কলকাতার লাইফস্টাইল ল্যান্ডস্কেপে, আজকে দাঁড়িয়ে কেউ যদি একটি অনন্য নক্সার স্টাইলিস, অথচ স্পেসিয়াস ব্যাগের খোঁজ করেন, তাহলে এককথায় যে নাম সামনে আসবে তা হল “ঋদ্ধি-পঙ্কজ” ব্যাগস।
মহামারি পূর্ব কলকাতার অভিজাত লাইফস্টাইল এক্সিবিশন ক্যানভাসে যার ‘পিলি ট্যাক্সি’ ডিজাইনার ব্যাগ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল অভিজাত ফ্যাশন সচেতন মহিলা মহলে, আসুন জেনে নিই তার বিষয়ে কিছু কথা।
তিনি হলেন “ঋদ্ধি-পঙ্কজ” ব্র্যান্ডের কর্ণধার ও ডিজাইনার ঋদ্ধি কাপুর।
দক্ষিণ কলকাতার এক বিশিষ্ট পাড়ায় নিজের বাসভবন থেকেই নীরবে গত বছর কুড়ি যাবৎ নিজের কাজ করে চলেছেন ঋদ্ধি। আদ্যন্ত কলকাতা প্রেমী ঋদ্ধি তার ডিজাইনে ফিরিয়ে আনেন কলকাতার নস্টালজিয়া, তা সে কলকাতা ট্যাক্সি হোক বা শিউলি ঢাকা মা দূর্গার মুখ, ঋদ্ধি-পঙ্কজ ব্যাগ মানেই স্টাইল-ট্রাডিশন-স্টেটমেন্ট।
এই ব্র্যান্ডের পিছনে থাকা মানুষটাকে জানতেই পৌঁছে গেছিলাম তার পাম গাছের বাউন্ডারি দেওয়া কর্মশালায়। শরতের শিউলি ঢাকা সবুজ লন পেরিয়ে, এক চিলতে বারান্দায় বসেই চলল আমাদের আড্ডা।
উত্তর কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত পঞ্জাবি পরিবারের মেয়ে ঋদ্ধি।

কলকাতায় জন্ম হলেও শৈশবে বাবার ব্যবসার কারণে স্থানান্তরিত হতে হয় জামশেদপুরে।
ছোট্ট শহরের ধীর-লয়ের জীবনে কাটানো সেই দিনগুলোয় ঋদ্ধি দেখেছেন মা, পিসি ও ঠাকুমাদের অলস দুপুরের সময়টা বিভিন্ন সূচিকর্ম করতে করতে গল্পে মেতে থাকতে।
নিজে সেই সময় কখনও সূচিকর্মে হাত না দিলেও, সেইদিনগুলোর ছবি তার মনের ক্যানভাসে রয়ে গেছে অমলিন। মনের মণিকোঠায় উজ্জ্বলভাবে আঁকা—শৈশবের এই অমূল্য স্মৃতিই তার যাত্রাপথের আলো বলে মনে করেন তিনি।
জামশেদপুরে পড়াশোনা শেষ করে ঋদ্ধি যান মুম্বইয়ে, সেখানে হোম সায়েন্স নিয়ে স্নাতক হন। এখানেই শুরু হয় তার হাতে কলমে সেলাই ও সূচিকর্ম শেখার যাত্রা।
এরপর নির্মলা নিকেতন থেকে স্বল্পমেয়াদি টেক্সটাইল ডিজাইনিং কোর্স সম্পূর্ণ করে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, কলকাতার জনৈক পঙ্কজ কাপুরের সাথে—এবং জীবন পা রাখে নতুন অধ্যায়ে।
বিয়ের পর কলকাতায় ফিরে এসে গৃহস্থালির দায়িত্বে ব্যস্ত হয়ে পড়েন ঋদ্ধি।
সন্তানের জন্মের পর তিনি অনুভব করেন—বাজারে সন্তোষজনক শিশুপোশাকের বড় অভাব।
সন্তান কিছুটা বড় হলে শিক্ষকতা শুরু করেন কলকাতার এক বিখ্যাত হোম সায়েন্স কলেজে। এই সময়েই পুরনো ভালোবাসা—সূচিকর্মের প্রতি অনুরাগ—আবার জেগে ওঠে।

সাত-আট মাসের মধ্যেই কলেজ ছেড়ে দেন, বন্ধুদের উৎসাহে শুরু করেন শিশুপোশাকের ডিজাইন ও ব্যবসা—যা ছিল তার প্রথম উদ্যোগ।
ধীরে ধীরে তার তৈরি পোশাক জনপ্রিয় হতে শুরু করে। শিশুদের মায়েরাও অনুরোধ জানান—তাদের জন্যও পোশাক বানানোর।
এইভাবেই জন্ম নেয় নারীদের পোশাক বিভাগ।
নিজের বাড়ির একটি ঘরেই গড়ে ওঠে বুটিক, “ঋদ্ধিস্”। সেটা ২০০৩- ০৪ সাল।
ব্যবসা ভালোই চলছিল, কিন্তু জীবনের গতিপথে আসে নতুন এক মোড়—স্বামীর কাজের ক্ষেত্র পরিবর্তন হওয়ায় স্বামীর সঙ্গে পুণে চলে যেতে হয় তাকেও। আর স্থান পরিবর্তন হওয়ায় ব্যবসাও থামাতে হয় ঋদ্ধিকে।
পুণেতে থেকেও ঋদ্ধি থেমে থাকেননি। শুরু করেন নিজের গ্রুমিং।

সেখানেই কুইল্টিং সহ নানা সেলাই পদ্ধতি ও প্রযুক্তি শেখেন তিনি। যোগদান করতে থাকেন নানা কর্মশালায়। পুণে শহরটি তাকে পরিচিত করায় ফ্যাশন ও অ্যাক্সেসরিজ ডিজাইনের বিস্তৃত এক জগতের সাথে। প্রায় দশ বছর পুণেতে কাটিয়ে ২০১৭ সালে পরিবারসহ ফেরৎ আসেন কলকাতায়।
কলকাতায় ফিরে এক অন্য বিড়ম্বনা ঘিরে ধরে তাকে। তিনি দেখেন তার বুটিকের গুদামে জমে আছে নানারঙের কাপড়ের স্তুপ।
বহুদিন আগে ছেড়ে যাওয়া ব্যবসায় ফেরার উপায় নেই, আবার দামি সুন্দর কাপড়গুলোকে নষ্ট হতেও দেওয়া যায় না। এবার সেগুলোই হয়ে ওঠে নতুন অনুপ্রেরণা। এমন কী? যা একাধারে সব সমস্যা সমাধান করবে?
এই চিন্তার থেকেই তিনি তৈরি করেন “ফ্রিদা ডিজাইন”। ফ্যাশন আইকন ফ্রিদা কাহলোর অনুপ্রেরণায় বহু রঙের কাপড় জুড়ে সূচিকর্মের এক অনন্য শিল্প। প্রথমেই এই ডিজাইন তিনি প্রয়োগ করেন চামড়ার ব্যাগ তৈরিতে।
জন্ম হয় এক নতুন কনসেপ্ট, “এম্ব্রয়ডার্ড লেদার ব্যাগ” এর।

সেই সময়টা ছিল সোশ্যাল মিডিয়ার উত্থানের সময়। ইনস্টাগ্রামে নিজের ব্যাগের ছবি পোস্ট করতে শুরু করেন ঋদ্ধি। প্রশংসা পান প্রচুর, সাথে ক্রেতাও।
এরপর ক্রেতা ও অনুরাগীদের চাহিদা ও পরামর্শে তৈরি করতে থাকেন নানান আকৃতি ও মাপের ব্যাগ। কয়েকজন চামড়ার কারিগরের সহায়তায় স্বপ্নের ব্যাগগুলো পায় বাস্তব রূপ।
কলকাতার কয়েকটি খ্যাতনামা ও অভিজাত প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের সুযোগ ও অনলাইন প্রচারে তার সৃষ্টিগুলির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। অভিজাত সমাজে ‘ফ্রিদা ডিজাইন’ ও ‘পিলি ট্যাক্সি ডিজাইন’ ব্যাগ হয়ে ওঠে তার ব্র্যান্ডের পরিচয়।
কিন্তু মাত্র দুই বছরের মধ্যেই আসে অতিমারি ও লকডাউন।
এই সময় তিনি মনোনিবেশ করেন লাইভের মাধ্যমে অনলাইন বিক্রিতে। সোশ্যাল মিডিয়া তার ব্যবসায় খুলে দেয় নতুন দিগন্ত ও পরিচিতি।
ইন্স্টাগ্রামে নিজের আর স্বামী পঙ্কজ-এর নাম থাকা ই-মেইল আই ডি দিয়ে খুলেছিলেন প্রোফাইল। নিজের ব্র্যান্ডের নামকরণ করার আগেই ক্রেতারা তার ব্যাগকে ডাকতে শুরু করেন—“ঋদ্ধি পঙ্কজ ব্যাগ” নামে।
স্বামীর নীরব সহায়তাকে সম্মান জানিয়ে সেই নামই শিরোধার্য করেন তিনি। এই নামই আজ তার ব্র্যান্ড পরিচয়ের সমার্থক।
ঋদ্ধি বলেন, “ভগবান আমার প্রতি খুবই সদয়। আমি কিছু চাইবার আগেই পথ খুলে দিয়েছেন, যেন আমাকেই আমার উদ্দেশ্যের দিকে ঠেলে দিয়েছেন বারবার।”
আজ, ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে লেদার আর রেক্সিন এর সাথে মেলানো তার প্রতিটি নক্সা —‘কলকাতা ট্যাক্স, ‘ফ্রিদা’, ‘স্টারি নাইটস’, ‘কলকাতা রিকশা’ বা ‘কলকাতা ট্রাম’, মা দূর্গা— সিরিজের গোল, চৌকো, তিনকোনা ব্যাগগুলি অফুরন্ত ভালোবাসা পেয়েছে ক্রেতাদের কাছ থেকে।

রোজকার দিনচর্চা হোক বা কোনও ইভেন্ট পার্টি, বিয়েবাড়ি হোক বা দেশ-বিদেশ ভ্রমণ। ট্রাডিশনাল, ফর্মাল,ক্যাসুয়াল সবরকম পোষাক ও সব বয়সী মহিলাদের সব প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম ‘ঋদ্ধি-পঙ্কজ’ এর সম্ভার। অনেকেই তাই এখন নিজেদের “বাকেট লিস্টে” রাখেন এক একটি সিরিজের “ঋদ্ধি-পঙ্কজ” ব্যাগ কেনার ইচ্ছা।
নিজের পরিশ্রমে একা হাতে ব্যবসাকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যে, আজ তার অধীনে কাজ করছেন একদল কারিগর ও তিনজন পূর্ণকালীন কর্মী। তবুও প্রতিটি সূক্ষ্ম সূচিকর্ম তিনি নিজ হাতে করেন এবং নিজেই পরিচালনা করেন সোশ্যাল মিডিয়া পেজগুলি। প্রতিদিন শেখেন একটি বা দুটি “ট্রিক অফ দ্য ট্রেড”।
ঋদ্ধির বিশ্বাস, “ভাগ্য আমার সঙ্গে ছিল, কিন্তু প্রতিদিনের কঠোর পরিশ্রমই আমাকে এই জায়গায় এনেছে।”এখন তার পুত্র বড় হয়ে ব্যবসার আর্থিক ও প্রযুক্তিগত দিক সামলাতে সাহায্য করছে।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় ঋদ্ধি নিজের ওয়েবসাইট চালু করেছেন এবং ব্যস্ত রয়েছেন ব্র্যান্ডের প্রচারে।
যেখানে প্রডাক্ট ডিজাইন, ম্যানুফ্যাকচারিং ও সেলস্-এর পাশাপাশি প্রডাক্ট শ্যুট ও মার্কেটিং-এর দিকগুলোও নিজে হাতে সামলাচ্ছেন ঋদ্ধি।

শৈশবের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে চালু করেছেন- “নটস্ বাই নানি”(knots by nani) নামে বিশেষ ব্র্যান্ড—যেখানে তার অশীতিপর মায়ের হাতে বোনা উলেন স্কার্ফ প্রদর্শিত হয়। প্রায় আশি বছর বয়সেও তার মা প্রদর্শনীতে উপস্থিত থেকে নিজ হাতে কাজ প্রদর্শন করেন—যা প্রতিবারই সৃষ্টি করে আনন্দ ও ইতিবাচকতার পরিবেশ।

আজ পঞ্চাষোর্ধ্ব বয়সে এসেও ঋদ্ধি নতুন উদ্যোগ, নতুন ভাবনা ও সৃজনশীল অন্বেষণে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন—‘ঋদ্ধি -পঙ্কজ’ কে এক অনন্য ব্র্যান্ডে পরিণত করার লক্ষ্যে।
কলকাতার পরিসর ছাড়িয়ে তার ব্যাগের প্রদর্শনী এখন পৌঁছে গেছে দিল্লি, ব্যাঙ্গালোরের মত কসমোপলিটান শহরগুলিতে। আর তার ব্যাগের ভক্ত ছড়িয়ে রয়েছে সারা পৃথিবীতে।
রিপোর্টার মৈত্রী মজুমদার


