Saturday, May 9, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

নয় মাসে ১০৪ শিশু উদ্ধার: দুই নারী হেড কনস্টেবলের অবিশ্বাস্য লড়াই

সময়কাল: মার্চ – নভেম্বর ২০২৫
অভিযানের এলাকা: দিল্লি, হরিয়ানা, বিহার, উত্তরপ্রদেশ
অপারেশন ‘মিলাপ’-এর নেপথ্যের সাহস, মানবিকতা ও নিঃস্বার্থ দায়িত্ববোধের আখ্যান এটি।
হরিয়ানা–বিহার–উত্তরপ্রদেশের গ্রাম, স্টেশন, বাজার—যেখানে শিশুর খোঁজ সেখানেই ছুটেছেন তারা
পুরোনো ছবি, ভাষার বাধা, অচেনা পথ—সব পেরিয়ে এক একটি শিশুর বাড়ি ফেরাকে নীরবে সম্ভব করে তুলেছেন দুই নারী পুলিশ।
ডিসেম্বর মাস আসার আগেই দিল্লির এক বৈঠকে দুই নারী হেড কনস্টেবলকে ঘিরে এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায় পরিবেশ।
গত নয় মাসে ১০৪ জন নিখোঁজ শিশুকে ফেরত এনেছেন তাঁরা। অপারেশনটির নাম—‘মিলাপ’,
হারানো শিশুদের সাথে পরিবারের পূনর্মিলন….
কিন্তু তাদের কাজে মিলেছে আরও বড় কিছু: মানবিকতা, সহমর্মিতা ও হারিয়ে যাওয়া শিশুদের প্রতি এক অসমাপ্ত দায়িত্ববোধ।
এই দুই পুলিশকর্মীর নাম—সীমা দেবী ও সুমন হুডা, আউটার নর্থ জেলার অ্যান্টি-হিউম্যান ট্র্যাফিকিং ইউনিটের (AHTU) সদস্য। দিল্লি থেকে শত শত কিলোমিটার দূরের হরিয়ানা, বিহার ও উত্তরপ্রদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত তাদের পথচলা শুধু অপারেশন নয়—এ যেন এক মানবিক যাত্রা।
শুধুমাত্র কর্মক্ষেত্রের কর্তব্য বোধ থেকে নয় মানবিক কর্তব্য বোধ থেকে অপরিচিত গ্রামের পথে পথে ঘুরেছেন এই দুই নারী।
একটি ঘটনায় সীমা দেবী জানান—
“এক গ্রামে গিয়ে দেখি কেউ আমাদের ভাষা বুঝতে পারছে না। শিশুর সাম্প্রতিক কোনো ছবি নেই। শুধু একটি বছরখানেক পুরোনো ছবি। বাবা-মা বললেন, চোখের ভাঁজ আর হাঁটার ভঙ্গি দেখলেই চিনতে পারবেন। আমরা তখন তাদের সঙ্গে খুঁজতে শুরু করি।”
অবশেষে পাওয়া যায় শিশুটিকে—এক অচেনা আঙিনায় বসে কাঁদছিল। বাবা-মায়ের তাকে বুকে টেনে নেওয়া মুহূর্তটিই নাকি ছিল “মাসের সেরা দিন”—বলছিলেন সীমা।
সুমন হুডার কথায়—
“একটি শিশু যখন মায়ের হাত ধরে বাড়ি ফেরে, তখন মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো কাজটি করেছি।”

যে সব চ্যালেঞ্জ তাদের অভিযানকে কঠিনতর করেছিল তবু থামাতে পারে নি
১. পুরোনো ছবি, অস্পষ্ট স্মৃতি
অনেক পরিবার শুধু পুরোনো ছবি দিতে পেরেছে। ৬–৮ মাস আগের ফটো দিয়ে খোঁজা প্রায় অসম্ভব। তখন নির্ভর করতে হয়েছে বাবা-মায়ের মুখের বর্ণনা, শারীরিক বৈশিষ্ট্য এবং আচরণগত লক্ষণের ওপর।
২. ভাষার বাধা
হরিয়ানার গ্রাম বা বিহারের গলিতে গেলেই ভাষা তাদের থামিয়ে দিয়েছে বার বার। স্থানীয় পুলিশের সাহায্য না নিলে অনেক সময় পথ মিলত না।
৩. অচেনা ভূখণ্ড
অপরিচিত রাস্তাঘাট, গলি, স্টেশন, বাজার—সব জায়গা হাতড়াতে হয়েছে। কখনও সাইকেলে, কখনও পায়ে হেঁটে।
৪. তথ্যসূত্র হিসেব কাজে লাগাতে হয়েছে স্থানীয় ভিক্ষাজীবি, হকার বা রেল প্ল্যাটফর্মের ছোট দোকানদার দের।
রেলস্টেশন এলাকায় ঘুরে বেড়ানো মানুষদের কাছ থেকেই মিলেছে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। অনেক হকারই শিশুদের মুখ চিনে সহায়তা করেছেন।
তাদের নিজের কথায়—
“গত নয় মাসে ১০৪ শিশুকে পরিবারের কাছে ফিরিয়েছি—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। একজন মা হিসেবে আমি জানি সন্তান হারানোর যন্ত্রণা কতটা গভীর। তাই এই শিশুদের আমরা খুঁজতেই চেয়েছি, যত কঠিনই হোক।”— বললেন সীমা দেবী।
সুমন হুডার কথায়–
“শিশু উদ্ধারের পর যখন পরিবারের চোখে জল দেখি, তখন মনে হয়—এই ইউনিফর্ম পরাটা সার্থক।”
দুই নারী পুলিশকর্মীর এই সাফল্য শুধু সংখ্যার নয়—এটি এক মানবিক জয়। প্রতিটি শিশুর বাড়ি ফেরা এক একটি গল্প, আর প্রতিটি গল্পের পিছনে সীমা ও সুমনের নিঃশব্দ, নিরলস লড়াই। ‘অপারেশন মিলাপ’-এ তাদের কাজ প্রমাণ করে যে দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।