কলকাতার এক সাধারণ পুলকার চালক আজ মানবিকতার এক অসাধারণ উদাহরণ হয়ে উঠেছেন। পেশায় গাড়িচালক হলেও নিজের উদ্যোগে তিনি প্রতিদিন শহরের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের স্বজনদের জন্য বিনামূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করেন। পার্থ কর চৌধুরী—যিনি আজ বহু মানুষের কাছে পরিচিত ‘হাসপাতাল ম্যান’ নামে। পঞ্চাশোর্ধ্ব এই মানুষটি গত বেশ কয়েক বছর ধরে নিয়মিতভাবে অসহায় ও ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দিয়ে চলেছেন।
কলকাতার কালীঘাট এলাকার বাসিন্দা পার্থ দিনের বেলা পুলকার চালানোর কাজ করেন। কিন্তু রাত নামলেই তিনি যেন আরেক ভূমিকায় অবতীর্ণ হন—একজন মানবসেবী হিসেবে। নিজের কাজ শেষ করে তিনি বাড়ি ফিরে রান্না করেন, তারপর সেই খাবার নিজের গাড়িতে করে শহরের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে পৌঁছে দেন।
২০১৬ সালে একটি ঘটনা পার্থর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ফুসফুসজনিত অসুস্থতার কারণে তাঁকে একসময় কলকাতার একটি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। সেখানে চিকিৎসা চলাকালীন তিনি কাছ থেকে দেখেন রোগীদের আত্মীয়দের অসহায় অবস্থা।
হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের অনেক স্বজনই দূরদূরান্ত থেকে এসে থাকেন। চিকিৎসার বিভিন্ন চাহিদা সামলাতে গিয়ে তাঁদের অনেকেরই খাবারের ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় হাসপাতাল থেকে পাওয়া সামান্য খাবারই ভাগ করে খেতে হয় তাদের। এই দৃশ্য গভীরভাবে নাড়া দেয় পার্থকে।
সেই অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “আমি দেখেছিলাম রোগীদের আত্মীয়রা হাসপাতাল থেকে পাওয়া খাবার ভাগ করে খাচ্ছেন। অনেকেরই গোটা দিনেও ঠিকমতো খাবার জোটে না। সেই দৃশ্য দেখে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। তখনই ঠিক করি, যতটুকু পারি ওদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করব।”
শুরুটা ছিল খুবই ছোট। পার্থ প্রথমদিকে কাগজের প্যাকেটে মুড়ি ভরে প্রায় ২০ থেকে ৩০ জন মানুষের মধ্যে বিলি করতেন। কিন্তু খুব দ্রুতই তিনি বুঝতে পারেন, এই সামান্য উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। তারপর শুরু হয় বিভিন্ন হোটেল, রেস্টুরেন্ট থেকে অব্যবহৃত খাবার জোগাড়ের কাজ। কারণ হাসপাতালগুলিতে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যাদের নিয়মিত খাবারের প্রয়োজন। ধীরে ধীরে তাঁর পাশে এসে দাঁড়ান অনেকেই। বিভিন্ন ব্যক্তি ও আই.আই.এইচ.এম এর মত সংস্থাও।
এরপরই তিনি আরও বড় আকারে উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বিভিন্ন উৎস থেকে খাবারের উপকরণ জোগাড় করা শুরু করেন। কখনও নিজের সামর্থ্যে, কখনও আবার মানুষের সাহায্যে তিনি খাবারের ব্যবস্থা করতে থাকেন। ক্রমশ এই উদ্যোগ বড় হতে থাকে। ২০১৯ সালে দ্য টেলিগ্রাফের ‘স্কুল অ্যাওয়ার্ড ফর এক্সেলেন্স’ পুরস্কার পান তিনি।
বর্তমানে পার্থ কর চৌধুরী প্রতিদিন প্রায় ১৫০ জনেরও বেশি মানুষের মধ্যে খাবার বিতরণ করেন। অনেক সময় দিনে দুই থেকে তিনবারও তিনি খাবার পৌঁছে দেন।
দিনের শুরুটা পার্থর অন্য সবার মতোই। সকাল পাঁচটায় তিনি পুলকার চালানোর কাজে বের হন, কাজ শেষ হতে হতে বিকেল পাঁচটা। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার পরই শুরু হয় তাঁর মানবসেবার আরেক অধ্যায়। বাড়ি ফিরে তিনি দ্রুত রান্নার প্রস্তুতি নেন। খাবার তৈরি হয়ে গেলে তা প্যাকেট করে নিজের গাড়িতে তুলে নেন। তারপর সেই খাবার নিয়ে তিনি কলকাতার প্রায় চার থেকে পাঁচটি সরকারি হাসপাতালে পৌঁছে যান।
এই তালিকায় প্রথম নাম এস.এস.কে.এম, যেখানে কিছু ডাক্তারির ছাত্র তাঁকে খাবার বিতরণে সাহায্য করে। তারপর তিনি যান শম্ভুনাথ পন্ডিতে, এভাবে তার গাড়ি পৌঁছায় ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ পর্যন্ত। হাসপাতালের সামনে তাঁর গাড়ি থামতেই অনেক রোগীর আত্মীয় স্বস্তি পান। কারণ তারা জানেন, এবার অন্তত খাবারের চিন্তা করতে হবে না।
পার্থকে প্রায়ই একটি নীল রঙের টি-শার্ট পরে দেখা যায়, যার উপর বড় অক্ষরে লেখা থাকে “হসপিটাল ম্যান”। এই পরিচিত পোশাকই তাঁকে ভিড়ের মধ্যে আলাদা করে চেনায়। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির সময় যখন দেশজুড়ে লকডাউন জারি হয়েছিল, তখন বহু মানুষের জীবন হয়ে উঠেছিল দুর্বিষহ। হাসপাতালগুলিতেও সেই সময় অসংখ্য মানুষ চরম সমস্যার মুখে পড়েন।
কিন্তু সেই কঠিন সময়েও পার্থ তাঁর কাজ থামাননি। বরং তিনি আগের মতোই খাবার রান্না করে হাসপাতালে পৌঁছে দিতে থাকেন। অনেকের কাছে সেই সময় তাঁর এই উদ্যোগ ছিল এক বড় সহায়তা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পার্থর এই মানবিক উদ্যোগ মানুষের মধ্যে পরিচিতি পেতে শুরু করে। তাঁর কাজের কথা শুনে অনেক সাধারণ মানুষও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।
অনেকে চাল, ডাল, ডিম, মাছ কিংবা মিষ্টি দিয়ে সাহায্য করেন, যাতে আরও বেশি মানুষের জন্য খাবার তৈরি করা যায়। এই সহযোগিতার ফলেই পার্থ তাঁর কাজ আরও বিস্তৃত করতে পেরেছেন। তিনি এখন নিয়মিতভাবে চারটি সরকারি হাসপাতালে খাবার বিতরণ করেন। পাশাপাশি প্রতি রবিবার তিনি একটি বিনামূল্যের চিকিৎসা শিবিরও পরিচালনা করেন, যেখানে অসহায় মানুষরা প্রাথমিক চিকিৎসা সুবিধা পান। এই কাজে পার্থর সবথেকে বড় সহায়ক তাঁর স্ত্রী সুদীপ্তা। যিনি নিজের উপার্জনে সংসার আর তাদের কন্যা সন্তানের পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছেন,যাতে পার্থবাবু সেবার কাজ চালিয়ে যেতে পারেন।
পার্থ কর চৌধুরী শুধু বর্তমানেই থেমে থাকতে চান না। তাঁর লক্ষ্য এই উদ্যোগকে আরও বড় করে তোলা। তিনি জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে তিনি একটি মুভিং কিচেন কার বা চলমান রান্নাঘর শুরু করতে চান। এতে করে শহরের আরও অনেক হাসপাতালেও সহজে খাবার পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
পার্থ বলেন, “আমি কলকাতার বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীদের ক্ষুধার্ত ও বিপন্ন আত্মীয়দের জন্য খাবার সরবরাহের কাজ চালিয়ে যেতে চাই। এখন কিছু সহৃদয় মানুষের সহযোগিতাও পাচ্ছি।” গত কয়েক বছরে পার্থ কর চৌধুরী প্রায় আট লক্ষ প্লেট বিনামূল্যের খাবার বিতরণ করতে পেরেছেন। একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে অসাধারণ।


