Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

গ্রিন হচ্ছে কলকাতা: সাইক্লিং ইকো সিস্টেমের জনপ্রিয়তায় নিউ টাউনে বাড়ছে সাইকেলের চাহিদা

৩ জুন বিশ্ব সাইকেল দিবস আসতে এখনও ঢের দেরি, এরই মধ্যে নিউ টাউনবাসীর জন্য খুশির খবর। শহরে চালু থাকা একটি সাইকেল-শেয়ারিং অ্যাপের দাবি, তারা যে সব শহরে পরিষেবা দেয়, তার মধ্যে নিউ টাউনেই সর্বাধিক সাইকেল রাইড নথিভুক্ত হয়েছে।

২০২৫-এর বিশ্ব সাইকেল দিবসের পরিসংখ্যান মতে, নিউ টাউনে পরিষেবা দেওয়া সাইকেল-শেয়ারিং অ্যাপটি জানিয়েছে—সব শহরের তুলনায় এই টাউনশিপেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক রাইড বুক হয়েছে। চার্টার্ড বাইক (Chartered Bike) একটি সাইকেল-শেয়ারিং অ্যাপ, যেখানে ব্যবহারকারীরা নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড থেকে সাইকেল নিয়ে গন্তব্যের কাছাকাছি যে কোনও স্ট্যান্ডে তা ফেরত দিতে পারেন। আহমেদাবাদ-ভিত্তিক এই সংস্থাটি প্রয়াগরাজ, ভোপাল, রাঁচি ও সুরাটের মতো শহরেও পরিষেবা দেয়। তবে ব্যবহারকারীর সংখ্যার নিরিখে ধারাবাহিক ভাবে এগিয়ে রয়েছে নিউ টাউন।
“আমাদের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ এর ১৮ মে শেষ হওয়া সপ্তাহে নিউ টাউনে মোট ২,৫৬৩টি রাইড নথিভুক্ত হয়েছে। আমরা যে সব শহরে কাজ করি, তার মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ,” জানালেন চার্টার্ড বাইকের সিটি ম্যানেজার সৌপ্তিক মুখোপাধ্যায়।

এক্ষেত্রে অবশ্যই মনে রাখা দরকার যে এই জনপ্রিয়তার কারণ, নিউটাউন এর নগরোন্নয়ন দপ্তর দ্বারা গড়ে তোলা সাইক্লিং ইকো-সিস্টেম। নিউটাউনের সবকটি সেক্টরেই রাস্তার পাশে ট্রাফিক গার্ডরেল, হলুদ- সবুজ রং ও সাইকেল এর চিন্হ সহ আলাদা করে সাইক্লিং বে আছে। যে রাস্তায় পথচারী ও সাইকেল ছাড়া মোটরসাইকেল এরও প্রবেশ নিষেধ। এছাড়াও প্রতিটি ট্রাফিক সিগনালে সাইকেল এর জন্য পৃথক ভাবে লাল-সবুজ আলো আছে আর আছে প্রতি সেক্টর এ সাইকেল ডকিং স্টেশন। যেখান থেকে নাগরিকরা অ্যাপের মাধ্যমে সামান্য ভাড়ার বিনিময়ে সাইকেল ব্যবহার করতে পারেন। সাথে আছে চব্বিশ ঘণ্টাই পরিষেবার ব্যবস্থা।
২০২০ সালে নিউ টাউনে ১০০টি সাইকেল ও পাঁচটি ডকিং স্টেশন নিয়ে পরিষেবা শুরু করে চার্টার্ড বাইক। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০০টি সাইকেল এবং ২৩টি স্ট্যান্ডে।

“সবচেয়ে জনপ্রিয় স্টেশনগুলি রয়েছে বিশ্ব বাংলা গেট, স্বপ্নভোর সিনিয়র সিটিজেনস পার্ক, ইকো আরবান ভিলেজ, অ্যাকশন এরিয়া-১-এ রিলায়েন্স ফ্রেশের কাছে, নিউ টাউন বাস টার্মিনাস এবং ওহাইও হাসপাতালের পাশে,” জানান মুখোপাধ্যায়।

অনেক সময় এমন হয় যে কিছু স্ট্যান্ডে অতিরিক্ত সাইকেল জমে যায়, আবার কিছু স্ট্যান্ড খালি হয়ে পড়ে। এই সমস্যা মেটাতে দিনে দু’বার কর্মীদের মাধ্যমে সাইকেল পুনর্বণ্টন করা হয়।

নিউ টাউনে এই পরিষেবার জনপ্রিয়তার আরও একটি অন্যতম কারণ একাধিক পর্যটন কেন্দ্রের উপস্থিতি।
“প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ জন নতুন ব্যবহারকারী পাই, যাঁরা হয়তো একবারই এই পরিষেবা ব্যবহার করেন। এঁরা সাধারণত ইকো পার্কে বেড়াতে আসা পর্যটক বা কাছাকাছি হোটেলে থাকা অতিথি। স্মার্ট সিটিতে এই অভিনব বাইক পরিষেবার কথা শুনে তাঁরা অ্যাপ ডাউনলোড করে আনন্দভ্রমণে বেরোন,” বলেন মুখোপাধ্যায়।
এই পরিষেবা ২৪x৭ চালু থাকে, দিন ও রাত জুড়েই ব্যবহারকারী রয়েছেন।

“ভোর ৪টে থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত মূলত প্রবীণ নাগরিকরা শরীরচর্চার জন্য সাইকেল চালান। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ছাত্রছাত্রী ও অফিসযাত্রীরাই বেশি থাকেন। দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত ব্যবসায়ী ও বহু দিনমজুর নারী এই পরিষেবা ব্যবহার করেন,” ব্যাখ্যা করেন তিনি। “বিকেল ৪টে থেকে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে শিশু ও তরুণরা বিনোদনের জন্য সাইকেল চালায়, অথবা কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার জন্য ব্যবহার করেন।”
সন্ধ্যা ৭টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত মূলত আনন্দভ্রমণের রাইড হয়। যদিও মধ্যরাত থেকে ভোর ৪টে পর্যন্ত ব্যবহার কম, এই সময়েই সাইকেলগুলি সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে। “একজনের জন্য নকশা করা হলেও, রাতের দিকে যুগল বা এমনকি তিনজন একসঙ্গে সাইকেল চালান, যার ফলে ক্ষতি হয়,” যোগ করেন তিনি। এধরনের বেশ কিছু অপারেশনাল অসুবিধা ও সমস্যা থাকলেও মোটের ওপর এই ব্যবস্থা সবদিক থেকেই যথেষ্ট কার্যকর, তাই আশাবাদী সবাই। তাই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও অগ্রগতি পাচ্ছে।

সাইকেলের ভাড়ার হার অনুযায়ী—
প্রথম ৩০ মিনিটের ভাড়া ১ টাকা ১৮ পয়সা, পরবর্তী ৩১ থেকে ৫৯ মিনিটের জন্য ৫ টাকা ৯০ পয়সা।
এর পর বিভিন্ন সময়সীমা অনুযায়ী আলাদা ভাড়ার হার প্রযোজ্য।
যদি কেউ ১৬ থেকে ২৪ ঘণ্টা সাইকেল ব্যবহার করেন, তবে ভাড়া হবে ৮২৬ টাকা এবং ২৪ ঘণ্টার বেশি হলে খরচ পড়বে ৫,৯০০ টাকা।
অ্যাপে সাইন-আপ করার সময় ব্যবহারকারীকে ৩০০ টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে জমা দিতে হয়, যেখান থেকে রাইডের ভাড়া ব্যবহার অনুযায়ী কেটে নেওয়া হয়। বর্তমানে ডকিং স্টেশনগুলি নিউ টাউনের মধ্যে প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে রয়েছে। তবে ব্যবহারকারীরা প্রায়ই সাইকেল নিয়ে সল্টলেকের পাঁচটি সেক্টর, পাশাপাশি কেষ্টপুর ও বাগুইআটি এলাকাতেও যান।

“সুখবৃষ্টি, ইকো স্পেস, গীতাঞ্জলি পার্ক এবং নজরুল তীর্থের কাছে নতুন স্ট্যান্ড বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এই বিষয়ে নিউ টাউন কলকাতা ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (এনকেডিএ)-র সঙ্গে আলোচনা চলছে,” জানান মুখোপাধ্যায়। সল্টলেক ও সেক্টর-ফাইভ এলাকাও এই পরিষেবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাজার। সেপ্টেম্বরের পরে সেখানে স্টেশন খোলার কথাও ভাবা হচ্ছে। “সাইকেল পরিবেশবান্ধব ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিবহণ ব্যবস্থা। এই পরিষেবা দিতে পেরে আমরা খুশি। আমাদের একটাই অনুরোধ—ব্যবহারকারীরা যেন সাইকেলগুলি যত্নের সঙ্গে ব্যবহার করেন,” বলেন সৌপ্তিক মুখোপাধ্যায়।