Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

‘খেলো রাগবি’ উইন্টার ক্যাম্প: কলকাতার স্লাম‑শিশুদের জীবনে বদলের গল্প

প্রতি শীতকালে কলকাতার ময়দান এক ভিন্ন চেহারা নেয়। ডিসেম্বর মাস এলেই এখানে জড়ো হয় প্রায় ২,০০০ স্লাম‑শিশু—
হাতে রাগবি বল, চোখে স্বপ্ন। ‘খেলো রাগবি উইন্টার ক্যাম্প’ শুধু একটি ক্রীড়া প্রশিক্ষণ শিবির নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের এক শক্তিশালী মাধ্যম।

জঙ্গল ক্রোজ ফাউন্ডেশন, ফিউচার হোপসহ একাধিক এনজিও এই উদ্যোগে যুক্ত। শিশুদের জন্য বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ, পুষ্টিকর খাবার, জার্সি ও ক্রীড়া সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা হয়। স্থানীয় ও জাতীয় স্তরের কোচরা শিশুদের শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি মানসিক দৃঢ়তা গড়ে তুলতে সাহায্য করেন।
“এটা একটা উইন্টার ক্যাম্প। প্রতি ডিসেম্বরে নয় দিনের জন্য ‘খেলো রাগবি’ ২০ বছর ধরে এটা করে আসছে,” বললেন ফিউচার হোপ-এর ক্রীড়া পরিচালক এবং এই কর্মসূচিটির প্রতিষ্ঠাতা পল ওয়ালশ। “প্রতিদিন প্রায় ৬০০ এর বেশি শিশু এখানে আসে। তাদের পরিচালনা করেন এবং প্রশিক্ষণ দেন তাদের নিজেদের সম্প্রদায়ের তরুণ অগ্রজরা ও প্রশিক্ষকরা। এই ক্যাম্প তাদের প্রশিক্ষণ, সংগঠন এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা প্রদান করে। ছোট বাচ্চাদের জন্য, এটি এমন একটা জায়গা যার জন্য তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে।”
ওয়ালশ ক্যাম্পটিকে দাতব্য কার্যক্রম হিসেবে তুলে ধরতে নারাজ।
তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো মালিকানাবোধ। “রাগবি হয়তো সারা ভারতে জনপ্রিয় নয়, কিন্তু এই শিশুদের জন্য এটিই সবকিছু। তারা এটাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। এটা তাদের খেলা, কেউ তাদের উপর খবরদারি করে না, কারণ বেশিরভাগ স্হানীয় লোক এর নিয়ম জানেনা। এই স্বাধীনতা এই খেলাটিকে আরও মজাদার করে তোলে এবং এটিকে তাদের নিজেদের করে তোলে।”

এই আপন করে নেওয়ার অনুভূতিই প্রতি বছর ক্যাম্পটিকে প্রাণবন্ত রাখে। শিশুরা কলকাতার বিভিন্ন বস্তি থেকে আসে, কেউ কেউ হয়তো জীবনের প্রথমবারের মতো বাড়ি থেকে এতটা দূর আসে। মাঠে তারা সবাই সমান। শৃঙ্খলা এখানে মৃদু হলেও দৃঢ়তা বজায় রাখেন সেই তরুণ প্রশিক্ষকরা, যারা প্রতিটি শিশুকে নাম ধরে চেনেন কারণ তারাও একই গলিতে বড় হয়েছেন।
“এটা আমার দেখা সবচেয়ে আশ্চর্যজনক জিনিসগুলোর মধ্যে একটি,” বললেন পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের ব্রিটিশ ডেপুটি হাইকমিশনার অ্যান্ড্রু ফ্লেমিং, যিনি এই ক্যাম্পে একটি পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। “এই শিশুরা এমন পরিস্থিতিতে বাস করে যা আমার মতো মানুষেরা কল্পনাও করতে পারে না। আর এখানে তারা আসে, তাদের সমান চোখে দেখা হয়, তাদের ভিন্ন ভিন্ন বিষয় চেষ্টা করার সুযোগ দেওয়া হয়, আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর এবং নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।”

এই ক্যাম্পটি যতটা দৃঢ় সংকল্পের উপর চলে, ততটাই সদিচ্ছার উপরও চলে। প্রতিদিন সকালে কলকাতার কিছু সেরা পরিচিত প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জলখাবার আসে, যার মধ্যে রয়েছে ট্রিঙ্কাস, ফ্লুরিস এবং তাজ-এর মতো নাম। প্রতিদিন শত শত শিশুকে খাওয়ানো এই ক্যাম্পের একটি রীতিতে পরিণত হয়েছে।

এই প্রচেষ্টার অনেকটাই দেখাশোনা করেন শেফ ও কনসালটেন্ট শন কেনওয়ার্দি, যিনি নিজেও একসময় রাগবি খেলোয়াড় ছিলেন। “আমরা সবাই একসময় একটা বল ছোড়াছুড়ি করে শুরু করেছিলাম এবং বাচ্চারা এসে যোগ দিয়েছিল,” তিনি বলেন। “সেটাই ছিল শুরু। ‘খেলো রাগবি’ এখন যা হয়ে উঠেছে তা প্রত্যক্ষ করা অবিশ্বাস্য।”
কেনওয়ার্দি বিশ্বাস করেন যে রাগবি এমন কিছু কিছু শিক্ষা দেয় যা সারাজীবন সাথে থেকে যায়। “
এটি একটি দারুণ সমতাপ্রদানকারী খেলা। এখানে সব ধরনের শারীরিক গড়নের মানুষের জন্য জায়গা আছে। এই খেলার মধ্যেই শৃঙ্খলা এবং শ্রদ্ধাবোধ নিহিত আছে। একদিকে আপনি রেফারির কথা শোনেন অন্যদিকে আপনি আপনার সতীর্থদের যত্ন নেন। এই জিনিসগুলো আপনার সাথে সারাজীবন থেকে যায়।” ফিউচার হোপ এবং জাঙ্গল ক্রোস এর পাশাপাশি অন্যান্য এনজিও-র মতো সংস্থাগুলোও এই ক্যাম্পের সাথে জুড়তে এগিয়ে আসছে, যা এর প্রসার ও প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে তুলবে বলেই ধারনা। “এর উদ্দেশ্য হলো মানুষকে একত্রিত করা,” ওয়ালশ বলেন। “হোটেল, এনজিও, স্বেচ্ছাসেবক, তরুণ প্রশিক্ষক—সবাই নিজস্ব একটি ভূমিকা পালন করে।”

এই ক্যাম্প থেকে উঠে আসা বহু শিশু আজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে খেলছে। তাদের মধ্যে আছেন সুমিতকুমার রায়। একজন বাস‑চালকের ছেলে হয়ে, আজ তিনি আন্তর্জাতিক রাগবি খেলোয়াড়। তাঁর মতে, “এই ক্যাম্প আমাকে শৃঙ্খলা, আত্মবিশ্বাস আর স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে।” রাগবি এখানে শুধুই খেলা নয়; এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির পথ। শিশুরা দলগত কাজ, নেতৃত্ব ও পরিশ্রমের মূল্য শেখে—যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনে পথ দেখায়।