারতের প্রথম ISO সার্টিফাইড বেসরকারি ফরেনসিক ও সম্পর্কিত সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান।
মুম্বইয়ে অবস্থিত এই ল্যাবরেটরি প্রযুক্তি ও মানের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের FBI ল্যাবরেটরির সমকক্ষ।
গুজরাট ফরেনসিক সায়েন্স ইউনিভার্সিটি হেলিক অ্যাডভাইসরিকে ফরেনসিক গবেষণার জন্য অনুমোদিত রিসার্চ সেন্টার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাঁর লক্ষ্য— ফরেনসিক বিজ্ঞানকে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া— প্রতিরোধমূলক, স…


