কিংবদন্তি পরিবেশকর্মী সালুমারাদা থিম্মাক্কা (আসল নাম- আলা মারাদা থিম্মাক্কা) আর নেই। শুক্রবার ১৪ নভেম্বর ২০২৫ বেঙ্গালুরুতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বয়স হয়েছিল ১১৪ বছর।
কর্ণাটকের রামনগর জেলার হুলিকাল থেকে কুদুর পর্যন্ত ৪.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কের দু’ধারে ৩৮৫টি বটগাছ রোপণ ও পরিচর্যা করেই তিনি ভারতজুড়ে অনন্য খ্যাতি অর্জন করেন। পাশাপাশি তিনি প্রায় ৮০০০ অন্যান্য গাছও রোপণ করেছিলেন।
কোনও রকম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না থিম্মাক্কার। নিকটবর্তী একটি পাথরখাদানে তিনি দৈনিক মজুরির শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। তবুও অক্লান্ত পরিশ্রম করে গড়ে তুলেছিলেন গাছেদের এক বিশাল সবুজ ঐতিহ্য।
গাছ লাগানো ও পরিচর্যার এই অসামান্য উদ্যোগের জন্য তিনি পেয়েছিলেন ন্যাশনাল সিটিজেনস অ্যাওয়ার্ড, এবং ২০১৯ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস ও ওকল্যান্ডে অবস্থিত পরিবেশ সংস্থা ‘থিম্মাক্কাস রিসোর্সেস ফর এনভায়রনমেন্টাল এডুকেশন’ তাঁর নামেই প্রতিষ্ঠিত।

২০২০ সালে সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অফ কর্ণাটক তাঁকে সাম্মানিক ডক্টরেট প্রদান করে।
থিম্মাক্কা ৩০ জুন ১৯১১ সালে, তৎকালীন মাইসোর রাজ্যের (বর্তমান কর্ণাটকের তুমাকুরু জেলা) গুব্বি তালুকে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর স্বামী ছিলেন রামনগর জেলার মাগাডি তালুকের হুলিকাল গ্রামের বাসিন্দা চিক্কাইয়াহ।
সন্তানসন্ততি না থাকায়, থিম্মাক্কা কথিতভাবে ‘সন্তানের বিকল্প হিসেবে গাছ লাগানো’ শুরু করেন।
কন্নড় ভাষার ‘সালুমারাদা’ শব্দের অর্থ ‘গাছের সারি’—এই কাজের কারণেই তিনি এ নামে খ্যাত হন। তাঁর এক পালকপুত্র ছিল, নাম উমেশ।

এই কাজের শুরু হয়েছিল দশটি চারা দিয়ে। গ্রামের চারপাশে প্রচুর বটগাছ থাকায় সেখান থেকেই প্রথমে কলম বানাতেন তিনি ও তাঁর স্বামী।
প্রথম বছরে ১০টি, দ্বিতীয় বছরে ১৫টি এবং তৃতীয় বছরে ২০টি চারা তাঁরা রোপণ করেন। নিজের অতি সামান্য সঞ্চয় থেকেই সমস্ত ব্যয় বহন করতেন। প্রতিদিন চার কিলোমিটার হেঁটে চার বালতি জল বহন করে তাঁরা চারা গুলোতে জল দিতেন। গবাদি পশুর হাত থেকে রক্ষা করতে কাঁটাঝোপ দিয়ে বেড়াও দিতেন।
বর্ষাকালে গাছ লাগানো হতো, যাতে স্বাভাবিক বৃষ্টির জলে চারা দ্রুত শিকড় গাড়তে পারে। পরবর্তী বর্ষা আসার আগেই সব চারা বেশিরভাগই স্থায়ীভাবে বেড়ে উঠত।
মোট ৩৮৪টি গাছের মূল্য পরবর্তীকালে প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা হিসেবে নির্ধারিত হয়। বর্তমানে এই গাছগুলির রক্ষণাবেক্ষণ করে কর্ণাটক সরকার।

২০১৯ সালে বাগেপল্লি–হালগুরু সড়ক প্রশস্তকরণের পরিকল্পনায় তাঁর রোপণ করা বটগাছগুলি কাটার সম্ভাবনা তৈরি হয়। থিম্মাক্কা তখন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী এইচ. ডি. কুমারস্বামী ও উপমুখ্যমন্ত্রী জি. পরমেশ্বর-এর কাছে আবেদন জানান।
পরবর্তীতে সরকার প্রকল্পের বিকল্প সমাধান খুঁজে গাছগুলো রক্ষা করে।
১৯৯১ সালে স্বামীর মৃত্যুর পরও থিম্মাক্কা দেশে বহু বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচিতে আমন্ত্রিত হন।
তিনি গ্রামের বার্ষিক উৎসবের জন্য বর্ষার জল সংরক্ষণের ট্যাঙ্ক নির্মাণ-এও উদ্যোগী ছিলেন।
স্বামীর স্মরণে একটি হাসপাতাল নির্মাণের স্বপ্ন ছিল তাঁর; এ উদ্দেশ্যে একটি ট্রাস্টও গঠন করা হয়।
১৯৯৯ সালে তাঁর কাজ নিয়ে ‘থিম্মাক্কা মথু ২৮৪ মাক্কালু’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়, যা ২০০০ সালের ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভাল অফ ইন্ডিয়া-তেও প্রদর্শিত হয়।
২০২০ সালের ডিসেম্বরে তাঁর কোমরের অস্ত্রোপচার সফল হয়।
২০১৬ সালে বিবিসি তাঁকে বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী ও প্রেরণাদায়ী নারীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।
জীবনের শেষ দিকে শ্বাসকষ্টসহ বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় তাঁকে একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল।

অবশেষে ১৪ নভেম্বর ২০২৫-এ এই মহান পরিবেশকর্মীর জীবনাবসান ঘটে।
তবে সারা জীবনের কাজের বিনিময়ে সম্মানও অনেকাংশেই লাভ করেছেন সালুমারাদা থিম্মাক্কা। তাঁর প্রাপ্ত সম্মানের তালিকা টি জেনে নেওয়া যাক:-
১. পদ্মশ্রী – ২০১৯
২. নাদোজা অ্যাওয়ার্ড, হামপি ইউনিভার্সিটি – ২০১০
৩. ন্যাশনাল সিটিজেনস অ্যাওয়ার্ড – ১৯৯৫
৪. ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী বৃক্ষমিত্র পুরস্কার – ১৯৯৭
৫. বীরচক্র প্রশস্তি – ১৯৯৭
৬. কর্ণাটক সরকার থেকে নারী ও শিশু কল্যাণ দফতরের সম্মানপত্র
৭. ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ উড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, বেঙ্গালুরু–র থেকে প্রশংসাপত্র
৮. কর্ণাটক কাল্পাভল্লি অ্যাওয়ার্ড – ২০০০
৯. গডফ্রে ফিলিপস ব্রেভারি অ্যাওয়ার্ড – ২০০৬
১০. আর্ট অফ লিভিং–এর বিশালাক্ষী অ্যাওয়ার্ড
১১. হুভিনহোলি ফাউন্ডেশন–এর বিশ্বাত্মা অ্যাওয়ার্ড – ২০১৫
১২. বিবিসি–র ১০০ নারী – ২০১৬
১৩. শিজ় ডিভাইন অ্যাওয়ার্ড – ২০১৭
১৪. পরিসর রত্ন পুরস্কার
১৫. গ্রিন চ্যাম্পিয়ন অ্যাওয়ার্ড
১৬. বৃক্ষমাতা পুরস্কার


