Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

কার্ত্যায়নী আম্মা: এক পরিণত শিশু মনষ্কের গল্প

সদ্য চলে গেল বাৎসরিক শিশু দিবস। প্রতিবার শিশু দিবসেই শিশুদের নিয়ে নানা চর্চার কথা জানতে পারি আমরা। ভোরাইতে এবার এক ‘অন্য’ শিশুর গল্প।
শৈশব মানুষের জীবনে এক অপর্যাপ্ত কর্ম চাঞ্চল্যের বয়স। এই সময় সাধারণত চারপাশের পরিবেশ থেকে সবটুকু শিক্ষা আহরণ করার ইচ্ছে, সাহস, অনুপ্রেরণা সবই পর্যাপ্ত পরিমানে থাকে। যা বয়সের সাথে সাথে কমতে থাকে। তাই কথায় বলে….
“৯ এ যার হয়না তার ৯০ এও হয়না”….
একথা কি সবসময় ঠিক??

৯ বা ৯০ এ না হলেও ৯৬ বছর বয়সে যিনি সাক্ষরতা পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে শৈশবের আস্বাদ অর্জন করেছিলেন সেই নারি শক্তির প্রতীকের গল্পই আজ হোক।

ভারতের কেরালার হারিপাদের চেপ্পাদ জনপদের বাসিন্দা কার্ত্যায়নী আম্মা ৯৬ বছর বয়সে সাক্ষরতা পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে জাতীয় চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন। নারীর সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘নারী শক্তি পুরস্কার’-এ ভূষিত এই প্রবীণ শিক্ষানুরাগীর জীবন এক অনন্য অনুপ্রেরণার গল্প।

১৯২২ সালে জন্ম নেওয়া কার্ত্যায়নী আম্মাকে শৈশবে সংসারের দায়ে স্কুল ছাড়তে হয়। পরবর্তীতে তিনি বিবাহিত জীবনে ছয় সন্তানের জননী হন। জীবিকা নির্বাহের জন্য রাস্তার ঝাড়ুদার ও গৃহকর্মীর কাজ করতেন আম্মা।
কঠোর শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনে তিনি ছিলেন নিরামিষভোজী এবং প্রতিদিন ভোর ৪টায় ঘুম থেকে উঠেই জীবনযুদ্ধে সামিল হতেন আম্মা।


২০১৮ সালে তিনি প্রবীণদের সামাজিক আবাসন ‘লক্ষ্মম বেদু কলোনি’-তে বসবাস করছিলেন। সেইসময় তাঁর কন্যা ৬০ বছর বয়সে একটি পরীক্ষা উত্তীর্ণ হওয়ায় অনুপ্রাণিত হয়ে আম্মা নিজেও শিক্ষালাভের সিদ্ধান্ত নেন। সেই বছরই কেরালা স্টেট লিটারেসি মিশনের ‘অক্ষরলক্ষম’ কর্মসূচির অধীনে ৪০,৩৬২ জন পরীক্ষার্থীর সঙ্গে তিনিও অংশ নেন। তাঁর প্রপৌত্র–প্রপৌত্রী, যাদের বয়স যথাক্রমে ৯ ও ১২ বছর, তাঁকে পড়া-লেখার প্রাথমিক পাঠ দিত।

পড়া, লেখা ও গণিত—তিন বিভাগেই কার্ত্যায়নী আম্মা ১০০’র মধ্যে ৯৮ নম্বর পেয়ে সর্বোচ্চ গ্রেড অর্জন করেন। পরে তিনি রসিকতার সুরে বলেন, “কোনো কারণ ছাড়াই এত শিখলাম। পরীক্ষা তো আমার কাছে খুবই সহজ ছিল।”

তাঁর এই সাফল্যে গোটা দেশ উচ্ছ্বসিত হয়। চলচ্চিত্র তারকা মঞ্জু ওয়ারিয়র দীপাবলিতে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন; কেরালার শিক্ষা মন্ত্রী সি. রবীন্দ্রনাথ তাঁকে একটি ল্যাপটপ উপহার দেন; মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন তাঁকে সম্মাননাপত্র প্রদান করেন। তিনি ইকনমিক টাইমস-কে জানান, শতবর্ষে পৌঁছে তিনি পরবর্তী স্তরের পরীক্ষাও দিতে চান।

২০১৯ সালে কার্ত্যায়নী আম্মা কমনওয়েলথ অব লার্নিং-এর গুডউইল অ্যাম্বাসাডর নির্বাচিত হন। ২০২০ সালের মার্চে রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দের হাত থেকে তিনি ২০১৯ সালের ‘নারী শক্তি পুরস্কার’ গ্রহণ করেন।
জীবনে কখনও বিমানযাত্রা না করলেও, পুরস্কার গ্রহণের আগে সাবেক পুরস্কারপ্রাপ্ত এম.এস. সুনীলের আশ্বাসে তিনি প্রথমবার দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনে উড়ে যান।

একই বছর এই পুরস্কার পান কেরালারই আরেক শিশুমনের অধিকারী ভাগীরথী আম্মা,
যিনি ১০৫ বছর বয়সে অক্ষরলক্ষম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সর্বাধিক বয়সী পরীক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত হন।
কার্ত্যায়নী আম্মার জীবনী ও মনোবল দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে বিকাশ খন্না ‘বেয়ারফুট এমপ্রেস’ শীর্ষক একটি ডকুমেন্টারি নির্মাণ করেন, যাতে তাঁর যাত্রাপথ তুলে ধরা হয়েছে।
২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর কেরালার আলাপ্পুঝায় ১০১ বছর বয়সে কার্ত্যায়নী আম্মা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

৯৬ বছরের কার্তায়নী আম্মা, তাঁর ৬০ বছর বয়সী কন্যা আর ১০৫ বছরের ভাগীরথী আম্মা দের অদম্য শিক্ষাসাধনা শুধু বার্ধক্যের সীমাকে নয় শিশুমনের সরলতাকে বাঁচিয়ে রাখার মন্ত্রকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।