Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

কলকাতার ক্লাউড কিচেন বিপ্লব: রান্নাঘর থেকে স্টার্টআপে রূপান্তরের গল্প

কম পুঁজি, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আর স্থানীয় স্বাদ—খাবারের ব্যবসায় নতুন কর্মসংস্থানের মানচিত্র।
খাদ্য রসিকদের শহর কলকাতা, তাই খাবারের ব্যবসা করার সাধ কমবেশি সব মানুষেরই কখনও না কখনও থাকেই।
তবে একসময় কলকাতায় রেস্তোরাঁ খুলতে গেলে বড় জায়গা, মোটা লগ্নি আর দীর্ঘ অনুমতির প্রক্রিয়া ছিল বাধ্যতামূলক। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই ছবিটা দ্রুত বদলাচ্ছে।
দক্ষিণ কলকাতার ফ্ল্যাটবাড়ি থেকে শুরু করে সল্টলেক ও নিউটাউনের গলিপথ—শহরের নানা প্রান্তে নীরবে ছড়িয়ে পড়েছে ক্লাউড কিচেন সংস্কৃতি।
দোকান নেই, ডাইন-ইন নেই—কিন্তু অর্ডার আসছে মোবাইল অ্যাপে, আর খাবার পৌঁছচ্ছে গ্রাহকের দরজায়।
ক্লাউড কিচেন মূলত এমন রান্নাঘর, যেখানে শুধুমাত্র অনলাইন অর্ডারের জন্য খাবার তৈরি হয়। এই মডেলের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো কম খরচে ব্যবসা শুরু করা। কলকাতার বহু তরুণ-তরুণী, গৃহবধূ ও চাকরিজীবী এখন পার্টটাইম বা ফুলটাইমভাবে এই ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছেন।

এক গৃহবধূ উদ্যোক্তা বললেন, “আগে ভালো রান্না করলেও সেটার কোনও অর্থনৈতিক মূল্য ছিল না। এখন আমার বাড়ির রান্নাঘরই আমার অফিস।” তাঁর ক্লাউড কিচেন থেকে প্রতিদিন ঘরে তৈরি বাঙালি খাবার, কিটো ডায়েট মিল ও হোমস্টাইল বিরিয়ানি সরবরাহ হচ্ছে।
ডিজিটাল ফুড ডেলিভারি অ্যাপ এই বিপ্লবের প্রধান চালিকা শক্তি। অ্যাপেই মেনু, দাম, রিভিউ—সব কিছু দেখা যায়। ফলে ছোট উদ্যোগও বড় ব্র্যান্ডের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ডেমোক্র্যাটাইজেশন অফ ফুড বিজনেস—যেখানে স্বাদই আসল সম্পদ।
কলকাতার ক্লাউড কিচেনগুলোর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো স্থানীয় স্বাদের পুনরুজ্জীবন। শুক্তো, পান্তা–ভাত, চিংড়ির মালাইকারি, ডালনা—এই সব ঘরোয়া পদ আজ আবার জনপ্রিয় হচ্ছে, কারণ মানুষ ঘরের খাবারের স্বাদ খুঁজছেন।

এই মডেল কর্মসংস্থানও তৈরি করছে। রান্নার পাশাপাশি ডেলিভারি কো–অর্ডিনেশন, কনটেন্ট, সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং—সব মিলিয়ে নতুন ধরনের কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কথা হচ্ছিল, হোম শেফ, সায়নী সেনগুপ্তের একটি উদ্যোগ, ‘গুজবেরি’ কে নিয়ে।
২০২১ সালে কোভিডের ঢেউয়ের সময় একটি মর্মান্তিক ক্ষতির ঘটনা সায়নী সেনগুপ্তকে তার নিজের কোভিড কেয়ার হাই প্রোটিন খাবারের পরিকল্পনা শুরু করতে অনুপ্রাণিত করে। তারপর থেকে গুজবেরি বিভিন্ন ধরনের মাসিক পপ-আপ মেনু সরবরাহ করে আসছে।
সেনগুপ্ত বলেন, “গুজবেরি ঐতিহ্যবাহী থেকে শুরু করে একেবারে ভিন্নধর্মী খাবার তৈরি করে, যেমন সাধারণ বাঙালি ও বাংলাদেশি থেকে পার্সি, ইরানি, পেশোয়ারি, নেপালি, বিহারি থেকে সিঙ্গাপুরের হকার মার্কেটের স্ট্রিট ফুড এবং উদ্ভাবনী ফিউশন খাবার।”

বৈচিত্র্যই তার প্রধান বৈশিষ্ট্য। তিনি বলেন, “আমি এমনকি একক খাবার, পার্টি, সামাজিক ও কর্পোরেট অনুষ্ঠান, এমনকি বাইরের শহরের ক্যাটারিংয়ের জন্যও মেনু কাস্টমাইজ করি। আমার বেশ কিছু জনপ্রিয় খাবার আছে, যেমন খাঁটি চম্পারন, মুঘলাই চাপ, রাওয়ালপিন্ডি গোশত রোস্ট, নেপালি চোইলা, বাংলাদেশি ভর্তা, কোরিয়ান বুলগোগি (বারবিকিউ), স্টার ফ্রাই, ফেসেঞ্জুন (ইরানি স্টু), পার্সিয়ান মেগু পোলো, পেশোয়ারি মগজ মশলা, পার্সি পাত্রানি, প্রিজারভেটিভ-মুক্ত আমিষ আচার ইত্যাদি।”
বর্তমানে সেনগুপ্ত কেষ্টপুরের নিজের বাড়ির রান্নাঘর থেকেই কাজ করেন এবং রবিবার তার বাবা-মা ও ভাই তাকে কিছুটা সাহায্য করেন। তিনি তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানিয়ে বলেন, “সম্ভবত অদূর ভবিষ্যতে আমি প্রতি মাসের জন্য একটি নির্দিষ্ট মেনু রাখব। দুর্গাপূজার পর আমি আমার রান্নাঘর দক্ষিণ কলকাতায় স্থানান্তরিত করেছি। আমরা পুরো কলকাতা জুড়ে ডেলিভারি করি এবং শীঘ্রই দেশব্যাপী ডেলিভারি শুরু করব।”
আরেক ক্লাউড কিচেন এর মালিক সুর্যেন্দ্র চক্রবর্তী।

তার মিশ্র বংশপরিচয়—বাঙালি বাবা এবং ভুটানি মা—এই পেশাদার শেফকে দুটি রন্ধনশৈলীর সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
তিনি ২০১৬ সালে নিজের উদ্যোগ শুরু করেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “পেশাগতভাবে আমি একজন শেফ এবং আমি আমার গ্রাহকদের অনন্য কিছু পরিবেশন করতে চেয়েছিলাম। এটিই আমাকে নিজের রান্নাঘর খুলতে অনুপ্রাণিত করেছে। আমার বাবা-মা উভয়ের ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে, আমার খাবার মূলত সিলেটি, ভুটানি, নেপালি, বার্মিজ এবং অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান খাবারের উপর ভিত্তি করে তৈরি।”
চক্রবর্তী সাধারণত প্রতি তিন মাস অন্তর একটি পপ-আপ আয়োজন করেন। “কখনও কখনও গ্রাহকরা ফোন করেন এবং আমি পার্টি বা অনুষ্ঠানের জন্য তিন বা চার কোর্সের মেনু সাজেস্ট করি।”
তিনি বর্তমানে ছয় সদস্যের একটি দল নিয়ে নিজের বাড়ি থেকে কাজ করেন এবং সর্বনিম্ন পাঁচ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ জনের জন্য ডেলিভারি পরিষেবা প্রদান করেন।

একইরকম ভাবে সাক্ষী সুরেকা বা পল্লবী খৈতানদের মত হোম শেফরাও বাড়ির রান্নাঘর থেকেই নিজেদের জীবন ও জীবিকার সংস্থাপণ খুঁজে পেয়েছেন।

তবে চ্যালেঞ্জও আছে—খাদ্য নিরাপত্তা, লাইসেন্স, কাঁচামালের দাম ও অ্যাপ কমিশন ইত্যাদি নিয়ে ক্রমাগত কাজ করে যেতে হয়।
তবুও উদ্যোক্তারা বলছেন, শিখে নিয়ে এগোলে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
কলকাতার ক্লাউড কিচেন কেবল একটি ব্যবসার মডেল নয়—এটি প্রমাণ করছে, শহরের প্রতিটি রান্নাঘরেই লুকিয়ে থাকতে পারে একটি স্টার্টআপ।