Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

বাহ্যিক দৃষ্টির সীমানা পেরিয়ে: কলকাতার অধ্যাপিকা পুরনোকে ভেঙে নতুনভাবে গড়ে তুলছেন শিক্ষার মানচিত্র

অধ্যাপিকা নীলাঞ্জনা সেন একাডেমিক জগতে বহু গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন স্পর্শ করেছেন—বিশ্ববিদ্যালয়ে শীর্ষস্থান অর্জন থেকে শুরু করে দৃষ্টিসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেওয়া পর্যন্ত। তিনি বারবার প্রমাণ করে চলেছেন, প্রকৃত দৃষ্টি কখনও শুধুমাত্র চোখের উপরেই নির্ভরশীল নয়।

দক্ষিণ কলকাতার বেহালার কিশোর ভারতী ভগিনী নিবেদিতা কলেজে প্রতিদিন তিনি একটি পূর্ণ শ্রেণিকক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে ‘দৃষ্টি’র কথা বলেন—যে দৃষ্টি চোখের নয়, মানুষের অভিজ্ঞতার, যা নানা মানবিক স্তরকে বোঝার ক্ষমতা দেয়।

নীলাঞ্জনার অন্ধকারের সঙ্গে পথচলা শুরু হয় মাত্র পাঁচ বছর বয়সে। রানিগঞ্জের এক প্রাণবন্ত প্লে-স্কুলের ছাত্রী হিসেবে তিনি খেলাধুলা খুব ভালোবাসতেন। কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই তিনি অন্যদের আগে চুপচাপ বাড়ি ফিরে আসতেন। কারণ ক্রমশ কম আলোতে তিনি পারিপার্শ্বিক পরিবেশ পরিষ্কার দেখতে পেতেন না।

প্রথমে তাঁর বাবা-মা—অরুণ ও আরতি সেন—ভাবেন এটি বকাঝকার পর সৃষ্ট শিশুসুলভ ভয়। চিকিৎসকরাও বিষয়টি গুরুত্ব দেননি; সোজা লাইন আঁকতে না পারাকে দুষ্টুমি বলে উড়িয়ে দিতেন। একদিন অদ্ভুতভাবে তাঁর মা লক্ষ্য করলেন, দিনের আলোয়ও নীলাঞ্জনা টর্চ জ্বেলে পড়াশোনা করছে। সেই মুহূর্তেই অস্বীকারের জায়গায় জায়গা নিল আতঙ্ক।
তাঁকে দ্রুত কলকাতা ও পরে চেন্নাইয়ের সেরা চোখের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ভিয়েনা ও রাশিয়া থেকে ওষুধ আনানো হয়, কিন্তু কিছুই রোগের অগ্রগতিকে থামাতে পারেনি।

শেষ পর্যন্ত নির্ণয় হয়—রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা, একটি বিরল ও নিরাময়-অযোগ্য জেনেটিক রোগ, যা ধীরে ধীরে চোখের আলোক-সংবেদনশীল কোষগুলোকে ধ্বংস করে। সেই এক মুহূর্তেই বদলে গেল নীলাঞ্জনার জীবন।

সাধারণ স্কুল ছাড়তে হয় তাকে। প্রায় দেড় বছর বাড়িতে থেকে ব্রেইল শেখেন। তাঁর বাবা নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে গিয়ে নিজে ব্রেইল শিখে এসে মেয়েকে শেখাতেন। মাসের পর মাস বাবা-মেয়ে একসঙ্গে বসে উঁচু ডট স্পর্শ করে নতুন বর্ণমালা রপ্ত করেন। পরে তিনি বেহালার ক্যালকাটা ব্লাইন্ড স্কুলে ভর্তি হন—একটি আবাসিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে তিনি শুধু পড়াশোনা নয়, চলাফেরা ও আত্মনির্ভরতাও শিখেছেন।

প্রথমে নিজেকে বেমানান মনে হলেও, ধীরে ধীরে এই স্কুলই তাঁকে দেয় অমূল্য এক জিনিস—আত্মসম্মান এর ধারণা। প্রথমবারের মতো নিজেকে সমান মনে হয় অন্যদের সঙ্গে। তবে স্কুলের বাইরের সমাজ ততটা সহানুভূতিশীল ছিল না। আসানসোলে তাঁর নিজের শহরেই কখনও মানুষের কৌতূহল, কখনও অতিরিক্ত সহানুভূতি সহনশীলতার বাইরে চলে যেত যা স্বাভাবিক মানবিক সম্পর্ক রাখার অন্তরায় হয়ে উঠত।

তবে পাশাপাশি জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তিনি এমন শিক্ষক, বন্ধু ও সহকর্মী পেয়েছেন, যারা তাঁকে তাঁর প্রকৃত সত্তার জন্য মূল্যায়ন করেছেন—শুধু প্রতিবন্ধকতার জন্য নয়। তার পথচলাকে সুগম করে তোলে, মূলধারার শিক্ষায় তাঁর অসাধারণ সাফল্য। মাধ্যমিকের পর তিনি মূলধারার শিক্ষায় প্রবেশ করেন। জলপাইগুড়ির পি.ডি. উইমেন্স কলেজে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন শিক্ষকদের উৎসাহে।

স্নাতকে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম স্থান এবং ২০০১ সালে স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন তিনি। ১০০% দৃষ্টিহীনতা ও ব্রেইল বইয়ের অভাবে তিনি নির্ভর করতেন ‘রিডার’-এর উপর—মূলত তাঁর বাবা-মা, যারা পাঠ্যবই পড়ে পড়ে ক্যাসেটে রেকর্ড করতেন। আর তিনি বারবার সেই টেপ শুনে পুরো বিষয় মুখস্থ করতেন, কারণ বইয়ের পাতায় ফিরে দেখা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।

নোট তৈরি হতো ব্রেইলে, পরে লেখক (scribe)-কে বলে তা কালি দিয়ে লিখিয়ে জমা দেওয়া হতো।
পরীক্ষাও ছিল অত্যন্ত কঠিন—একজন উপযুক্ত লেখক খুঁজে পেতে তাঁর বাবা-মাকে বাড়ি বাড়ি ঘুরতে হতো।
তিনি নিজেই বলেন, “এটি ছিল দশ গুন বেশি কঠিন ও সময়সাপেক্ষ।” এই চ্যালেঞ্জগুলোই তাঁর মানসিক শক্তিকে আরও শাণিত করে।

তিনি বলেন, “আমি বুঝেছিলাম আমি প্রতিবন্ধী নই, বরং বিশেষভাবে সক্ষম। আমার একটি ইন্দ্রিয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমার বাকি জ্ঞানেন্দ্রিয়র ক্ষমতা ও স্মৃতিশক্তি আরও শক্তিশালী হয়েছে।” এরপর শুরু হয় তার শিক্ষকতার পথচলা।

প্রথম প্রচেষ্টাতেই তিনি নেট (NET) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ২০০৩ এ আনন্দচন্দ্র কলেজ অব কমার্সে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে ২০০৫ এ পূর্ণকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। শুরুর দিকে প্রশ্ন উঠেছিল, তিনি কি শ্রেণিকক্ষ সামলাতে পারবেন কিনা? তিনি উত্তর দেন নিজের দক্ষতা দিয়ে। এরপর ব্যক্তিগত জীবনেও নতুন অধ্যায় শুরু হয়।

২০১০ সালে অধ্যাপক পল্লব হালদারের সঙ্গে বিবাহের পর তিনি কলকাতায় চলে আসেন। ২০১৫ সালে বেহালার কিশোর ভারতী কলেজে ইংরেজি বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগদান করেন তিনি। মহেশ দত্তানির উপর পিএইচডি সম্পন্ন করেন: “The Invisible Issues of India” এরপর প্রযুক্তির সহায়তায় শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচনে ব্রতী হন নীলাঞ্জনা। স্ক্রিন-রিডিং সফটওয়্যার ও পিডিএফ এর সাহায্যে ল্যাপটপ ও স্মার্টফোনকে শক্তিশালী শিক্ষার মাধ্যম করে তোলেন।
আজ তিনি ডিজিটাল টুল যেমন: স্ক্রিন রিডার,গুগল ক্লাসরুম, পাওয়ারপয়েন্ট ইত্যাদি ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের পড়ান। তিনি বলেন, “আমার ছাত্রছাত্রীরা চাইলে সামনের দরজা দিয়েই বেরিয়ে যেতে পারে, আমি বুঝতেও পারব না।” তবুও তারা যায় না—ভয়ে নয়, শ্রদ্ধায়।

প্রাক্তন ছাত্রী সুকন্যা দে বলেন, “ম্যাডামের শিক্ষার দৃষ্টিভঙ্গি চোখের সীমা ছাড়িয়ে যায়। আমরা ক্লাসে থাকতাম বাধ্য হয়ে নয়, বরং তাঁর জীবনসংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধা থেকে।” সহকর্মী অধ্যাপিকা অনিন্দিতা মিত্র বলেন, “ওর নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় অসাধারণ। দৃষ্টিহীন মানুষের ফটোগ্রাফিক মেমরি থাকা কল্পনাতীত—কিন্তু তাঁর স্মৃতিশক্তি অনন্য।”

এত কিছুর পরেও, ৪৮ বছর বয়সি এই শিক্ষিকা নিজের জীবনকে এখনও ‘জয়ী’ বলে মনে করেন না।
তিনি বলেন, “আমি তখনই সত্যিকারের বিজয়ী হব, যখন আমাদের সমাজে মর্যাদা ও সমান সুযোগের জন্য আর লড়াই করতে হবে না।” ততদিন পর্যন্ত, বেহালার এক কলেজের শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে নীলাঞ্জনা সেন তাঁর ছাত্রছাত্রীদের শুধু পাঠ্যসূচির নাটক, কবিতা বা তত্ত্ব নয়—সত্যিকারের ‘দেখা’ কীভাবে শিখতে হয়, সেটাই শেখাতে থাকবেন।