বিল্ডিং নকশা করা থেকে গ্রিন লিভিং—স্থপতি নয়না প্রেমনাথ আজ অনুপ্রাণিত করছেন প্রায় ৮০ হাজার ভারতীয়কে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে বাঁচতে। তাঁর সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ও আপসাইক্লিং ব্র্যান্ড ‘দ্য গ্রিন সার্কেল’ দেখিয়ে দিচ্ছে, ছোট ছোট অর্থবহ সিদ্ধান্তই বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
ডিগ্রির পথ ধরেই যে সবসময় ক্যারিয়ার এগোতে হবে—এমনটা হয় না অনেক ক্ষেত্রেই । একজন স্থপতি হিসেবে ইঁট-সিমেন্ট এর কংক্রিট বাড়ির নকশা দিয়ে শুরু করলেও, শেষ পর্যন্ত সুস্থ ও সুস্থায়ী অভ্যাসে গড়া জীবনধারার ‘আবাসস্থল’ তৈরিও ক্যারিয়ার হয়ে ওঠে।
নকশার কাগজে ডুবে থাকা কেউ যে একদিন হাজারো মানুষকে বর্জ্যহীন জীবনে উদ্বুদ্ধ করবেন—কে ভেবেছিল?
নয়না প্রেমনাথের ক্ষেত্রে সাসটেনেবল উন্নয়ন কোনো হঠাৎ উড়ে আসা ভাবনা ছিল না; বরাবরই তা তাঁর স্থাপত্য নকশার অংশ ছিল। স্থাপত্যবিদ্যা পড়ার সময় থেকেই তাঁর মন ঝুঁকেছিল সচেতন জীবনযাপনের দিকে।
মৃৎ-স্থাপত্য নিয়ে তাঁর গবেষণা-প্রবন্ধ এবং ভারতের হস্ততাঁত শিল্প পুনরুজ্জীবনের ওপর থিসিস—এই দুটিই ভবিষ্যতে তাঁর কর্মজীবনে সাসটেনেবল কর্মপথের উদ্দেশ্যকে প্রতিফলিত করেছে।
বাড়ি থেকেই শুরু হয়েছিল এই চর্চা। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে নয়না প্রেমনাথ একজন স্থপতি হিসেবে নকশা তৈরির কাজ করতেন। কিন্তু ২০১৮ সাল নাগাদ তিনি বুঝতে পারেন—তিনি আরও গভীরে পরিবর্তন আনতে চান; এমন অভ্যাস গড়তে চান যা পৃথিবীকে আরও বাসযোগ্য করবে।

স্থাপত্যের পাঠ তাঁকে কাঠামো ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে দৃঢ় ধারণা দিয়েছে, যা এখন কাজে লাগছে সাসটেনেবল জীবনধারা, জিরো-ওয়েস্ট লিভিং এবং পরিবেশসচেতন নকশা শেখাতে।
ইনস্টাগ্রামে তাঁর ৬২ হাজারের বেশি অনুসারী এবং ইউটিউবে ১৭ হাজার সাবস্ক্রাইবার রয়েছে। সময়ের সঙ্গে তাঁর কনটেন্ট তৈরির যাত্রা হয়েছে আরও পরিণত—শুরুতে তিনি পোস্ট করতেন মিউজিক কভার, পরে বিউটি ও লাইফস্টাইল কনটেন্ট; শেষে খুঁজে পান নিজের আসল উদ্দেশ্য—সাসটেইনেবিলিটি।
এখন তাঁর ছোট, প্রাণবন্ত ভিডিওগুলো মানুষকে প্রতিদিনের অভ্যাস নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে—থ্রিফট শপিং, ভেগান খাবার, কিংবা ঘরেই কম্পোস্টিংয়ের মতো অভ্যাস। প্রতিটি ভিডিওই যেন সহজ, বন্ধুসুলভ একটি গাইড—মজার গল্প বলার মাধ্যমে শেখায় সচেতনভাবে বাঁচার কৌশল।
‘আলটিমেট বিগিনারস গাইড টু জিরো-ওয়েস্ট লিভিং’, ‘হাউ টু স্টার্ট লো-ওয়েস্ট ইন ইন্ডিয়া’ কিংবা ‘৫টি জিরো-ওয়েস্ট সুইচ যা আজই করতে পারেন’—এমন কনটেন্ট নতুনদের জন্য হয়ে উঠেছে সাসটেনেবল জীবনের বাস্তব ও কার্যকর সূচনার কেন্দ্রবিন্দু।

জিরো-ওয়েস্ট জীবনের ‘গ্রিন সার্কেল’ সাসটেইনেবিলিটি ক্রিয়েটর হওয়ার পাশাপাশি নয়না একজন উৎসাহী উদ্যোক্তা। তাঁর আপসাইক্লিং ব্র্যান্ড ‘দ্য গ্রিন সার্কেল’ বাতিল টেক্সটাইলকে রূপ দেয় আকর্ষণীয় ও ব্যবহারযোগ্য পণ্যে—যা তুলে ধরে সার্কুলার ইকোনমির প্রতি তাঁর অঙ্গীকার।
এখানে নয়না শুধু বর্জ্য কমাচ্ছেন না, কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করছেন। স্ক্রাঞ্চি, কোস্টার, কী-চেন—প্রতিটি পণ্যই তৈরি হয় বাতিল কাপড় ব্যবহার করে।
তাঁর দলের সদস্যরা কাপড় সংগ্রহ করেন বাড়িঘর, বুটিক বা দর্জিদের দোকান থেকে, এরপর তৈরি করেন পরিবেশবান্ধব ও লো-ইমপ্যাক্ট অ্যাকসেসরিজ। অপ্রয়োজনীয় বর্জ্য কমানো এবং ‘অবাঞ্ছিত’ কাপড়কে নতুন জীবন দিয়ে সুন্দর, পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্যে পরিনত করা – এভাবে ব্র্যান্ডটি নিজের মূল লক্ষ্যকে ধরে রেখেছে।
ছোট ছোট উদ্যোগেই বড় পরিবর্তন সম্ভব, প্রমাণ করেছেন নয়না।
শিশু থেকে প্রবীণ—সবার জন্যই নয়নার কাজ মনে করিয়ে দেয়: বড় পরিবর্তন আনতে বড় কর্মকাণ্ড প্রয়োজন হয় না; শুরুটা হয় প্রতিদিনের ছোট ছোট সচেতন সিদ্ধান্তে। প্রতিটি পরিবর্তন, প্রতিটি সচেতন অভ্যাস, প্রতিটি যত্নশীল পদক্ষেপ—সবই জমা হয় বৃহত্তর প্রভাব তৈরি করতে।
নিজের পথচলায় তিনি দেখিয়েছেন—সাসটেনেবিলিটি কোনো ট্রেন্ড নয়; এটি জীবনযাপনের একটি পদ্ধতি। আর সেই পথচলা শুরু হয়—আমাদের প্রত্যেকের মধ্য থেকে।


