কলকাতার ব্যস্ত শহরজীবনের মাঝেই জন্ম নিয়েছে এক নীরব সবুজ বিপ্লব। এই বিপ্লবের নায়ক জাসমিত সিং আরোরা—পেশায় চিকিৎসক হলেও চিন্তায় ও কাজে এক সমাজমনস্ক উদ্যোক্তা। শহরের ফলের বাজারে প্রতিদিন যে লক্ষ লক্ষ আমের আঁটি ফেলে দেওয়া হয়, সেগুলোকে সম্পদে পরিণত করার ভাবনা থেকেই শুরু তাঁর উদ্যোগ।
‘আম কে আম গুটলিওঁ কে দাম’ একটি হিন্দি প্রবাদ, যার মোটামুটি অর্থ হলো বর্জ্য পদার্থকে নিজের সুবিধার্থে ব্যবহার করা। কলকাতার বাসিন্দা জাসমিত সিং অরোরার এই উদ্যোগটি রূপক এবং আক্ষরিক উভয় অর্থেই এই প্রবাদটিকে মূর্ত করে তোলে।
কলকাতার বাঙুর অ্যাভিনিউয়ের বাসিন্দা ৫১ বছর বয়সি অরোরা, পশ্চিমবঙ্গে কৃষির চেহারা বদলে দেওয়ার এক অনন্য মিশনে নেমেছেন। তাঁর উদ্যোগটি যেমন সহজ, তেমনই বিপ্লবাত্মক—তিনি ফেলে দেওয়া আমের আঁটি সংগ্রহ করেন, সেগুলো অঙ্কুরিত করে চারা তৈরি করেন, স্থানীয় জাতের সঙ্গে কলম(গ্রাফটিং) করে কৃষকদের হাতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে তুলে দেন। উদ্দেশ্য একটাই—দীর্ঘমেয়াদি ও পরিবেশবান্ধব কৃষিকে উৎসাহ দেওয়া।
লক্ষ্য : কৃষকের আয় বাড়ানো
অরোরা বলেন, “আমি সারা ভারত থেকে আমের আঁটি সংগ্রহ করি, সেগুলো অঙ্কুরিত করি, তারপর মূলত পশ্চিমবঙ্গের কৃষকদের মধ্যে চারা বিতরণ করি। এই কৃষকদের বেশিরভাগই ধানচাষে আটকে আছেন। ধানচাষে এক একর জমি থেকে মাসে বড়জোর ২,০০০ টাকা আয় হয়, অথচ এতে বিপুল পরিমাণ জল খরচ হয়।” এই ফসলের বিকল্প হিসেবে তিনি ফলধারী আমগাছ রোপণের প্রস্তাব দিচ্ছেন। “আমগাছ ফল দিতে সময় নেয়, কিন্তু এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। এগুলো কার্বন ধরে রাখে, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে এবং ফলন শুরু হলে কৃষকদের জন্য সম্মানজনক আয় নিশ্চিত করতে পারে। আর বেশি আমগাছ মানে আমাদের জন্য বেশি অক্সিজেন, আর কৃষকদের জন্য বেশি আয়,” তিনি বলেন।

পরিবর্তনের বীজ
অরোরার সবুজ অভিযানের শুরু হয়েছিল পাঁচ-ছয় বছর আগে, ছোট পরিসরে। তবে গত বছর একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর উদ্যোগটি ব্যাপক গতি পায়। তিনি জানান, “আমি প্রতিদিন ১০০ থেকে ১২০টি করে আঁটির পার্সেল পেতে শুরু করি—কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, অসম থেকে গুজরাট। স্কুল, সেনাবাহিনীর সদস্য, বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স—সব ধরনের মানুষ এতে যুক্ত হন। শুধু গত বছরই আমি ১১ লক্ষ আমের আঁটি পেয়েছি।”
এই আঁটিগুলো প্রেরকরাই পরিষ্কার করে রোদে শুকিয়ে জাসমিতকে পাঠান। এরপর তাঁর কেন্দ্রে পৌঁছলে ডায়মন্ড হারবার ও বর্ধমান সংলগ্ন এলাকায় জমিতে অঙ্কুরোদ্গম করানো হয়—যে জমিগুলো এই মিশনকে সমর্থনকারী জমির মালিকেরা স্বেচ্ছায় দিয়েছেন।
তিনি স্বীকার করেন, “সব আঁটি থেকে চারা হয় না। মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ আঁটি অঙ্কুরিত হয়। এই কারণেই অনেক কৃষক নিজেরা আমগাছ লাগাতে দ্বিধায় থাকেন।” ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে আসা চারাগুলো টেকসই করতে তিনি ল্যাংড়া ও গুলাবখাসের মতো স্থানীয় জাতের সঙ্গে কলম করেন।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, “মহারাষ্ট্রের কেসর আম বাংলার আবহাওয়ায় টিকবে না। এখানেই গ্রাফটিংয়ের বিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।” কাজের শুরুর দিকে কৃষকদের আস্থা অর্জনের পথটা সহজ ছিল না, বললেন অরোরা। “শুরুর দিকে তাঁরা সন্দিহান ছিলেন। বহু প্রকল্প ও প্রতিশ্রুতি তাঁদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তাছাড়া ১৫ বছর পর ফল দেবে—এমন গাছ লাগাতেও তাঁরা রাজি ছিলেন না। তাই প্রথমে আমচারার সঙ্গে দ্রুত ফলনশীল অন্যান্য ফলের গাছ দিয়েছি, যাতে তাঁদের আস্থা তৈরি হয়।”
আজ অরোরা কৃষক ও স্বেচ্ছাসেবকদের একটি সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করেন। তাঁদের মধ্যে উদ্যোক্তা অশোক মোদির মতো মানুষও আছেন, যিনি অঙ্কুরোদ্গমের জন্য জমি ও অন্যান্য সংস্থান জোগান। সমাজকর্মী হিসেবে অরোরা জোর দিয়ে বলেন, “কৃষকদের জন্য সবকিছুই বিনামূল্যে। আমি যদি সামান্য অর্থও নিই, অনেকেই তা দিতে পারবেন না—আর দারিদ্র্যের চক্র চলতেই থাকবে।”
‘গুটলি ম্যান’-এর এই পথচলা বৈচিত্র্যপূর্ণ
জাসমিত সিং অরোরার জীবন বহু বাঁক পেরিয়ে ‘গুটলি ম্যান’ হয়ে ওঠার গল্প। শিক্ষাগত ভাবে চিকিৎসক, পেশায় আইটি ও ফার্মা উদ্যোক্তা, আর নেশায় সমাজসেবী—গত এক দশক ধরে তিনি সমাজসেবামূলক কাজে সক্রিয়। তিনি বলেন, “সুন্দরবন, পুরুলিয়া, বাঁকুড়ার মতো প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে বুঝেছি কৃষকরা কত কম সহায়তা পান।”
জৈব কৃষির প্রতি বিশ্বাস
অরোরা জৈব কৃষির প্রবল সমর্থক। তিনি বলেন, “আমি কখনও রাসায়নিক ব্যবহার করি না। রাসায়নিক নির্ভর কৃষি প্রচার করলে স্বল্পমেয়াদি লাভ দীর্ঘমেয়াদি অস্বাস্থ্যকর ব্যবস্থায় নষ্ট হয়ে যাবে। আমি প্রমাণ করতে চাই—জৈব কৃষিও লাভজনক হতে পারে।”
সাধারণ মানুষ কীভাবে সাহায্য করতে পারেন এই উদ্যোগকে
আমের মরসুম শুরু হওয়ার আগে অরোরার আন্তরিক আবেদন, “আমের আঁটি ফেলে দেবেন না। পরিষ্কার করুন, শুকোতে দিন, তারপর আমাকে পাঠান। আমার নম্বর ৯৮৩১৪৫৯৩৯০। ফোন করুন—আমি ঠিক কীভাবে কী করতে হবে, বলে দেব।”
তিনি সারা দেশজুড়ে ‘কার্বন প্রোটেকশন ফোর্স’ চালু করার উদ্যোগও নিচ্ছেন, যেখানে কর্পোরেট সংস্থা, স্কুল ও সংবাদমাধ্যমকে গাছ লাগিয়ে কার্বন ধরে রাখার দায়িত্ব নিতে আহ্বান জানানো হচ্ছে। তিনি বলেন, “পৃথিবীর যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে। এবার মেরামতের সময়। আর সেটা শুরু হবে আমাদের থেকেই—সরকার বা বড় শিল্প নয়, আমরা।” ‘গুটলি ম্যান’ দেশের বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের সঙ্গে কাজ করেন। কলকাতায় তিনি লা মার্টিনিয়ের ফর বয়েজ অ্যান্ড গার্লস, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট স্কুল এবং বিডিএম ইন্টারন্যাশনালের মতো নামি স্কুলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তাঁর আহ্বান—শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি এগিয়ে আসুক, বর্জ্য আমের আঁটি থেকে চারা তৈরির এই মিশনে শামিল হোক, আর এক সবুজ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলুক।


