Saturday, May 9, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

তিন কন্যার তিন কোটি দান: শ্রমজীবীদের জন্য রাখলেন উত্তরাধিকার

হাওড়া, বালির দেওয়ান গাজি রোডের শতবর্ষ পেরোনো মিশ্রবাড়ি আজ এক নতুন কাহিনির সাক্ষী।
তিন বোন—সবিতা মিশ্র (৮২), সাবিত্রী বিশ্বাস (৭৭) এবং সরস্বতী মিশ্র (৭২)—নিজেদের প্রায় সমস্ত পৈতৃক সম্পত্তি দান করেছেন বেলুড়ের শ্রমজীবী হাসপাতালকে।

সরকারি হিসেবে এর মূল্য প্রায় তিন কোটি টাকা।

মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হওয়া এই তিন কন্যার কাছে বিলাসিতা করার মতো অর্থ কখনওই ছিল না, তবুও সমাজের জন্য রেখে গেলেন অমূল্য দৃষ্টান্ত।

শিক্ষিত, স্বাবলম্বী, নিঃস্বার্থ এই তিন বোন। বড়বোন সবিতাদেবী দীর্ঘদিন পড়িয়েছেন সংস্কৃত কলেজ, লেডি ব্রেবোর্ন ও বেথুন কলেজে। ছোট বোন সরস্বতীদেবী করেছেন লাইব্রেরি অ্যান্ড ইনফরমেশন সায়েন্সে পিএইচডি। ইংরেজি ছাড়াও সংস্কৃত, পালি ও উর্দুতে তাঁর দখল অনন্য। ন্যাশনাল লাইব্রেরি থেকে শুরু করে একাধিক সরকারি কলেজে কাজ করেছেন তিনি।

অবিবাহিতা বড় ও ছোট বোন থাকতেন বালির পৈতৃক বাড়িতেই; মাঝের বোন সাবিত্রী সংসারী হলেও দানের সিদ্ধান্তে ছিলেন সমান অংশীদার।

বাড়ি, বাড়ি লাগোয়া জমি এবং একটি পুকুর—সবটাই তাঁরা সমর্পণ করেছেন হাসপাতালের হাতে।

কিন্তু শ্রমজীবী হাসপাতালকেই কেন?

প্রথমে তাঁরা ভেবেছিলেন একটি আধ্যাত্মিক সংগঠনকে দান করবেন সম্পত্তি। কিন্তু সংগঠনটি নগদ অর্থ দাবি করলে সরে আসেন। অন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সাথে কথাবার্তাও কোনো প্রত্যাশা জাগায়নি। ঠিক তখনই তাঁদের পরিচয় হয় শ্রমজীবী হাসপাতালের সঙ্গে।

সরস্বতীদেবী বলেন, ‘‘আমাদের এক ভাইয়ের চিকিৎসার জন্য সরকারি ও বেসরকারি বহু হাসপাতাল ঘুরেছি, ভেলোর পর্যন্ত গিয়েছি। অভিজ্ঞতা ভাল ছিল না।’’ অথচ শ্রমজীবীর সঙ্গে পরিচয়ের পর মত পাল্টায়। ‘‘গরিব মানুষের জন্য এরা ধারাবাহিক ভাবে কাজ করে চলেছেন, এরা যত্নবান ও আন্তরিক। আমরা বুঝলাম, এই হাসপাতালই প্রকৃত ভরসা,’’ যোগ করেন তিনি।

এবার একটু জানা যাক এই হাসপাতালের কথা

১৯৮২ সালে বেলুড়ের ইন্দো-জাপান স্টিল কারখানার শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়ে কয়েকজন তরুণ ডাক্তার শুরু করেছিলেন শ্রমজীবী হাসপাতালের কাজ। কারখানা ১৯৯৬ সালে বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু হাসপাতাল টিকে থাকে মানুষের শ্রম, সহযোগিতা ও বিশ্বাসে। গত সাড়ে তিন দশকে এখানে চিকিৎসা পেয়েছেন তিরিশ লক্ষেরও বেশি মানুষ।

এই হাসপাতাল কখনও সরকারি ভর্তুকি, এনজিওর অনুদান বা ব্যাঙ্ক ঋণ নেয়নি। সম্পূর্ণ অ-লাভজনকভাবে চলেছে, এমনকি সরকারি হাসপাতালের তুলনায়ও কম খরচে চিকিৎসা দিয়েছেন এরা।
বর্তমানে বেলুড় ছাড়াও সুন্দরবন, হুগলি, বীরভূমে বিস্তার ঘটিয়েছে এই হাসপাতাল। তবে স্থানাভাবের কারণে প্রতিদিনই বহু রোগীকে ফিরিয়ে দিতে হয়।

দানের পর নতুন স্বপ্ন দেখছে শ্রমজীবী হাসপাতাল।

মিশ্রদের বাড়ি ও জমি হাতে পেয়েই শ্রমজীবী শুরু করেছে রবিবারের বহির্বিভাগ। তিন বোনের ভাই শিবকুমার মিশ্র, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, এখন রোগী সামলাতে সাহায্য করছেন।

হাসপাতালের অন্যতম উদ্যোক্তা ফণীগোপাল ভট্টাচার্য জানালেন, এখানে তৈরি হচ্ছে একটি ‘শ্রমজীবী পাঠশালা’—একটি কমিউনিটি কলেজ। নার্সিং, ডাক্তারি সহায়তা, প্যারা-মেডিক্যাল—সব প্রশিক্ষণই হবে আবাসিক ও সম্পূর্ণ অবৈতনিক, প্রান্তিক পরিবারের ছেলে-মেয়েদের জন্য। পাশাপাশি পরিকল্পনা রয়েছে একটি বৃদ্ধাবাস গড়ে তোলারও।

১৩ অগস্ট জমির ভিত খোঁড়া হয়েছে। আর আশ্চর্যের বিষয়—ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেননি কোনও দাতা বা রাজনীতিবিদ, বরং সাধারণ মানুষ নিজেরাই এ কাজ করেছেন তিন কন্যাকে সাথে নিয়ে।
ব্যক্তির উত্তরাধিকার পৌঁছেছে সমাজের হাতে।

সবিতাদেবী একবার বলেছিলেন, ‘‘আমরা চাই এই বাড়িতেই কর্মযজ্ঞ শুরু হোক, আর আমরা সেই যজ্ঞে অংশ নেব।’’ সত্যিই তাই ঘটল।

তিন কন্যার এই দান শুধু সম্পত্তি নয়, এক জীবনদর্শন। সম্পদের সাথে সাথে নিজেদেরকেও তারা দান করেছেন সমাজের কাজে।

তাঁরা শিখিয়ে গেলেন- জমানো নয়, সমাজে ছড়ালেই সম্পত্তির মূল্যবৃদ্ধি হয়।