Sunday, May 10, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

বিপর্যয়ের রাতে এক আশার আলো — নাগরাকাটার সুমন লিন্ডার মানবিক দৃষ্টান্ত

উত্তরবঙ্গের ভয়াবহ বন্যায় তছনছ নাগরাকাটা ব্লকের খেরকাটা গ্রাম। চারদিকে জল, অন্ধকার, আতঙ্ক। ঠিক সেই সময়েই এক মহিলার সাহস আর মানবিকতার নজির হয়ে উঠল রাজ্যের মানুষের গর্ব। তাঁর নাম — সুমন লিন্ডা, পেশায় এক আশাকর্মী।

রাজ্যের হাজার হাজার আশাকর্মীর মতোই কাজ করেন সুমন। কিন্তু ৪ অক্টোবর রাত এবং ৫ অক্টোবর সকালের মধ্যবর্তী এক ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের রাতে যা তিনি করেছেন, তা কেবল কর্তব্য নয়—একটি জীবনরক্ষার মহাকাব্য।
৪ অক্টোবরের রাতে প্রবল বন্যায় জলে ডুবে যায় নাগরাকাটার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। নিজের বাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয় সুমনের। অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা বাড়িতে, স্বামী ভিনরাজ্যে কাজে। এমন অবস্থায় গভীর রাতে, রাত প্রায় দেড়টা নাগাদ, সুমনের মোবাইল বেজে ওঠে। ফোনের ওপার থেকে শোনা যায়—খেরকাটার এক অন্তঃসত্ত্বা প্রসব যন্ত্রণায় ছটফট করছেন, তাঁকে তৎক্ষণাৎ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

বাইরে তখন প্রবল বৃষ্টি, অন্ধকার, চারদিক জঙ্গলে ঘেরা। চিতাবাঘ, হাতি—সব রকম বিপদের আশঙ্কা। কিন্তু কোনও আশঙ্কাকেই তোয়াক্কা না করে সুমন বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন, একাই। কয়েক কিলোমিটার হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যান ওই অন্তঃসত্ত্বার বাড়িতে।

ফোন করে অনেক কষ্টে একটি গাড়ি জোগাড় করেন। কিন্তু পথের বিপর্যয় তখনও শেষ নয়। টন্ডু গ্রাম পর্যন্ত গাড়িতে যাওয়া গেলেও সেখানেই আটকে পড়তে হয়—কারণ, ডায়না ও গাঠিয়া নদীর উপর সেতু বন্যায় ভেঙে পড়েছে।

উপস্থিত বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে নদীর ধারে পৌঁছে যান সুমন, দেখতে পান এনডিআরএফ কর্মীরা উদ্ধারকাজে ব্যস্ত। তিনি সব জানান তাঁদের। কর্মীরা ঝুঁকি নিয়ে স্পিড বোটে নদী পার করান সুমন ও অন্তঃসত্ত্বাকে।
এদিকে সুমনের ফোনে খবর পেয়ে নাগরাকাটার ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক ইরফান মোল্লা নদীর এপাড়ে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। বোটে নদী পার হয়ে তাঁরা ওঠেন সেই অ্যাম্বুলেন্সে। প্রথমে সুলকাপাড়া গ্রামীণ হাসপাতাল, তারপর মাল সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল—প্রতিটি ধাপে সুমন ছিলেন রোগিণীর পাশে।
ভোরের আলো ফুটতেই হাসপাতালের বিছানায় জন্ম নেয় এক ফুটফুটে কন্যাসন্তান। নাম রাখা হয়—বন্যা। কারণ, এই সন্তানের জন্ম যেন বিপর্যয়ের বুক চিরে জীবনের জয়গান।

মায়ের মুখে হাসি ফুটতেই চোখে জল আসে সুমনের। এরপর নিঃশব্দে, সেই বন্যাপথেই ফেরেন নিজের বাড়ি—দায়িত্ব পালন শেষ করে, জীবনের এক অনন্য অধ্যায় রচনা করে।

সুমন লিন্ডার এই সাহসিকতা ও মানবিকতার জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে।

আজ নাগরাকাটার মানুষ গর্বভরে বলেন— “সুমন লিন্ডা শুধু এক আশাকর্মী নন, তিনি আমাদের আশার প্রতীক।”