Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

ক্যাফে ক্রাস্ট অ্যান্ড কোর: দৃঢ়তা, দক্ষতা ও বেকিংয়ের মাধ্যমে সামাজিক গ্লানি মোছার গল্প

ক্রাস্ট অ্যান্ড কোর’ ২০১৮ সালে যাত্রা শুরু করে—এটি কলকাতার একমাত্র ক্যাফে যেখানে মনো-সামাজিক প্রতিবন্ধকতায় ভোগা মানুষদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থান করা হয়,’ জানালেন ঈশ্বর সংকল্পের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সচিব সর্বাণী দাস রায়।
ঈশ্বর সংকল্পের ১৫ বছরের পথচলায় আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল মনো-সামাজিক প্রতিবন্ধকতায় ভোগা মানুষদের সামনে একটি বিকল্প তৈরি করা। এই আন্দোলন আজ এমন এক পরিণত স্তরে পৌঁছেছে, যেখানে সেই বিকল্প তাদের যতটা সম্ভব স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে সাহায্য করছে।
আমাদের কাজ শুধু চিকিৎসাগত সুস্থতায় সীমাবদ্ধ নয়; ক্লিনিক্যাল পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি নারীদের সার্বিক উন্নয়নের সহায়তায়ও আমরা যুক্ত থেকেছি।
সাধারণ জীবনে, আমরা প্রায়ই গৃহহীন মানুষদের পাশ কাটিয়ে যাই, দ্বিতীয়বার তাকানোর প্রয়োজন বোধ করি না। অথচ আমরা অনেকেই উপলব্ধি করি না—এই মানুষগুলিও একসময় আমাদেরই মতো ছিলেন, মানবিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আগে।

তারা হারিয়েছেন এমন সব মৌলিক বিষয়, যা আমরা স্বাভাবিক বলে ধরে নিই—নাম, ঠিকানা, বন্ধু, সম্পর্ক, পরিচয়পত্র, জীবিকা ও স্বপ্ন। তাই আমাদের কাজ শুধু চিকিৎসাগত পুনরুদ্ধার নয়; সামাজিক পুনর্বাসনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই কর্মকান্ডের মূলভিত্তি হলো সেলাই, শিল্পকলা, হস্তশিল্প ও বেকারির মতো বিষয়গুলিতে দক্ষ করে তোলার প্রশিক্ষণ দেওয়া, যাতে তারা স্বাধীনভাবে রোজগার করতে পারেন। এই ভাবনা থেকেই ২০১৮ সালে , ১৯/৩ পীতাম্বর ঘটক লেন, (চেতলা থানা সংলগ্ন) এ গড়ে ওঠে ‘ক্রাস্ট অ্যান্ড কোর’ বেকারি।কলকাতার একমাত্র ক্যাফে যেখানে মনো-সামাজিক প্রতিবন্ধকতায় ভোগা মানুষদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান দেওয়া হয়।
মনো-সামাজিক প্রতিবন্ধকতায় ভোগা মানুষদের প্রায়ই অক্ষম বলে দেখা হয়। আমি এমন একটি জায়গা তৈরি করতে চেয়েছিলাম, যেখানে গ্রাহকেরা এসে এমন একজনের হাতে তৈরি খাবার খেতে পারবেন, যিনি তীব্র সাইকোসিসে ভুগছেন, এবং বুঝতে পারবেন যে—এই মানুষগুলিও অন্য যে কোনো বেকারির মতোই সুস্বাদু খাবার তৈরি করতে সক্ষম। যেখানে ভিড় টানবে খাবারের গুণমান, সহানুভূতি নয় ।

কিন্তু বেকারিই কেন?
সর্বাণী জানান- একটি নির্দিষ্ট কারণেই আমরা বেকারি শুরু করেছি—বেকিংয়ের কাজ পুনরাবৃত্তিমূলক।
প্রক্রিয়াটি ভালোভাবে জানা থাকলে তা প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে করা যায়। আমাদের এখানকার অধিকাংশ নারীই তীব্র সাইকোসিস ও স্কিজোফ্রেনিয়ায় ভোগেন, তাই তাদের শক্তির মাত্রা অনুযায়ী পুনরাবৃত্তিমূলক কাজে যুক্ত করা সহজ।

যেমন, যিনি বিষণ্ণ বা অন্তর্মুখী, তাঁকে কিশ-এর বাইরের শেল তৈরির কাজে নিযুক্ত করা হয়। বাস্তবিক কথা হলো—তিনি নিজের সঙ্গে কথা বললেও কাজটি নিখুঁতভাবে চালিয়ে যেতে পারেন।
যাঁদের মধ্যে ম্যানিয়ার লক্ষণ দেখা যায়, তাঁদের দেওয়া হয় বেশি শারীরিক শ্রমের কাজ যেমন মোয়দার ডো মাখা বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ।

আমরা একটি বিস্তারিত নয় মাসের প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া তৈরি করেছি।
মনে রাখতে হবে, এমন কিছু নারী এখানে আসেন, যাঁরা কখনও কেক দেখেননি এবং পুরোপুরি কার্যক্ষমও থাকেন না। সেখান থেকে অসাধারণ দক্ষতায় কেক, ব্রাউনি ও কুকি তৈরি করতে পারা—এটি একটি নাটকীয় সাফল্য।
আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তাঁরা কিচেনের বাইরে বেরোন, গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলেন, নতুন দক্ষতা শেখেন, নিজেদের কার্যক্ষমতা বাড়ান, আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতা উন্নত করেন এবং জটিল কাজ সামলানোর সক্ষমতা বিস্তৃত করেন।

গত পাঁচ বছরে আমরা প্রায় ৩০ জন নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি, যাঁরা এখন স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন।
সুষমা মালাচাপুরে যখন আমাদের কাছে আসেন, তখন তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৩০। তাঁকে আমরা গার্ডেন রিচ থানায় পাই। শুরুতে তিনি সবার থেকে দূরে থাকতেন; এতটাই অবিশ্বাসী ছিলেন যে নিজের নাম নিয়েও মিথ্যে বলতেন।
পরে যা জানা যায়—তাঁর মদ্যপ স্বামী ও শ্বশুর শারীরিক নির্যাতন করতেন। সুস্থ হয়ে ওঠার পর তিনি একটি কার্যকরী সাক্ষরতা ক্লাসে ভর্তি হন এবং রান্নাঘরের কাজে যুক্ত হন। তখনই তাঁর ইচ্ছে হয় মা ও মেয়ের কাছে ফিরে যাওয়ার, এবং আমরা তাঁদের খুঁজে পাই। আনন্দের সঙ্গে বলতে পারি, সুষমা বর্তমানে কর্ণাটকের একটি ব্রেড কারখানায় কাজ করছেন।
বর্তমানে আমাদের ক্যাফেতে সাতজন নারী প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। গত ছয় মাসে আমরা ৫ লক্ষ টাকা আয় করেছি এবং সেঞ্চুরিপ্লাই, মার্কিন কনস্যুলেট ও আমেরিকান সেন্টারের মতো সংস্থার কাছ থেকে কাজের চুক্তি পেয়েছি। আমাদের পক্ষে সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো—আমরা কখনও গুণমানের সঙ্গে আপস করে খরচ কমানোর পথ বেছে নিই না। আমরা উৎকৃষ্ট উপকরণ ব্যবহার করি, আর তার ফলেই ভালো স্বাদের জন্য একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড তৈরি হয়েছে।
এমন ঘটনাও ঘটেছে, যখন গ্রাহকেরা মনো-সামাজিক প্রতিবন্ধকতায় ভোগা কর্মীর ব্যাকগ্রাউন্ড জানতে পেরেছেন। তখন সাধারণ প্রতিক্রিয়া এসেছে বিষ্ময়ের—
“ইয়ে ক্যায়সে হো সকতা হ্যায়…”—এরপর এসেছে প্রশংসা।
এখানকার প্রাক্তন এক ‘বেকার’ কলকাতার শামলী দত্ত,(৪২), জানালেন-“২০১৮ সালে এন জি ও ঈশ্বর সংকল্প আমাদের পাড়ায় একটি সমীক্ষার জন্য আসে এবং আমাকে ডাক্তারের কাছে যেতে বলে। আমার স্কিজোফ্রেনিয়া ধরা পড়ে। আমাকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল, উৎপাদনশীল কাজে নিজেকে যুক্ত রাখলে অসুস্থতা কমবে। আমি ঈশ্বর সংকল্পে যোগ দিই এবং বিভিন্ন দক্ষতা শিখি। ২০২১ সালের আগস্টে ক্যাফেতে যোগ দেওয়ার পর আমার জীবনে বড় পরিবর্তন এসেছে—আমি এখন অনেক বেশি সুখী ও আত্মবিশ্বাসী। গ্রাহকেরা আমার বানানো ব্রেড ও পাফ পছন্দ করেন—এই অনুভূতিই আমাকে জীবনের উদ্দেশ্য দিয়েছে। আমার স্বামী ও সন্তানেরা আমার এই বদলে যাওয়ায় গর্বিত, আর পরিবারের প্রথম নারী হিসেবে আমিই এখন জীবিকার মাধ্যমে অর্জন করছি।”
“সম্পত্তি সংক্রান্ত বিবাদের জেরে আমার মাথায় আঘাত করা হয়েছিল। তারপর থেকেই রাগের সমস্যা শুরু হয়, যা আত্মআঘাতের দিকে নিয়ে যায়। আমি বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাই এবং ২০১৮ সালে ঈশ্বর সংকল্পে, এবং ২০২১ সালে ক্যাফেতে যোগ দিই। ক্যাফেতে যোগ দেওয়ার আগে আমি হ্যালুসিনেশনে ভুগতাম, নানা ‘শব্দ’ শুনতাম। এখন সেগুলো নিয়ন্ত্রণে—কাজের থেরাপি আমাকে সাহায্য করেছে। প্রতিদিন সকালে আমিই ক্যাফে খুলে দিই। সবচেয়ে ভালো বিষয় হলো—গ্রাহকেরা আমার তৈরী ব্রাউনি ভীষণ পছন্দ করেন। বললেন বছর ৩৩-এর টুম্পা মণ্ডল। বাড়ি, মেদিনীপুরে।