Monday, June 29, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

হাঁটুর অস্ত্রোপচারে নতুন দিগন্ত: কলকাতার অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতালে চালু ‘প্রিসিশন পার্শিয়াল নি রিকনস্ট্রাকশন সার্জারি’

মিনিমালি ইনভেসিভ প্রযুক্তিতে কমবে অস্ত্রোপচারের কষ্ট, হাসপাতালে থাকার সময়কাল ও দ্রুত হবে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা। হাঁটুর চিকিৎসায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল, কলকাতা।

অতিসম্প্রতি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রিসিশন পার্শিয়াল নি রিকনস্ট্রাকশন সার্জারি চালুর ঘোষণা করেছে। শীর্ষস্থানীয় অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে আয়োজিত এক সাংবাদিক বৈঠকে এই উন্নত, রোগীকেন্দ্রিক চিকিৎসা পদ্ধতির কথা তুলে ধরা হয়। হাঁটুর সুস্থ অংশ সংরক্ষণ করে শুধুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত অংশের চিকিৎসার মাধ্যমে এটি প্রচলিত টোটাল নি রিপ্লেসমেন্ট (TKR)-এর একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

সাংবাদিক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট অর্থোপেডিক সার্জন ডা. রঞ্জন কামিল্যা এবং কনসালট্যান্ট অর্থোপেডিক সার্জন ডা. সৌমেন কর। তাঁরা জানান, অত্যাধুনিক প্রিসিশন প্রযুক্তির সাহায্যে সার্জনরা হাঁটুর শুধুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত অংশটিই প্রতিস্থাপন করেন। ফলে সুস্থ হাড়, আশপাশের টিস্যু এবং প্রাকৃতিক লিগামেন্ট সম্পূর্ণ অক্ষত থাকে। পার্শিয়াল নি রিকনস্ট্রাকশন, বিশেষ করে ইউনিকম্পার্টমেন্টাল নি রিপ্লেসমেন্ট (UKR)-এর ক্লিনিক্যাল সাফল্য দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক গবেষণায়ও প্রমাণিত হয়েছে।

অক্সফোর্ড গবেষণায় মিলেছে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের প্রমাণ,
সাংবাদিক বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা অক্সফোর্ড ফেজ-৩ UKR গবেষণার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যানও তুলে ধরেন। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ইমপ্ল্যান্টের ১০ বছরে টিকে থাকার হার ৯৩ শতাংশ এবং ১৫ বছরে ৮৯ শতাংশ।

এছাড়া রোগীর নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতি উল্লেখযোগ্য সুবিধা দেয়। গবেষণা অনুযায়ী, UKR করানো রোগীদের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের পর প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে গুরুতর চিকিৎসাজনিত জটিলতার ঝুঁকি প্রচলিত টোটাল নি রিপ্লেসমেন্টের তুলনায় ৫০ শতাংশ কম।

দীর্ঘমেয়াদি ফলো-আপে দেখা গেছে, রোগীদের হাঁটুর কার্যক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অক্সফোর্ড নি স্কোর (OKS) অস্ত্রোপচারের আগে যেখানে গড়ে ২৩ ছিল, অস্ত্রোপচারের পরে তা ৪৮-এর মধ্যে ৪০-এরও বেশি হয়েছে। দ্রুত পুনর্বাসনের ফলে রোগীরা সাধারণত ৪ থেকে ৬ সপ্তাহের মধ্যেই হালকা দৈনন্দিন কাজকর্ম ও কম প্রভাবযুক্ত খেলাধুলায় ফিরতে পারেন। অন্যদিকে, প্রচলিত TKR-এর ক্ষেত্রে সুস্থ হতে সাধারণত ৩ থেকে ৬ মাস সময় লাগে।

ডা. রঞ্জন কামিল্যা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর হাঁটুর ক্ষতির ক্ষেত্রে টোটাল নি রিপ্লেসমেন্ট-কেই আদর্শ চিকিৎসা হিসেবে ধরা হলেও বাস্তবে বহু রোগীর সম্পূর্ণ হাঁটু প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন পড়ে না।

তিনি জানান, প্রিসিশন পার্শিয়াল নি রিকনস্ট্রাকশন সার্জারি-র মাধ্যমে শুধুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত অংশের চিকিৎসা করা সম্ভব। ফলে শরীরে আঘাত অনেক কম লাগে, রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং হাঁটুর স্বাভাবিক নড়াচড়াও অনেক বেশি সংরক্ষিত থাকে।

সাংবাদিক বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছিল, তীব্র হাঁটুর ব্যথা এখন আর শুধু প্রবীণদের সমস্যা নয়। আধুনিক জীবনযাত্রা, দীর্ঘ সময় শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, জয়েন্টের ওপর অতিরিক্ত চাপ এবং একই ধরনের কাজের পুনরাবৃত্তির কারণে কম বয়সী কর্মজীবী মানুষদের মধ্যেও হাঁটুর জয়েন্টের প্রাথমিক ক্ষয়জনিত সমস্যার চিকিৎসার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।

অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত মহামারিতাত্ত্বিক তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক সাধারণ মানুষের মধ্যে হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিসের প্রকোপ ২২ থেকে ৩৯ শতাংশ। আর ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে এই হার বেড়ে ৪৪ থেকে ৫০ শতাংশে পৌঁছে যায়।

ডা. কামিল্যা আরও বলেন, বর্তমানে হাঁটুর ব্যথা ও প্রাথমিক জয়েন্ট ক্ষয়ের সমস্যায় আক্রান্ত অপেক্ষাকৃত কম বয়সী রোগীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। নির্বাচিত রোগীদের জন্য এই অস্ত্রোপচার অত্যন্ত কার্যকর সমাধান হতে পারে, যা তাঁদের দ্রুত দৈনন্দিন জীবনে ফিরতে সাহায্য করে এবং হাঁটুর স্বাভাবিক অনুভূতিও বজায় রাখে।

তিনি জানান, মিনিমালি ইনভেসিভ পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে অস্ত্রোপচারের পর ব্যথা ও অস্বস্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে, হাসপাতালে থাকার সময় কম লাগে এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়াও অনেক দ্রুত সম্পন্ন হয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই প্রিসিশন-নির্ভর সার্জিক্যাল প্রযুক্তি ভবিষ্যতে প্রচলিত অর্থোপেডিক চিকিৎসার ধারা বদলে দিতে পারে। কারণ এটি রোগীর পরবর্তী জীবনে টোটাল নি রিপ্লেসমেন্টের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে দিতে বা অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে যেতেও সক্ষম হতে পারে।