চেন্নাইয়ের জনপ্রিয় অটোরিকশা দিদি বা ‘অটো আক্কা’ বছর ৫০-এর পি.ভি. রাজি অশোক, আজ শুধু একটি পরিচিত নাম নন—তিনি নারীদের নিরাপত্তা, মানবতা ও সহমর্মিতার এক শক্তিশালী প্রতীক। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি শহরের নারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করছেন, পাশাপাশি অসহায়, বৃদ্ধ, শিশু ও দরিদ্রদের বিনামূল্যে পরিষেবা দিয়ে হয়ে উঠেছেন মানুষের আপনজন।
রাত গভীর হলে যখন শহর ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে আসে, তখনই রাজি আক্কার অটো হয়ে ওঠে নারীদের ভরসার ঠিকানা। মাঝরাতে নারীদের বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হোক বা জরুরি রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া—তিনি সবসময় প্রস্তুত।
রাজির কথায়, এক রাতে একজন একাকী মহিলাকে এক মাতাল অটোওয়ালার অটোতে যেতে দেখেন তিনি। সেই নারীর নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। এরপরই সিদ্ধান্ত নেন রাতে নারীদের বিনামূল্যে জরুরি পরিষেবা দেওয়ার।
ড্রাইভিংয়ের বাইরে রাজি আক্কা নারীদের সাবলম্বন উদ্যোগের ও এক সক্রিয় মুখ।
তিনি নারীদের বিনামূল্যে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ দেন এবং নারী অটোচালকদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন সহায়ক দল ‘এনায়ুম কৈকাল’, যেখানে নারীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে পারেন, সাহায্য পেতে পারেন একে অপরের এবং আত্মনির্ভরতার পথে এগোতে পারেন।
সমাজ ও সম্প্রদায়ের সেবার উদ্দেশ্যে করে যাওয়া, রাজি আক্কার কাজগুলো এরকম
▪︎ নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ:
রাতের পর নারীদের নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া তাঁর প্রথম অঙ্গীকার। তাঁর অটোতে থাকে ফার্স্ট এইড বক্স, বিশুদ্ধ পানীয় জল ও স্যানিটারি প্যাড—যে কোনো জরুরি প্রয়োজনের জন্য।
▪︎ বিনামূল্যে পরিবহন:
শিশু, বৃদ্ধ এবং দরিদ্র মানুষের জন্য তিনি বিনামূল্যে অটো পরিষেবা দিয়ে থাকেন। এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার মানুষকে বিনামূল্যের পরিষেবা দিয়েছেন রাজি।
▪︎ জরুরি সহায়তা:
শারীরিক অসুস্থতা বা যে কোনো জরুরি অবস্থায় তিনি রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দেন।
▪︎ নারীর ক্ষমতায়ন:
নারীদের ড্রাইভিং শিখিয়ে স্বনির্ভর হতে উৎসাহিত করা ছাড়াও ‘এনায়ুম কৈকাল’-এর মাধ্যমে অন্য নারী চালকদের পাশে দাঁড়ান।
▪︎ কমিউনিটি উদ্যোগ:
রাজি আক্কা একটি এনজিও পরিচালনা করেন, যা অনাথ শিশুদের শিক্ষার দায়িত্ব নেয় এবং তাদের এক নিরাপদ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে দেয়।
এতকিছুর পরেও রাস্তাঘাটে কি কি সমস্যা হয়, জানতে চাইলে রাজি বলেন,
“সমস্যা তো অনেক রকম আছে, রোজ সেগুলোর চেহারা পাল্টায়। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে, পরিচিতি ও, তাই সামলে নেওয়া যায়। তবে অবাক লাগে যেটা দেখে তা হল, গত প্রায় ২৫ বছর ধরে রাস্তায় অটো চালানোর পর, আজও মানুষ মহিলা অটোচালক দেখে অবাক হয়।”
চেন্নাইয়ের রাজি আক্কা আজ শুধু এক জন অটোচালিকা নন—তিনি মানবতা, সাহস, সহমর্মিতা ও সমাজপ্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর গল্প প্রমাণ করে, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ থাকলে একটি অটোরিকশাও হয়ে উঠতে পারে সমাজ বদলের শক্তিশালী হাতিয়ার।


