Saturday, May 9, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

নকুবাবুর সংগ্রহশালা: মৃত সময়ের জীবন্ত দলিল

উত্তর কলকাতার নলিন সরকার স্ট্রিট আর খান্নার মধ্যবর্তী, শ্যামচাঁদ মিত্র লেনের ঊষালয়।
এই পুরানো দিনের তিনতলা বাড়ির দুটি ঘর, “অতীতের আশ্রয়” এবং “মরুদ্যানে যাযাবর”। এই দুটি ঘরেই লুকিয়ে আছে এক অনন্য, বিরল ধনভাণ্ডার। সেই ঘরগুলোর প্রতিটি কোণ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা অমূল্য নিদর্শনগুলোর স্নেহভরা অভিভাবক ছিলেন ৯৫ বছরের সুশীল কুমার চট্টোপাধ্যায়—যিনি সকলের কাছে আদরের সাথে ‘নকুবাবু’ নামেই পরিচিত।
পেশায় সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার নকুবাবু, বয়সকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে এক অপার উচ্ছ্বাসে যেন বিশ্ববাসীর সামনে মেলে ধরতেন তাঁর সঞ্চিত সম্পদ—যে সম্পদ একটি সাধারণ ঘরকে করে তুলেছে যে কোনও জাদুঘরের সমান সমৃদ্ধ।
ছোট থেকেই নকুবাবুর নেশা ছিল পরিত্যক্ত জিনিস সংগ্রহ করা। যেসব বস্তু একসময় তাদের মালিকদের কাছে গুরুত্ব হারিয়েছিল, তাঁর স্নেহশীল যত্নে সেই সব সাধারণ কিংবা কিছুটা অদ্ভুত বস্তুই আজ হয়ে উঠেছে অমূল্য ঐতিহ্য। বহু যুগ পেরিয়ে আসা সময়ের প্রতিনিধিরূপে তারা আজ আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে—অনেক ক্ষেত্রে তাদের অবস্থা প্রায় সেই দিনের মতোই অক্ষত, যেদিন প্রথম কেনা হয়েছিল। এর একমাত্র কারণ, তাঁদের ‘পিতা’ নকুবাবুর অগাধ যত্ন ও ভালোবাসা।
এই সংগ্রহে রয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার সম্পূর্ণ কার্যক্ষম একটি মুভি ক্যামেরা, ১৯১২ সালের একটি পকেট মাইক্রোস্কোপ, ১৭৭৭ সালে প্রাথমিক ব্রিটিশ বসতিস্থাপনকারীদের ব্যবহৃত সামুদ্রিক শামুকের তৈরি বোতাম, অষ্টাদশ শতকের কলিং বেল, বিভিন্ন সময়কালের মুভি ক্যামেরা ও প্রজেক্টর, এখনও বাজানো যায় এমন একটি পিয়ানো অ্যাকর্ডিয়ন, হাজার হাজার লং-প্লেয়িং শেল্যাক রেকর্ড এরকম নানা জিনিস। বৈচিত্র্য ও বিস্ময়ে ভরা এই সংগ্রহের ভান্ডার সত্যিই অভূতপূর্ব।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—তেমন সচ্ছ্বল নন এমন একজন মানুষ একার হাতে এত বিশাল সংগ্রহ গড়ে তুলেছেন। সৌভাগ্যবশত, নকুবাবুর বড় ছেলে গৌতম চট্টোপাধ্যায় তাঁর বাবার অতীতপ্রেম উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন এবং সংগ্রাহক ২০২১ সালে প্রয়াত হওয়ার পর এই অমূল্য সংগ্রহের দেখভাল করছেন প্রতিশ্রুতি মতো।
সংগ্রাহক হিসেবে ৬৬ বছর বয়সি গৌতম বাবুও, তাঁর বাবার দেখাদেখি, নিজের সঙ্গে সংগৃহীত বস্তুগুলোর এক বিশেষ, অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন তাঁর শৈশব থেকেই।
তাঁর বিশ্বাস, এই বস্তুগুলোর প্রতি তাঁর ভালোবাসা কালজয়ী—কারণ তারা সময়ের সব সীমা অতিক্রম করে সেই প্রথম দিনের স্মৃতি বহন করে, যেদিন সেগুলো কেনা হয়েছিল বা উপহার হিসেবে পাওয়া গিয়েছিল। তাই তিনি আজও সেগুলোর যত্ন নেন ঠিক সেই প্রথম দিনের মতোই।

অনেক সময় তিনি খারাপ হয়ে যাওয়া পুরানো জিনিস নিয়ে এসে সাজিয়ে নেন নিজে হাতেই। তাঁর নিজের ভাষায়, তিনি বলেন—তিনি এই বস্তুগুলোর সঙ্গে কথা বলেন, আর তারাও নাকি তাঁর সঙ্গে কথা বলে। আর সেই কারণেই তার সংগ্রহে থাকা প্রায় চার হাজার অ্যান্টিক জিনিসের মধ্যে ৯০-৯৫ শতাংশ বস্তুই সচল।
আর এভাবেই তাঁর বাবার সংগ্রহ ঘর “অতীতের আশ্রয়” এর পাশাপাশি তিনি নিজেও তাঁর ৪৪ বছর ধরে সংগ্রহ করা বিভিন্ন জিনিস দিয়ে সাজিয়ে একটি সংগ্রহ ঘর গড়ে তুলেছেন যার নাম নকুবাবুই দিয়ে গেছিলেন, “মরুদ্যানে যাযাবর”।

নকুবাবুর সংগ্রহ শালা— এই তিনশতাধিক বছর পেরোনো শহরের বুকে , ধনরত্নে ভরা এক মরুদ্যান আর গৌতম বাবু সেই মরুদ্যানের মাঝে একাকী এক যাযাবর।